হারাম রিলেশন থেকে বাঁচার উপায় কি?
Halal and Haram · Hanafi
Question
আমি একজন হেদায়েতপ্রাপ্ত মেয়ে,আমার বয়স ১৭+ আমি যখন স্কুলে পড়তাম তখন একটা ছেলের সাথে রিলেশনে ছিলাম যখন স্কুল ছেড়ে চলে আসি এবং হেদায়েত প্রাপ্ত হয় তাকে ছে দেই আমি,কারণ আমি হারাম রিলেশনের ভয়াবহতা জেনেছিলাম।
কিন্তু আমি নিজেকে কোন্ট্রল রাখতে পারি নি,তার সাথে ১ মাস/২ মাস/ ৩ মাস/৪ মাস/ ৫ মাস পর হলেও যোগাযোগ করে ফেলতাম।এক কথায় আমি নিজেকে ৫ মাস + কোন্ট্রলও করতে পেরেছি কিন্তু আর পারি নি,এভাবেই চলছে এখন ১মাস ও কোন্ট্রল করতে পারি নাহ আর আমি আমার হেদায়েতও হারিয়ে ফেলেছি এখন
আরেকটা কথা ওই ছেলের সাথে শুধু আমার কল আর মেসেজেই কথা হয়,বাস্তবে শুধু কয়েকবার দেখা করেছি সে আমার ফেইস তেমন দেখে নি,তার সাথে আমার কোনো শারীরিক সম্পর্কও হয় নি,দেখাও আমাদের ৪ বছরে ৫/৬ বার হয়েছে।কিন্তু মেসেজে অশ্লীল কথা বার্তা হয়েছে,,
এই অবস্থায় তাওবা করলে কি আমার দুনিয়াতে শাস্তি হবে যিনার জন্য? আর আমি কি নেককার জীবনসঙ্গী পাব?
আমি কোনোভাবেই হারাম রিলেশন থেকে বের হতে পারছি নাহ,আমি নিজেই তাকে হাজার বার বলেছি আমরা হারাম রিলেশন করছি এবং আমি চলেও এসেছি কিন্তু আমি নিজেই আবার গিয়েছি তার কাছে,সে আমাকে মেসেজ দেয় নাহ,আমি এই দেই,এমনকি তাকে সব জায়গায় ব্লক করা আছে আমার এখানে,তার নাম্বারও ডিলিট কিন্তু ওইযে মুখস্থ হয়ে গিয়েছে।
আমার খুব ভয় হয় যদি সে আমার পরিবারের কাছে আমার নামে বিচার দেয়(কারণ তারা জানে আমি এখন অনেক ভালো) কারণ হিদায়তের আগে এই সম্পর্ক আমার ফেমিলি জানত এবং আমি এর জন্য অনেক শাস্তিওও পেয়েছি।কিন্তু লুকায় করি,কেউ জানে নাহ ৩ বছরের মধ্যে,, আমার এটা অনেক ভয় হয় সে যদি কিছউ করে ফেলে বা আমার ফেমিলিকে বলে দেয়,বা নিজের ক্ষতি করে পরে আমায় দোষারুপ করে সবাই যে আমার জন্য এমন হয়েছে পরে ত সবাই আমাকে খারাপ ভাববে,,,আমার জীবন শেষ হয়ে যাবে।
আরেকটা কথা আমি অনেক একাকিত্ব।
ওই ছেলে আমাকে অনেকবার বকে যে আমি যেন তার জীবন থেকে চলে যাই,কিন্তু আমিই কথা বলি তার সাথে,,তার অন্যায় নেই আমার সব অন্যায় এখন ত আমার শেষ মেসেজ দিয়ে এটা বলতেও লজ্জা লাগে যে আমরা হারাম রিলেশন করছি কারণ আমি নিজেই বলি হারাম আবার নিজেই কথা বলি তার সাথে।
আমার জীবনটা অশান্তিতে ভরে গেছে,হেদায়েত এর ছিটে ফুটাও নেই আর আমার লাইফে।
দয়াকরে বলেন আমি কীভাবে এই হারাম রিলেশন থেকে বাঁচব,কিভাবে এর শেষ করব আমি এই সম্পর্কের
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার অনুভূতি এবং সংগ্রাম আমি বুঝতে পারছি। এটি একটি কঠিন পরিস্থিতি, তবে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া উচিত নয়। নিচে আপনার প্রশ্নগুলোর উত্তর দিচ্ছি:
১. তাওবা করলে কি দুনিয়াতে শাস্তি হবে?
