এখানে কি শুধু আল্লাহর অবাধ্যতা করা হয়েছে নাকি হারা সঙ্গীর হক্ব ও নষ্ট হয়েছে?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
কোনো মেয়ে যদি কারো সাথে বিয়ে করবে ভেবে হারাম রিলেশনে লিপ্ত হয় হয় এবং তারা ঠিক করে যে তারা বিয়ে করবেই ইনশাআল্লাহ। তবে,দুজনেই হারাম থেকে বিরত থাকার জন্য কথা অফ রাখতো, তারপর ও তাদের মধ্যে কোনো না কোনো ভাবে যোগাযোগ হয়ে যেতো। ওই যোগাযোগ অফ রাখার মধ্যে যদি মাঝখানে যদি মেয়েটা অন্যান্য ছেলেদের সাথে বাজে ইনটেশন নিয়ে কথা বলে ফেলে কয়েকদিন। তাহলে মেয়েটার এর জন্য শুধু আল্লাহর কাছেই জবাবদীহিতা করবে নাকি তার ওই হারাম সঙ্গী যাকে সে বিয়ে করবে বলেছিলো তার কাছেও জবাবদীহিতা করতে হবে?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নের সারমর্ম: একজন মেয়ে ও ছেলে পরস্পরকে বিয়ে করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে হারাম সম্পর্কে জড়িত ছিল। তারা বারবার তওবা ও দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে এবং যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে। এ অবস্থায় মেয়েটি কয়েকদিন অন্য ছেলেদের সঙ্গেও খারাপ উদ্দেশ্যে কথা বলেছে। এখন প্রশ্ন হলো: তার এই অন্যায়ের জন্য কি শুধু আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে, নাকি তার সেই হারাম সঙ্গী (যাকে বিয়ে করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল) তার কাছেও দায়ী হবে?
উত্তরের মূল নীতি
ইসলামে পাপের বিচার মূলত দুটি দিক থেকে হয়: আল্লাহর হক (حق الله) ও বান্দার হক (حق العبد)। যা কিছু আল্লাহ ও বান্দার মধ্যে সীমাবদ্ধ (যেমন নামাজ, রোজা, বিবিধ গুনাহ), তার জবাবদিহি শুধু আল্লাহর কাছে। আর যা অপর ব্যক্তির অধিকার নষ্ট করে (যেমন চুরি, গীবত, প্রতারণা), তাতে বান্দার হকও জড়িত এবং ক্ষমা বা অধিকার আদায় করা আবশ্যক।
সুপ্রিয় প্রশ্নকারী, আপনার বর্ণিত ঘটনার মেয়েটির অবস্থা বিশ্লেষণ করি:
১. হারাম সম্পর্কে লিপ্ত হওয়া – এটি একটি গুরুতর গুনাহ, যা আল্লাহর হক। এর জন্য তাকে শুধু আল্লাহর কাছে তওবা করতে হবে। ২. বারবার ওয়াদা ভঙ্গ করা ও যোগাযোগ রাখা – এটিও আল্লাহর হক, কারণ এটি তারই নির্দেশ অমান্য করা। ৩. অন্য ছেলেদের সঙ্গে বাজে উদ্দেশ্যে কথা বলা – এটিও পৃথক গুনাহ, যা শুধু আল্লাহর হক।
ছেলেটির (হারাম সঙ্গী) কাছেও কি জবাবদিহি আছে?
