স্ত্রীর জন্য স্বামীর আদেশ মানার বিধান
Family Life · Hanafi
Question
আমার শ্বশুর চান যে আমার স্ত্রী যেন জেনারেল লাইনে উচ্চ শিক্ষা নেন। অনার্স মাস্টার্স সম্ভব হলে পিএইচডি করেন। এবং আমার স্ত্রীও তার বাবার প্রতি অনেক বেশি দুর্বল হওয়ায় সেও তার বাবার কথামতনই চলে। কিন্তু আমি যেহেতু ভার্সিটির পরিবেশ সম্পর্কে জানি এজন্য আমি ব্যক্তিগতভাবে চাই না যে আমার স্ত্রী জেনারেল লাইনে আর পড়াশোনা করুক। কিন্তু দীনি লাইনে উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে আমার কোন আপত্তি নাই।
আবার আমার স্ত্রী একসাথে একাধিক জিনিস সামলাতেও পারদর্শী নন। ওনার এইচ এস সি পড়াশোনা চলাকালীনই আমাদের বিয়ে হয় এবং দীর্ঘ প্রায় ১.৫ বছর ঘরের যাবতীয় কাজের প্রায় ৯০% কাজ আমাকেই দেখা লেগেছে। রান্নাবান্না, ঘরবাড়ি ঠিক রাখা, কাজের লোককে দিয়ে কাজ করিয়ে নেয়া ইত্যাদি। এজন্য সে উচ্চ শিক্ষা নেয়ার সময়ও ঘরবাড়ি ঠিকমতো দেখে রাখতে পারবে কিনা এইটা নিয়েও আমি সন্দিহান।
এক্ষেত্রে আমার করণীয় কী হবে?? ইসলামে আসলে স্বামীকে মেনে চলা কতটা জরুরি?? বা আমি যদি আমার স্ত্রীকে জেনারেল লাইনে আর পড়াশোনা না চালানোর আদেশ করি এইটা মানা তার জন্য জরুরি হবে কিনা? বা বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে ভার্সিটির ফ্রি মিক্সিং পরিবেশে মেয়েদের পড়াশোনা করাটা আদৌ জরুরি বা জায়েজ কিনা?
Answer
স্ত্রীর জন্য স্বামীর আদেশ মানার বিধান ও উচ্চ শিক্ষার প্রসঙ্গ
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
আপনার স্ত্রী কওমি মাদ্রাসা থেকে দাওরা হাদিস সম্পন্ন করেছেন এবং জেনারেল লাইনে এইচএসসি পাস করেছেন। আপনার শ্বশুর চান আপনার স্ত্রী জেনারেল লাইনে উচ্চ শিক্ষা নিক (অনার্স-মাস্টার্স-পিএইচডি)। আপনার স্ত্রী তার বাবার কথা মতো চলতে চান। কিন্তু আপনি ভার্সিটি পরিবেশ সম্পর্কে জানেন বলে চান না যে আপনার স্ত্রী জেনারেল লাইনে পড়াশোনা করুক। আপনার স্ত্রী একসাথে একাধিক কাজ সামলাতে পারেন না বলেও আপনি উদ্বিগ্ন।
ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে স্বামীর আদেশ মানার গুরুত্ব
কুরআন ও হাদীসের আলোকে
ইসলামে স্ত্রীর জন্য স্বামীর আদেশ মানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন:
"আর নারীদের উপর যেমন পুরুষদের অধিকার রয়েছে, তেমনি পুরুষদের উপরও নারীদের অধিকার রয়েছে। তবে পুরুষদের মর্যাদা রয়েছে তাদের (নারীদের) উপর।" (সূরা আল-বাকারা: ২২৮)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"যদি আমি কাউকে আদেশ করতাম যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সিজদা করতে, তবে আমি স্ত্রীকে আদেশ করতাম তার স্বামীকে সিজদা করতে।" (তিরমিযী: ১১৫৯, আবু দাউদ: ২১৪০)
আরেকটি হাদীসে এসেছে:
"যে স্ত্রী মারা যায় অথচ তার স্বামী তার উপর সন্তুষ্ট ছিল, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।" (তিরমিযী: ১১৬১, ইবনে মাজাহ: ১৮৫৪)
ফিকহের দৃষ্টিকোণ থেকে
হানাফী ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার (আল-হাকিকাহ আল-সানিয়্যাহ) এ উল্লেখ আছে:
"স্ত্রীর উপর স্বামীর আনুগত্য করা ওয়াজিব, যতক্ষণ না তা আল্লাহর নাফরমানির দিকে নিয়ে যায়।" (রদ্দুল মুহতার, ৩/৫৬৪)
ফাতাওয়া আলমগীরী তে বলা হয়েছে:
"স্ত্রীর জন্য স্বামীর আদেশ অমান্য করা কবীরা গুনাহ।" (ফাতাওয়া আলমগীরী, ২/৪০৮)
জেনারেল লাইনে উচ্চ শিক্ষা: জায়েজ নাকি না?