যিনার (ব্যভিচারের) শাস্তি সম্পর্কে ইসলামী বিধান হলো—বিবাহিত ব্যক্তির জন্য পাথর মেরে হত্যা এবং অবিবাহিত ব্যক্তির জন্য ১০০টি বেত্রাঘাত ও এক বছর নির্বাসন। তবে এই শাস্তি প্রযোজ্য তখনই, যখন বিষয়টি আদালতে প্রমাণিত হয় (চারজন সাক্ষী বা স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তির মাধ্যমে)।
কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে—যেহেতু আপনি শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হননি, শুধু মেসেজে অশ্লীল কথাবার্তা হয়েছে এবং কয়েকবার দেখা হয়েছে, তাই এটি সম্পূর্ণ যিনা নয়। এটি যিনার দিকে ধাবিতকারী পাপকর্ম (মুqaddimat al-zina) হিসেবে গণ্য হবে। এর জন্য দুনিয়ার আদালতে কোনো শাস্তি নেই, তবে আল্লাহর কাছে তাওবা করা আবশ্যক।
তাওবার শর্তসমূহ:
- পাপ কাজ থেকে সম্পূর্ণরূপে বিরত থাকা
- কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হওয়া
- দৃঢ় সংকল্প করা যে ভবিষ্যতে আর এই পাপে ফিরে যাবেন না
আল্লাহ তাআলা বলেন:
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا ۚ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ "বলুন, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের উপর জুলুম করেছে, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (সূরা আয-যুমার: ৫৩)
২. আমি কি নেককার জীবনসঙ্গী পাব?
হ্যাঁ, ইনশাআল্লাহ। যদি আপনি আন্তরিকভাবে তাওবা করেন এবং আল্লাহর পথে ফিরে আসেন, তবে আল্লাহ আপনাকে নেককার জীবনসঙ্গী দান করবেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
"নারীকে চারটি বিষয়ের জন্য বিবাহ করা হয়: সম্পদ, বংশমর্যাদা, সৌন্দর্য এবং দ্বীনদারি। তুমি দ্বীনদার নারীকে বেছে নাও, তবেই তুমি সফল হবে।" (সহীহ বুখারী: ৫০৯০)
তবে মনে রাখবেন, আপনার অতীত সম্পর্কে কাউকে বলার প্রয়োজন নেই। ইসলামে গুনাহ গোপন রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহর কাছে তাওবা করাই যথেষ্ট।
৩. কীভাবে এই হারাম সম্পর্ক থেকে বাঁচব?
