বই বিক্রয় সহ উল্লিখিত দ্রব্যসমূহ ব্যবহারের পরে করণীয় প্রসঙ্গে

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 3491
Questioner: M S A
Question Asked: 04 Aug 2026, 06:00 PM
Reviewed & Published: 04 Aug 2026, 06:29 PM
Views: 12
Tokens: 9,122
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

মুহতারাম মুফতি সাহেব,

আসসালামু আলাইকুম ।

আমাকে অনুগ্রহপূর্বক নিচের প্রতিটি প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট সমাধান দিয়ে বাধিত করবেন ।

১) শিক্ষকতা করার কারণে প্রতি বছরই বিভিন্ন বইয়ের অনেক সৌজন্য কপি আসে ৷ বইগুলোর স্তূপ জমে গিয়েছে । বইগুলোর ভেতরে মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বরূপ অনেক বাক্য লেখা থাকে । যেমন: বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম । মহান আল্লাহর অসীম অনুগ্রহে বইটির নতুন সংস্করণ প্রকাশিত হল ।

এরকম লেখা সংবলিত বই কী বিক্র‍য় করা অথবা কোন শিক্ষার্থীকে হস্তান্তর করা যাবে? কারণ, বিক্রির পরে প্রায় সব বইয়ের পরিণতিই কাগজের ঠোঙায় পরিণত হয় । এখন আমি বই বিক্র‍য় করলে অথবা কোন শিক্ষার্থীকে দিয়ে দিলে তারা বইয়ের কী পরিণতি করবে তার দায়ভার কী আমার উপরে বর্তাবে? যদি বর্তায়, আমার করণীয় কী?

২) ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকায় থাকার কারণে প্রায়ই আল্লাহ করীম মসজিদ মার্কেট থেকে বিভিন্ন দ্রব্য কিনতে হয় । দ্রব্যের প্যাকেটে 'আল্লাহ করীম' ও 'মোহাম্মদপুর' লেখা থাকে বিধায় এরকম প্যাকেট বা বক্স ব্যবহারের পরে করণীয় কী?

৩) একটি কলম কোম্পানির কারখানা রসুলপুরে, আবার সাভারের নবীনগর -এর নামও অনেক প্যাকেটে, খামে লেখা থাকে । রসুল, নবী - এ শব্দ সংবলিত প্যাকেট, খাম সম্পর্কে করণীয় কী?

৪) ভিজিটিং কার্ডে লেখা মোঃ ইসমাইল হুসাইন । এখানে, মোঃ সংক্ষেপে লেখা, ইসমাইল নাম দ্বারা সরাসরি ইসমাইল আলাইহিস সালাম কে না বোঝালেও তাঁর নাম থেকেই নেওয়া, হুসাইন নাম দ্বারা হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুকে না বুঝালেও তাঁর নাম অনুসারেই রাখা । এসব ক্ষেত্রে এরকম ভিজিটিং কার্ড ফেলে দিলে কী গুনাহ হবে? গুনাহ হলে করণীয় কী?

মুহতারাম মুফতি সাহেব, আমি এসব বিষয়ে অনেক উদ্বিগ্ন থাকি, কঠিন ওয়াসওয়াসা থাকার কারণে এরকম কোন কিছু জমিয়ে রাখি বাসার ভেতরে, মনে হয় অন্য কিছু করলে যদি অবমাননা হয়, ঈমান চলে যায় ।
বাসায় এরকম জমতে জমতে সংখ্যায় অনেক হয়ে গিয়েছে, প্রায় সময় এসব নিয়ে স্ত্রীর সাথে প্রচুর ঝগড়া হয় । সে ফেলে দিতে চায়, আমি রেখে দিতে চাই । আমার কাছে কোন সুস্পষ্ট সমাধান নেই ।

ওয়াসওয়াসায় আক্রান্ত বিধায় আমার প্রশ্ন ডিক্লাইন না করার অনুরোধ রইল ।
অনুরোধ রইল, আমার উপরেই সিদ্ধান্তের ভার না দেওয়ার অথবা জওয়াব থেকে আমাকেই বুঝে নিতে হয় এরকম কিছু না বলার জন্য ।
সহজ স্পষ্ট সমাধান দিয়ে বাধিত করুন ।