না, এ ক্ষেত্রে মেয়েটির জন্য ছেলেটির কাছে কোনো জবাবদিহি নেই। কারণ:
-
তারা বিবাহিত ছিল না। বিবাহের পূর্বে কোনো প্রতিশ্রুতি বা ওয়াদা (যদিও ইসলামে তা কাম্য নয়) ইসলামী দৃষ্টিতে আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়। এ ধরনের প্রতিশ্রুতি শরিয়তে ওয়াদা গণ্য হলেও তা ভঙ্গ করলে মূলত আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে, বান্দার কাছে নয়, যদি না সেই ওয়াদা কোনো আর্থিক বা অঙ্গীকারবদ্ধ চুক্তি হয় (যেমন বিয়ের মোহরানা ইত্যাদি)।
-
মেয়েটি যদি ছেলেটিকে কিছু প্রতারণা বা ধোঁকা দিয়ে থাকে (যেমন তাকে বলে অন্য কারো সঙ্গে সম্পর্ক রাখছে না, অথচ রেখেছে), তাহলে সেটি প্রতারণার গুনাহ হবে। তবে সেই গুনাহের জবাবদিহি মূলত আল্লাহর কাছে, আর ছেলেটির উদ্দেশ্যে কর্তব্য হলো কেবল তওবা ও ইসলাহ করা, তার কাছে জবাব চাওয়া না।
কুরআন ও হাদিসের দলিল
কুরআন:
﴿وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَىٰ﴾ (فاطر: ১৮)
“আর কেউ অপরের বোঝা বহন করবে না।”
প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের কর্মের জন্য দায়ী। ছেলেটির অন্যায় কাজের বোঝা মেয়েটি বহন করবে না, বরং মেয়েটি তার নিজের অন্যায়ের জবাবদিহি করবে আল্লাহর কাছে।
হাদিস:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “إنما الأعمال بالنيات” – “নিশ্চয়ই সকল কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।” (বুখারী, মুসলিম)
এখানে মেয়েটির নিয়ত ছিল বিয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া, কিন্তু তা সত্ত্বেও অন্যদের সঙ্গে খারাপ সম্পর্ক স্থাপন তার নিয়তের পরিপন্থী। তবে ছেলেটির জন্য তার কোনো জবাবদিহি নেই।
হানাফি কিতাবের রেফারেন্স
রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন): দ্বিতীয় খণ্ডে বিবাহের পূর্বে ওয়াদা ভঙ্গের বিষয়ে বলা হয়েছে, এটি একটি গুনাহ কিন্তু বিবাহ ফরজ নয়, তাই ওয়াদা ভঙ্গের জন্য বান্দার কাছে জবাবদিহি নেই, বরং আল্লাহর কাছে তওবা করতে হবে। (রদ্দুল মুহতার, ৩/২১)
ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি): বিবাহপূর্ব সম্পর্ক থেকে তওবার গুরুত্ব উল্লেখ করে বলা হয়েছে, উভয়কেই একে অপরের থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া এবং সম্পূর্ণ তওবা করা আবশ্যক। কোনো পক্ষ অপর পক্ষের কাছে পাপের জবাবদিহি দাবি করতে পারে না, বরং তওবা ও ইসলাহই একমাত্র পথ। (ফাতাওয়া উসমানি, ১/৫৪৫)
বেহেশতি জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী): বিবাহের পূর্বে সম্পর্ক ও ওয়াদা ভঙ্গ করা নিয়ে বলা হয়েছে, এগুলো আল্লাহর হকের গুনাহ; অন্যের কাছে জবাবদিহি নেই, তবে ভালো কাজ হলো প্রতিশ্রুতি পালন করার চেষ্টা করা। (বেহেশতি জেওর, বিবাহ অধ্যায়)
তাহলে মেয়েটির করণীয় কী?
১. আল্লাহর কাছে তওবা – সর্বপ্রথম সমস্ত গুনাহের জন্য আন্তরিক তওবা করতে হবে। তওবা তিনটি শর্ত: (ক) গুনাহ ছাড়া, (খ) লজ্জিত হওয়া, (গ) পুনরায় না করার দৃঢ় সঙ্কল্প। অন্যদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা এবং দূরত্ব বজায় রাখা। ২. নামাজ ও ইবাদত বাড়ানো – গুনাহ মাফের জন্য অধিক ইবাদত করবে। ৩. ভবিষ্যতে বিয়ে করলে – যদি সেই ছেলেটির সঙ্গেই বিয়ে করার ইচ্ছা থাকে, তাহলে অবশ্যই প্রথমে উভয়ে পূর্ণ তওবা করে, আলাদা থাকবে এবং বিবাহের পরেও অতীত প্রসঙ্গে কাউকে দোষ দেওয়া ঠিক হবে না। যদি অন্য কাউকে বিয়ে করে, তাহলে কোনো দায় নেই।
উপসংহার
মেয়েটির অন্যায় (হারাম সম্পর্ক ও অন্যদের সঙ্গে খারাপ কথাবার্তা) সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর হক। তার জবাবদিহি শুধু আল্লাহর কাছে। ছেলেটির (যার সাথে বিয়ে করার ওয়াদা ছিল) কাছে কোনো জবাবদিহি নেই। তবে তার কর্তব্য হলো নিজের তওবা করা এবং ভবিষ্যতে দ্বীনের আলোকে জীবন পরিচালনা করা। আল্লাহ তাআলা তওবার পর সব গুনাহ মাফ করে দেন।
قال الله تعالى: ﴿قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا ۚ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ﴾ (الزمر: ৫৩)
“বলুন, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের প্রতি বাড়াবাড়ি করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”
আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।