আপনার জন্য নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করার পরামর্শ দিচ্ছি:
ক. সম্পূর্ণভাবে যোগাযোগ বন্ধ করুন:
- তার নাম্বার, সোশ্যাল মিডিয়া, ইমেইল—সবকিছু থেকে তাকে ব্লক করুন
- তার নাম্বার মনে থাকলেও ডায়াল করবেন না
- মনে মনে দৃঢ় সংকল্প করুন যে আর কখনো যোগাযোগ করবেন না
খ. তাওবা করুন:
- দুই রাকাত নামাজ পড়ে আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে তাওবা করুন
- নিয়মিত ইস্তিগফার পড়ুন: "আস্তাগফিরুল্লাহা ওয়া আতুবু ইলাইহি"
গ. ভালো পরিবেশ তৈরি করুন:
- দ্বীনি মাহফিল, আলোচনা সভায় অংশগ্রহণ করুন
- নেককার বান্ধবী তৈরি করুন
- কুরআন তিলাওয়াত এবং নামাজে মনোযোগী হোন
ঘ. বিবাহের চেষ্টা করুন:
- আপনার বয়স ১৭+, বিবাহের জন্য পরিবারের সাথে আলোচনা করতে পারেন
- বিবাহের মাধ্যমে বৈধ সম্পর্ক স্থাপন করুন
ঙ. নিজেকে ব্যস্ত রাখুন:
- পড়াশোনা, দ্বীনি ইলম অর্জন, পরিবারের কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখুন
- খালি সময়ে শয়তান প্রভাব বিস্তার করে
৪. ভয় সম্পর্কে
আপনার ভয় স্বাভাবিক, তবে আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন। আপনি যদি সত্যিই তাওবা করেন এবং সম্পর্ক ছেড়ে দেন, তবে আল্লাহ আপনার অবস্থা ভালো করবেন। সেই ছেলেটির বিষয়ে আপনার চিন্তা করার দরকার নেই—আপনি তাকে ব্লক করেছেন, তার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করেছেন, এটাই যথেষ্ট। সে যদি আপনার পরিবারকে কিছু বলে, তবে আপনি আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন। আপনার পরিবার ইতিমধ্যে জানে যে আপনি হেদায়েত পেয়েছেন এবং ভালো আছেন।
৫. একাকীত্ব সম্পর্কে
একাকীত্ব অনুভব করা স্বাভাবিক, তবে মনে রাখবেন—আল্লাহ সর্বদা আপনার সাথে আছেন। আল্লাহর সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলুন। নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, দুআ—এসবের মাধ্যমে আপনি আত্মিক প্রশান্তি পাবেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য কোনো কিছু ত্যাগ করে, আল্লাহ তাকে এর চেয়ে উত্তম কিছু দান করেন।" (মুসনাদ আহমাদ: ২২৫৫৭)
উপসংহার
প্রিয় বোন, আপনি যদি আন্তরিকভাবে তাওবা করেন এবং এই সম্পর্ক থেকে সম্পূর্ণভাবে বিরত থাকেন, তবে আল্লাহ অবশ্যই আপনার গুনাহ মাফ করবেন এবং আপনাকে উত্তম জীবনসঙ্গী দান করবেন। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হবেন না। আপনার বয়স মাত্র ১৭+, আপনার সামনে দীর্ঘ জীবন রয়েছে। অতীতের ভুলের জন্য অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে আসুন।
وَالَّذِينَ إِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً أَوْ ظَلَمُوا أَنفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللَّهَ فَاسْتَغْفَرُوا لِذُنُوبِهِمْ وَمَن يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا اللَّهُ وَلَمْ يُصِرُّوا عَلَىٰ مَا فَعَلُوا وَهُمْ يَعْلَمُونَ "আর যারা কোনো অশ্লীল কাজ করলে বা নিজেদের উপর জুলুম করলে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজেদের গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে—আল্লাহ ছাড়া আর কে গুনাহ মাফ করবে?—এবং তারা জেনে-শুনে নিজেদের কৃতকর্মে অটল থাকে না।" (সূরা আলে ইমরান: ১৩৫)
আল্লাহ আপনাকে তাওবার তাওফিক দান করুন এবং আপনার জীবনকে শান্তিময় করুন। আমিন।
দলিলসমূহ:
- সূরা আয-যুমার: ৫৩
- সূরা আলে ইমরান: ১৩৫
- সহীহ বুখারী: ৫০৯০
- মুসনাদ আহমাদ: ২২৫৫৭
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): ৩/১৬০-১৬১ (তাওবার শর্তাবলী)