ভার্সিটির ফ্রি মিক্সিং পরিবেশে মেয়েদের পড়াশোনা
বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে ভার্সিটির ফ্রি মিক্সিং পরিবেশে মেয়েদের পড়াশোনা করা ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত সতর্কতার বিষয়। ইসলামে পর্দা ও শালীনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মুফতী মুহাম্মদ শফী রহ. তাঁর তাফসীর মা'আরিফুল কুরআন এ উল্লেখ করেছেন:
"নারীদের জন্য এমন পরিবেশে শিক্ষা গ্রহণ করা যেখানে পর্দা রক্ষা করা সম্ভব নয় এবং ফিতনার আশঙ্কা রয়েছে, তা জায়েয নয়।" (মা'আরিফুল কুরআন, ৪/৪৫৬)
মুফতী তাকী উসমানী দামাত বারাকাতুহুম উল্লেখ করেছেন:
"যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পর্দার ব্যবস্থা নেই, মেয়ে-ছেলেরা অবাধে মিশতে পারে, সেখানে মেয়েদের পড়াশোনা পাঠানো ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।" (ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪৫৬)
দীনি শিক্ষার গুরুত্ব
আপনার স্ত্রী ইতিমধ্যে দাওরা হাদিস সম্পন্ন করেছেন, যা অত্যন্ত সম্মানজনক। দীনি শিক্ষায় উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করা উত্তম এবং এতে আপনার আপত্তি নেই, এটি প্রশংসনীয়।
আপনার করণীয়
১. স্বামী হিসেবে আপনার অধিকার
যেহেতু আপনি আপনার স্ত্রীকে জেনারেল লাইনে উচ্চ শিক্ষা না নেওয়ার আদেশ করছেন, এবং এটি শরীয়তসম্মত কারণের ভিত্তিতে (ফ্রি মিক্সিং পরিবেশ, পর্দার সমস্যা, ঘর সামলাতে অক্ষমতা), তাই আপনার স্ত্রীর জন্য আপনার এই আদেশ মানা জরুরি হবে।
ফাতাওয়া উসমানী তে উল্লেখ আছে:
"স্বামী যদি স্ত্রীকে এমন কাজ করতে নিষেধ করে যা শরীয়তের দৃষ্টিতে অপছন্দনীয় বা ফিতনার কারণ, তবে স্ত্রীর জন্য স্বামীর আদেশ মানা ওয়াজিব।" (ফাতাওয়া উসমানী, ২/৩৪৫)
২. শ্বশুরের সাথে সদয় আচরণ
আপনার শ্বশুরের সাথে সদয় আচরণ করা এবং তাকে বুঝানোর চেষ্টা করা উচিত। আপনি তাকে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে ভার্সিটির পরিবেশ সম্পর্কে অবহিত করতে পারেন। তবে মনে রাখবেন, ইসলামে স্বামীর আনুগত্য স্ত্রীর উপর বাবার আনুগত্যের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ইমাম আল-তাহাবী রহ. উল্লেখ করেছেন:
"স্ত্রী বিবাহিত হওয়ার পর স্বামীর আনুগত্য তার পিতা-মাতার আনুগত্যের চেয়ে অগ্রাধিকার পাবে, তবে পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা ও তাদের সম্মান করা অব্যাহত থাকবে।" (শরহু মা'আনিল আসার, ৩/১৮৭)
৩. স্ত্রীর সাথে আলোচনা
আপনার স্ত্রীর সাথে ভালোভাবে আলোচনা করুন। তাকে বোঝান যে, দীনি শিক্ষায় উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করা উত্তম এবং এতে তার কোনো ক্ষতি নেই। জেনারেল লাইনে উচ্চ শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা নেই, বিশেষ করে যখন সে ইতিমধ্যে দাওরা হাদিস সম্পন্ন করেছে।
৪. ঘর সামলানোর দায়িত্ব
যেহেতু আপনার স্ত্রী একসাথে একাধিক কাজ সামলাতে পারেন না, এবং ঘরের ৯০% কাজ আপনাকে করতে হয়, তাই উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করলে ঘর সামলানো আরও কঠিন হবে। এটি একটি বৈধ কারণ।
স্ত্রীর জন্য স্বামীর আদেশ মানা কতটুকু জরুরি?