Answer

উত্তর

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

আপনার প্রশ্নগুলোর জন্য ধন্যবাদ। আপনি ওয়াসওয়াসায় আক্রান্ত বলে উল্লেখ করেছেন, তাই আমি সহজ, স্পষ্ট এবং ব্যবহারিক সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।


প্রশ্ন ১: বইয়ের সৌজন্য কপি বিক্রয় বা হস্তান্তর

উত্তর: যে বইয়ের ভেতরে আল্লাহর নাম বা কুরআনের আয়াত লেখা থাকে, সেগুলো বিক্রয় করা জায়েয আছে। তবে শর্ত হলো, ক্রেতা যদি জানা যায় যে সে বইটি অসম্মানজনক কাজে ব্যবহার করবে (যেমন: কাগজের ঠোঙা বানাবে), তাহলে সেক্ষেত্রে বিক্রি করা মাকরূহ হতে পারে।

কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে করণীয়:

  • আপনি যদি বইগুলো বিক্রি করতে চান, তাহলে কোনো সাধারণ দোকানদারের কাছে বিক্রি করুন, যিনি বই ব্যবসা করেন। তিনি বই বিক্রি করবেন পাঠকদের কাছে। এতে বইয়ের সম্মান রক্ষা হবে।
  • কোনো শিক্ষার্থীকে হস্তান্তর করলে সেও বই পড়বে বা ব্যবহার করবে—এতে সমস্যা নেই।
  • বইয়ের পরিণতি সম্পর্কে আপনি দায়ী হবেন না, যদি আপনি ভালো উদ্দেশ্যে দেন বা বিক্রি করেন। দায়িত্ব ক্রেতা বা গ্রহীতার।
  • তবে যদি আপনি নিশ্চিত হন যে কেউ বই কিনে কাগজের ঠোঙা বানাবে, তাহলে তাকে বিক্রি করা থেকে বিরত থাকুন।

আরও ভালো সমাধান: বইগুলো কোনো মাদরাসা লাইব্রেরি, মসজিদের লাইব্রেরি বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দান করে দিন। এতে বইয়ের সম্মান রক্ষা হবে এবং সওয়াবও হবে।

উল্লেখ্য, বইয়ে যদি লেখা থাকে যে বিক্রয় নিষিদ্ধ, সেক্ষেত্রে তাহা বিক্রয় করা যাবেনা। ফ্রীতে অন্য কাউকে দিয়ে দিবেন।


প্রশ্ন ২: 'আল্লাহ করীম' ও 'মোহাম্মদপুর' লেখা প্যাকেট/বক্স

উত্তর:

  • 'আল্লাহ করীম' লেখা প্যাকেট বা বক্স ব্যবহারের পর ফেলে দেওয়া যাবে। কারণ, প্যাকেট বা বক্সের মূল কাজ হলো পণ্য বহন করা, এবং এটি ব্যবহারের পর নষ্ট হয়ে যায়। এটি ইচ্ছাকৃতভাবে আল্লাহর নামের অবমাননার উদ্দেশ্যে করা হয় না, তাই গুনাহ হবে না।
  • তবে উত্তম পদ্ধতি হলো: প্যাকেটে যদি আল্লাহর নাম লেখা থাকে, তাহলে সেটি ব্যবহারের পর অন্য কাজে ব্যবহার করা (যেমন: কোনো জিনিস সংরক্ষণ করা) অথবা পুড়িয়ে ফেলা বা মাটিতে পুঁতে ফেলা উত্তম। কিন্তু যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে সাধারণ ময়লার সাথে ফেলে দিলেও গুনাহ হবে না, কারণ উদ্দেশ্য অবমাননা নয়।
  • 'মোহাম্মদপুর' শব্দটি একটি এলাকার নাম, এটি কোনো নবী বা রাসূলের নাম নয়। তাই এতে কোনো সমস্যা নেই।

প্রশ্ন ৩: 'রসুলপুর', 'নবীগঞ্জ' লেখা প্যাকেট/খাম

উত্তর:

  • 'রসুলপুর' এবং 'নবীগঞ্জ' বাংলাদেশের স্থানের নাম। এগুলো দ্বারা নবী বা রাসূলকে বোঝানো হয় না, বরং এলাকার নাম বোঝানো হয়।
  • তাই এসব প্যাকেট বা খাম ব্যবহারের পর ফেলে দিলে কোনো গুনাহ হবে না।
  • তবে যদি মনে করেন যে 'রসুল' বা 'নবী' শব্দটি লেখা আছে, তাই সম্মান রক্ষার্থে প্যাকেটটি অন্য কাজে ব্যবহার করতে পারেন অথবা পুড়িয়ে ফেলতে পারেন। কিন্তু এটি ওয়াজিব নয়, শুধু উত্তম।

প্রশ্ন ৪: ভিজিটিং কার্ডে 'মোঃ ইসমাইল হুসাইন' লেখা

উত্তর:

  • 'মোঃ' হলো 'মোহাম্মদ'-এর সংক্ষিপ্ত রূপ। এটি সাধারণত মুসলিমদের নামের সাথে ব্যবহৃত হয় এবং এটি দ্বারা নবী (সা.)-এর নাম বোঝানো হয়।
  • 'ইসমাইল' এবং 'হুসাইন' নামগুলো ইসলামী নাম, যা নবী ও সাহাবীদের নামের সাথে মিল রেখে রাখা হয়।
  • ভিজিটিং কার্ড ফেলে দিলে গুনাহ হবে না, কারণ: ১. এটি ব্যবহারের পর ফেলে দেওয়া স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। ২. উদ্দেশ্য নামের অবমাননা নয়, বরং কার্ডটি তার কাজ শেষ করেছে। ৩. শুধু নাম লেখা থাকার কারণে ফেলে দেওয়া গুনাহ নয়।

তবে করণীয় (যদি সতর্কতা অবলম্বন করতে চান):

  • কার্ডটি ছিঁড়ে বা কেটে ফেলে দিন, যাতে নামটি স্পষ্ট না থাকে।
  • অথবা অন্য কাজে ব্যবহার করুন (যেমন: বুকমার্ক, নোট নেওয়ার কাগজ)।
  • অথবা পুড়িয়ে ফেলুন।

ওয়াসওয়াসা সম্পর্কে বিশেষ নির্দেশনা

আপনি উল্লেখ করেছেন যে আপনার ওয়াসওয়াসা আছে। এ বিষয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা:

১. ইসলামে ওয়াসওয়াসা ক্ষমার যোগ্য — রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের অন্তরে যে খারাপ চিন্তা আসে তা ক্ষমা করে দেবেন, যতক্ষণ না সে তা কাজে পরিণত করে বা কথা বলে।" (বুখারী ও মুসলিম)

২. ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচার উপায়:

  • ওয়াসওয়াসা আসলে "আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম" পড়ুন।
  • ওয়াসওয়াসাকে গুরুত্ব দেবেন না। যত বেশি গুরুত্ব দেবেন, তত বাড়বে।
  • সাধারণ নিয়ম মেনে চলুন: যা হারাম প্রমাণিত, তা ছাড়ুন; বাকি সব জায়েয।

৩. স্ত্রীর সাথে ঝগড়া প্রসঙ্গে: স্ত্রীর সাথে এ বিষয়ে ঝগড়া না করে বরং সহযোগিতা করুন। তিনি ফেলে দিতে চান বলে তিনি ভুল করছেন না, আপনিও রেখে দিতে চান বলে আপনি ভুল করছেন না। বরং উভয়ে মিলে একটি সমাধানে পৌঁছান:

  • আল্লাহর নাম লেখা কাগজ/প্যাকেটগুলো আলাদা করে একটি ব্যাগে জমা করুন এবং মাঝে মাঝে পুড়িয়ে ফেলুন বা মাটিতে পুঁতে দিন।
  • বাকি সাধারণ জিনিসগুলো স্বাভাবিকভাবে ফেলে দিন।

আখেরি কথা: আপনি ওয়াসওয়াসায় আক্রান্ত, তাই সহজ নিয়ম মনে রাখুন: যে কাজটি স্পষ্ট হারাম নয়, সেটি করলে গুনাহ হবে না। আল্লাহর নাম লেখা কাগজ ফেলে দিলে গুনাহ হয় না, যদি উদ্দেশ্য অবমাননা না হয়। আপনার মনে যে ভয় কাজ করছে, তা শয়তানের প্ররোচনা। আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন করুন।

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.