ইসলামী দৃষ্টিতে স্ত্রী কি শ্বশুরের হক বিষয়ে স্বামীর সাথে কথা বলতে পারবে?
Family Life · Hanafi
Question
এই কথায় বলা হয় স্বামী বলছে যদি আব্বুর পক্ষ নাও আমার সাথে থাকার দরকার নেই,, আসলে আমি তো কারো পক্ষ নিচ্ছি না আমি চাচ্ছি যে বাসায় যেন দুজনে দুজনের সাথে মিলেমিশে থাকতে পারে,, তারপর বলেছে এগুলা মন সে মন থেকে আমাকে বলেনি ।। তার এ কথা কি কোন সমস্যা হবে,, শর্ত যুক্ত কিছু আর আমার এক্ষেত্রে করণীয় কি একটু বলবেন প্লিজ,,, এমনিতেই আমি ওয়াসওয়াসার রোগী সে আমাকে অনেক ভালোবাসে,, সেটা আমি যেন সবসময় তার পাশে থাকি,, আর সে এটাও বলে যে আমার সাথে বাবা রাগারাগি হয়েছে কিন্তু তুমি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা করবে এবং তার কথা শুনবে,, তার সাথে ভালো ব্যবহার করবে,,
এখন আমার প্রশ্ন হল আমি কি কখনোই আব্বুর কোন হক বিষয়ে পক্ষ নিতে পারবো না ???
আমার করনীয় কি? আর সে এই রাগারাগির সময়ে বলেছে
Answer
উত্তর
প্রশ্নটি মনোযোগ সহকারে পড়লাম। আপনার স্বামী তার বাবার সাথে রাগারাগি করে কথা বলছেন, আপনি তাকে বোঝাচ্ছেন যে এমন করা উচিত নয়। এতে আপনার স্বামী বলেছেন যে, "যদি আব্বুর পক্ষ নাও তাহলে আমার সাথে থাকার দরকার নেই।" আপনি জানতে চাচ্ছেন যে, আপনি কি কখনোই শ্বশুরের কোনো হক বিষয়ে পক্ষ নিতে পারবেন না? এবং আপনার করণীয় কী?
উত্তরের মূল কথা
আপনি আপনার শ্বশুরের হক সম্পর্কে কথা বলতে পারবেন এবং উচিতও। ইসলামে পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা প্রত্যেক সন্তানের উপর ফরজ। আপনার স্বামী যদি তার বাবার সাথে খারাপ ব্যবহার করেন, তাহলে তাকে ভালো কথা বলা আপনার কর্তব্য। এটি "পক্ষ নেওয়া" নয়, বরং সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করা (আমর বিল মা'রূফ ও নাহি আনিল মুনকার)।
কুরআন ও হাদীসের দলীল
কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا "আর তোমার রব আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া কারো ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে।" (সূরা বনী ইসরাঈল: ২৩)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
رِضَا الرَّبِّ فِي رِضَا الْوَالِدِ، وَسَخَطُ الرَّبِّ فِي سَخَطِ الْوَالِدِ "আল্লাহর সন্তুষ্টি পিতার সন্তুষ্টির মধ্যে এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি পিতার অসন্তুষ্টির মধ্যে।" (তিরমিযী: ১৮৯৯)
আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: «لَا يَجْزِي وَلَدٌ وَالِدَهُ إِلَّا أَنْ يَجِدَهُ مَمْلُوكًا فَيَشْتَرِيَهُ فَيُعْتِقَهُ» "কোনো সন্তান তার পিতার হক আদায় করতে পারবে না, তবে যদি পিতাকে ক্রীতদাস অবস্থায় পায় এবং তাকে ক্রয় করে মুক্ত করে দেয় (তবে হয়তো আদায় করতে পারবে)।" (সহীহ মুসলিম: ১৫১০)
ফিকহী বিশ্লেষণ
হানাফী ফিকহের আলোকে:
১. পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা ফরজ - ইমাম আবু হানীফা (রহ.) সহ সকল ইমামের মতে পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা এবং তাদের সাথে ভালো কথা বলা ফরজ। এমনকি তারা যদি অমুসলিমও হন, তবুও তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করতে হবে।
২. সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ - রদ্দুল মুহতার (৫ম খণ্ড, ৪১৬ পৃষ্ঠা) এ উল্লেখ আছে যে, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করা প্রত্যেকের উপর ওয়াজিব। বিশেষ করে স্ত্রীর জন্য স্বামীকে ভালো কথা বলা এবং অন্যায় থেকে বিরত রাখা উত্তম কাজ।
