আইওএম নিয়ে কটাক্ষ করলে জবাব কিভাবে দিব?
Faith and Belief · Hanafi
Question
আমি আইওএম এর স্টুডেন্ট। তো কথায় কথায় আমার স্বামীকে আমি বললাম " আমাদের এক উস্তাদ বাইরের দেশে গেছে দাওয়াতি কাজে" তখন আমার স্বামী এভাবে বলেন " কিসের দাওয়াতি কাজ প্লেনে চড়ে ঘুরতে গেছে,মাদ্রাসার টাকা দিয়ে গেছে,অনেক স্টুডেন্ট পরে অনেক টাকা আসে আইওএম থেকে সেগুলো টাকা দিয়ে বাইরে গেছে দাওয়াতি কাজের নাম করে,দেশের মানুষ আশেপাশের মানুষদের দাওয়াত দেওয়ার খবর নেয় আর বিদেশ গেছে,আগে পরিবারের মানুষদের দাওয়াত দিতে হয়,সাঈদী হুজুরকে বিদেশ থেকে খরচ দিয়ে নিয়ে যাইতো" ইত্যাদি ইত্যাদি। কথা গুলো শুনে আমি রেগেই কথা বলছি কয়েকটা। ওনার সামনে ক্লাস করি বেশি সময়। উনি শুধু সুযোগ খুঁজে আইওএম নিয়ে কটাক্ষ করার, উস্তাদের অপমান জনক কথা বলার। এমনকি আইফতওয়ার কোনো ফতওয়া পর্যন্ত মানতে চায় না বলে এসব সত্যি না। এনাকে আসলে কি বলে জবাব দিবো যদি একটু বলতেন?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার স্বামীর আচরণ এবং আপনার প্রতিক্রিয়া নিয়ে আপনি উদ্বিগ্ন। আসুন আমরা এই বিষয়টি ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এবং হানাফি ফিকহের আলোকে বুঝার চেষ্টা করি।
১. উস্তাদ ও আলেমদের সম্মান করা ইসলামের নির্দেশ
আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন:
يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ "আল্লাহ তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে তাদের মর্যাদা উচ্চ করে দেবেন।" (সূরা আল-মুজাদালা: ১১)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَمْ يُوَقِّرْ كَبِيرَنَا وَيَرْحَمْ صَغِيرَنَا وَيَعْرِفْ لِعَالِمِنَا حَقَّهُ" "তিনি আমাদের দলভুক্ত নন, যে আমাদের বড়দের সম্মান করে না, ছোটদের স্নেহ করে না এবং আলেমের হক আদায় করে না।" (সুনানে আবু দাউদ: ৪৯৪৩, মুসনাদে আহমাদ: ২২৭৮৯)
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন:
"لَوْلَا السَّنَةُ مَا نَجَا أَحَدٌ مِنَّا، وَلَكِنَّا أَخَذْنَا بِالْأَثَرِ" "যদি সুন্নাহ না থাকত, তবে আমাদের কেউই নাজাত পেত না, কিন্তু আমরা আছার (সাহাবীদের আমল) অনুসরণ করেছি।" (আল-মু'জামুল আওসাত, তাবরানী: ৮/৩৭৫)
২. দাওয়াতের কাজের গুরুত্ব এবং বিদেশে দাওয়াত
দ্বীনের দাওয়াত প্রতিটি মুসলিমের দায়িত্ব। তবে যারা ইলম অর্জন করে এবং বিশেষভাবে দাওয়াতের কাজে নিয়োজিত থাকে, তাদের বিদেশে গিয়ে দাওয়াত দেওয়া কোনো অন্যায় নয়। বরং রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজে তাবলীগের জন্য বিভিন্ন স্থানে গিয়েছেন এবং সাহাবীদের বিভিন্ন দেশে পাঠিয়েছেন।
ইমাম বুখারী (রহ.) তার সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) মুয়ায ইবনে জাবাল (রা.)-কে ইয়েমেনে পাঠিয়েছিলেন দাওয়াতের কাজে। (সহীহ বুখারী: ১৩৯৫)
৩. আপনার স্বামীকে জবাব দেওয়ার পদ্ধতি
আপনার স্বামী যখন আইওএম বা উস্তাদদের নিয়ে কটাক্ষ করেন, তখন আপনার করণীয়:
ক. ধৈর্য ধারণ করুন এবং উত্তেজিত হবেন না: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"الْكَلِمَةُ الطَّيِّبَةُ صَدَقَةٌ" "ভালো কথা হলো সদকা।" (সহীহ বুখারী: ২৯৮৯)