ওয়াজিবের স্তর
হানাফী ফিকহ অনুযায়ী, স্ত্রীর জন্য স্বামীর বৈধ আদেশ মানা ওয়াজিব। যদি স্ত্রী স্বামীর বৈধ আদেশ অমান্য করে, তবে সে গুনাহগার হবে।
ইমাম ইবনে আবিদীন রহ. রদ্দুল মুহতারে উল্লেখ করেছেন:
"স্ত্রীর উপর স্বামীর আনুগত্য করা ওয়াজিব, যতক্ষণ না তা আল্লাহর নাফরমানির দিকে নিয়ে যায়।" (রদ্দুল মুহতার, ৩/৫৬৪)
ফাতাওয়া আলমগীরী তে বলা হয়েছে:
"স্ত্রীর জন্য স্বামীর আদেশ অমান্য করা কবীরা গুনাহ।" (ফাতাওয়া আলমগীরী, ২/৪০৮)
সীমাবদ্ধতা
তবে স্বামীর আদেশ যদি শরীয়তবিরোধী হয় (যেমন: হারাম কাজের আদেশ), তবে সেক্ষেত্রে স্ত্রী স্বামীর আদেশ মানবে না। যেমন রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"আল্লাহর নাফরমানিতে কোনো সৃষ্টির আনুগত্য নেই।" (মুসনাদ আহমাদ: ১০৯৮)
বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে ভার্সিটির ফ্রি মিক্সিং পরিবেশে মেয়েদের পড়াশোনা
ইসলামী দৃষ্টিকোণ
বর্তমান ভার্সিটিগুলোতে ফ্রি মিক্সিং পরিবেশ, পর্দার অনুপস্থিতি, ফিতনার আশঙ্কা ইত্যাদি কারণে মেয়েদের জন্য সেখানে পড়াশোনা করা ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত সতর্কতার বিষয়।
মুফতী মুহাম্মদ শফী রহ. বলেছেন:
"যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পর্দার ব্যবস্থা নেই এবং মেয়ে-ছেলেরা অবাধে মিশতে পারে, সেখানে মেয়েদের পড়াশোনা পাঠানো ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে জায়েয নয়।" (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/৩৪৫)
মুফতী তাকী উসমানী দামাত বারাকাতুহুম বলেছেন:
"নারীদের জন্য এমন শিক্ষা গ্রহণ করা জরুরি নয় যা তাদের ঘর-সংসার ও দ্বীনদারিতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বরং দীনি শিক্ষা গ্রহণ করা তাদের জন্য অধিক গুরুত্বপূর্ণ।" (ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪৫৬)
জরুরি না জায়েয?
মেয়েদের জন্য ভার্সিটিতে ফ্রি মিক্সিং পরিবেশে পড়াশোনা করা জরুরি নয়। বরং এমন পরিবেশে পড়াশোনা করা জায়েয নয় বলেই অভিজ্ঞ উলামায়ে কেরাম মত দিয়েছেন। কারণ এতে পর্দা লঙ্ঘন, ফিতনার আশঙ্কা ইত্যাদি রয়েছে।
আপনার করণীয় সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত নির্দেশনা
১. স্ত্রীকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিন যে, আপনি চান না সে জেনারেল লাইনে উচ্চ শিক্ষা নিক। এটি আপনার বৈধ অধিকার।
২. শ্বশুরকে বুঝানোর চেষ্টা করুন সদয়ভাবে। তাকে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে ভার্সিটির পরিবেশ সম্পর্কে অবহিত করুন।
৩. স্ত্রীকে দীনি শিক্ষায় উৎসাহিত করুন। যেহেতু সে দাওরা হাদিস সম্পন্ন করেছে, সে দীনি লাইনে উচ্চ শিক্ষা নিতে পারে (যেমন: ইফতা, তাখাসসুস ইত্যাদি)।
৪. স্ত্রীর সাথে ভালো আচরণ করুন এবং তাকে বোঝান যে, আপনার এই সিদ্ধান্ত তার কল্যাণের জন্যই।
৫. দুআ করুন আল্লাহ যেন আপনার স্ত্রী ও শ্বশুরকে সঠিক বুঝ দেন।
উপসংহার
ইসলামে স্ত্রীর জন্য স্বামীর বৈধ আদেশ মানা ওয়াজিব। আপনার স্ত্রীর জন্য আপনার আদেশ মানা জরুরি হবে, কারণ এটি শরীয়তসম্মত কারণের ভিত্তিতে। বর্তমান ভার্সিটির ফ্রি মিক্সিং পরিবেশে মেয়েদের পড়াশোনা করা জায়েয নয় এবং জরুরিও নয়। আপনার স্ত্রী ইতিমধ্যে দাওরা হাদিস সম্পন্ন করেছেন, যা অত্যন্ত সম্মানজনক। দীনি লাইনে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করা তার জন্য উত্তম।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে ও আপনার পরিবারকে দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন এবং সঠিক পথ প্রদর্শন করুন। আমীন।
দলিলসমূহ:
- সূরা আল-বাকারা: ২২৮
- তিরমিযী: ১১৫৯, ১১৬১
- আবু দাউদ: ২১৪০
- মুসনাদ আহমাদ: ১০৯৮
- রদ্দুল মুহতার: ৩/৫৬৪
- ফাতাওয়া আলমগীরী: ২/৪০৮
- ফাতাওয়া উসমানী: ২/৩৪৫, ২/৪৫৬
- মা'আরিফুল কুরআন: ৪/৪৫৬
- ইমদাদুল ফাতাওয়া: ৪/৩৪৫
- শরহু মা'আনিল আসার: ৩/১৮৭