৩. স্ত্রীর কর্তব্য - ফাতাওয়া হিন্দিয়্যাহ (১ম খণ্ড, ৫৪৮ পৃষ্ঠা) তে উল্লেখ আছে যে, স্ত্রীর উপর স্বামীর আনুগত্য করা ফরজ, তবে স্বামী যদি পিতা-মাতার সাথে খারাপ ব্যবহার করে, তাহলে স্ত্রী তাকে নম্রভাবে বোঝাতে পারবে। এটি স্বামীর নাফরমানি নয়, বরং দ্বীনের দায়িত্ব।
আপনার স্বামীর কথার বিশ্লেষণ
আপনার স্বামী বলেছেন, "যদি আব্বুর পক্ষ নাও আমার সাথে থাকার দরকার নেই" - এটি রাগের মাথায় বলা কথা। ইসলামী দৃষ্টিতে:
১. রাগের সময় বলা তালাকের শর্ত - যেহেতু তিনি বলেননি "তালাক" বা "ছাড়" (طلاق)، বরং বলেছেন "আমার সাথে থাকার দরকার নেই" - এটি তালাক হিসেবে গণ্য হবে না। এটি শুধু রাগের কথা।
২. ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদের মতে - রাগের সময় বলা শর্তযুক্ত কথা যদি তালাকের নিয়তে না বলা হয়, তাহলে তা তালাক হয় না। তবে যদি "তালাক" শব্দ ব্যবহার করা হয়, তাহলে বিষয়টি ভিন্ন।
৩. ফাতাওয়া উসমানী (২য় খণ্ড, ৩০৫ পৃষ্ঠা) - তে উল্লেখ আছে যে, রাগের মাথায় বলা কথা যদি তালাকের নিয়তে না হয়, তাহলে তা তালাক গণ্য হবে না।
আপনার করণীয়
১. ধৈর্য ধারণ করুন - আপনার স্বামী ওয়াসওয়াসার রোগী এবং তিনি আপনাকে ভালোবাসেন। রাগের সময় তিনি যা বলেছেন তা মন থেকে বলেননি। আপনি ধৈর্য ধারণ করুন।
২. নম্রভাবে বোঝান - আপনার স্বামীকে নম্রভাবে বোঝান যে, আপনি কারো পক্ষ নিচ্ছেন না, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এবং পরিবারে শান্তি বজায় রাখার জন্য বলছেন। পিতা-মাতার সাথে ভালো ব্যবহার করা ইসলামের নির্দেশ।
৩. দোয়া করুন - আপনার স্বামীর জন্য দোয়া করুন যেন আল্লাহ তাকে হেদায়েত দেন এবং তার বাবার সাথে সম্পর্ক ভালো হয়।
৪. শ্বশুরের সাথে ভালো ব্যবহার করুন - আপনার স্বামী আপনাকে শ্বশুরের সাথে ভালো ব্যবহার করতে বলেছেন, এটি মেনে চলুন। শ্বশুরের খেদমত করুন এবং তার সাথে ভালো ব্যবহার করুন।
৫. মধ্যস্থতার চেষ্টা করুন - সম্ভব হলে শ্বশুর ও স্বামীর মধ্যে মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করুন, তবে এমনভাবে যেন স্বামী মনে না করেন যে আপনি তার বিপক্ষে।
গুরুত্বপূর্ণ নোট
আপনার স্বামী বলেছেন, "এগুলা মন থেকে বলেনি" - এটি প্রমাণ করে যে তিনি রাগের মাথায় কথা বলেছেন। ইসলামী দৃষ্টিতে রাগের সময় বলা কথা যদি তালাকের নিয়তে না হয়, তাহলে তা তালাক গণ্য হয় না। তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের কথা থেকে বিরত থাকা উচিত।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ ۗ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ "আর যারা রাগ সংবরণ করে এবং মানুষের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করে। আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।" (সূরা আলে ইমরান: ১৩৪)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَيْسَ الشَّدِيدُ بِالصُّرَعَةِ، إِنَّمَا الشَّدِيدُ الَّذِي يَمْلِكُ نَفْسَهُ عِنْدَ الْغَضَبِ "প্রকৃত শক্তিশালী সে নয় যে কুস্তিতে জেতে, বরং প্রকৃত শক্তিশালী সে যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।" (সহীহ বুখারী: ৬১১৪)
উপসংহার
আপনি আপনার শ্বশুরের হক বিষয়ে কথা বলতে পারবেন এবং এটি আপনার কর্তব্য। তবে তা করতে হবে অত্যন্ত নম্রভাবে এবং কৌশলে, যাতে আপনার স্বামী মনে না করেন যে আপনি তার বিপক্ষে। আপনার স্বামীকে বোঝান যে, আপনি তার এবং তার পরিবারের কল্যাণের জন্যই এ কথা বলছেন। আল্লাহর কাছে দোয়া করুন এবং ধৈর্য ধারণ করুন। ইনশাআল্লাহ, আল্লাহ আপনার পরিবারে শান্তি বর্ষণ করবেন।