আপনি উত্তেজিত হয়ে কথা বললে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। বরং শান্তভাবে এবং হিকমতের সাথে উত্তর দিন।
খ. কুরআন-হাদীসের দলীল দিয়ে উত্তর দিন: আপনি বলতে পারেন:
- "দাওয়াতের কাজে বিদেশ যাওয়া ইসলামে নিষিদ্ধ নয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজে সাহাবীদের বিভিন্ন দেশে পাঠিয়েছেন দাওয়াতের জন্য।"
- "উস্তাদদের সম্পর্কে খারাপ ধারণা পোষণ করা এবং তাদের অপমান করা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আলেমদের সম্মান করা ওয়াজিব।"
গ. ফিতনা ও গীবত থেকে বিরত থাকুন: আপনার স্বামী যদি উস্তাদদের সম্পর্কে এমন কথা বলেন যা সত্য নয়, তবে এটি গীবতের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا ۚ أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ "তোমাদের কেউ যেন কারো গীবত না করে। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়া পছন্দ করবে? নিশ্চয়ই তোমরা তা ঘৃণা করবে।" (সূরা আল-হুজুরাত: ১২)
৪. ইফতওয়া সম্পর্কে আপনার স্বামীর অবস্থান
আপনার স্বামী যদি ইফতওয়ার ফতোয়া মানতে না চান, তবে এটি একটি গুরুতর বিষয়। ইসলামী শরীয়তের বিধান জানার জন্য আলেমদের কাছে প্রশ্ন করা এবং তাদের ফতোয়া অনুযায়ী আমল করা প্রতিটি মুসলিমের কর্তব্য। আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ "তোমরা যদি না জান, তবে জ্ঞানীদের কাছে জিজ্ঞেস কর।" (সূরা আন-নাহল: ৪৩)
৫. আপনার করণীয়
১. দোয়া করুন: আপনার স্বামীর হেদায়েতের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করুন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"الدُّعَاءُ هُوَ الْعِبَادَةُ" "দোয়াই হলো ইবাদত।" (সুনানে তিরমিজি: ৩৩৭১)
২. ভালো ব্যবহার করুন: আপনার স্বামীর সাথে ভালো ব্যবহার করুন এবং তার সাথে তর্ক না করে বরং নরম ভাষায় বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করুন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَقُولُوا لِلنَّاسِ حُسْنًا "মানুষের সাথে ভালো কথা বলো।" (সূরা আল-বাকারা: ৮৩)
৩. বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে নিন: যদি আপনার স্বামী ক্রমাগত উস্তাদদের অপমান করেন এবং ইসলামী বিধান মানতে অস্বীকৃতি জানান, তবে আপনি একজন বিজ্ঞ আলেমের সাথে পরামর্শ করতে পারেন। তবে মনে রাখবেন, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক অত্যন্ত পবিত্র এবং তা রক্ষা করা জরুরি।
৬. একটি গুরুত্বপূর্ণ নসীহত
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) তার বিখ্যাত গ্রন্থ "রদ্দুল মুহতার" এ উল্লেখ করেছেন যে, আলেমদের সম্মান করা এবং তাদের সম্পর্কে ভালো ধারণা পোষণ করা প্রতিটি মুসলিমের ঈমানের অংশ। (রদ্দুল মুহতার: ১/৪২)
আপনার উচিত হবে:
- আপনার স্বামীর সাথে এই বিষয়ে শান্তভাবে আলোচনা করা
- তাকে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি বোঝানো
- প্রয়োজনে কোনো সম্মানিত আলেমের সাথে দেখা করার পরামর্শ দেওয়া
মনে রাখবেন: উত্তেজিত হয়ে কথা বলা বা ঝগড়া করা কোনো সমস্যার সমাধান করে না। বরং ধৈর্য, হিকমত এবং ভালো আচরণের মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান সম্ভব।
আল্লাহ তাআলা আপনার স্বামীকে হেদায়েত দান করুন এবং আপনার পরিবারে শান্তি বজায় রাখুন। আমিন।