ইসলামে বন্ধুত্ব ও হিংসার বিধান। হিংসা হারাম কেন? দ্বীনি বন্ধুত্ব কেমন হওয়া উচিত?
Halal and Haram · Hanafi
Question
১)আমার এ ধরনের হিংসার অনুভূতি কি নাজায়েজ কি-না?
২) যদি নাজায়েজ হয়, তাহলে এটা কীভাবে আমি মন থেকে দূর করতে পারি?
৩) ইসলাম কি বেস্টফ্রেন্ড সম্পর্কিত ধারনাকে সমর্থন করে কি-না?
৪) শরীয়তের দৃষ্টিকোন থেকে দ্বীনি বন্ধুত্ব কেমন হওয়া উচিত?
৫)একজন দ্বীনি বান্ধবীর প্রতি অন্য বান্ধবীর হক্ব কি কি? এবং কোন বিষয়গুলো থেকে আমাদের বেঁচে থাকা উচিত?
৬)কোন বিষয়গুলোর প্রতি দৃষ্টি রেখে আমাদের কারো সাথে বন্ধুত্ব করা উচিত কিংবা দূরত্ব করা উচিত?
৭)কীভাবে দুনিয়াতে এমন বন্ধুত্ব করা যাবে যা আখিরাতে আমাদের জন্য কল্যানকর হবে, এবং আমাদের জন্য অফসোসের কারণ হবে না। এক্ষেত্রে কোন বিষয়গুলোর দিকে খেয়াল রাখতে হবে?
জাঝাকাল্লাহু খয়রন।
Answer
প্রশ্ন : বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে কি এমন হিংসা জায়েজ?
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার অনুভূতি ও দ্বিধা বোঝা যাচ্ছে। নিচে প্রতিটি প্রশ্নের জবাব কুরআন, হাদীস ও হানাফী ফিকহের কিতাবের আলোকে দেওয়া হলো।
১) আমার এ ধরনের হিংসার অনুভূতি কি নাজায়েজ?
উত্তর:
হিংসা (হাসাদ) ইসলামে স্পষ্টভাবে হারাম। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"তোমরা হিংসা থেকে বাঁচো, কারণ হিংসা আগুন যেমন কাঠকে পুড়িয়ে দেয়, তেমনি নেক আমলকে পুড়িয়ে দেয়।" (আবু দাউদ, হাদীস: ৪৯০৩)
ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, হিংসা অন্তরের একটি রোগ যা প্রকাশ না করলেও তা গুনাহ, যদি তা অন্তরে পোষণ করা হয়। তবে শুধু অনুভূতি আসা (অনিচ্ছাকৃত) গুনাহ নয়, কিন্তু তা লালন করা নাজায়েজ। (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৮৪; বাহিশ্তী জেওর, ১/২৪৩)
আপনার ক্ষেত্রে, আপনি যখন দেখেন আপনার বান্ধবী অন্য বান্ধবীর সাথে কথা বলে তখন আপনার কষ্ট হয় এবং আপনি চান সে শুধু আপনারই বন্ধু থাকুক—এটা হিংসারই একটি রূপ, যা অন্তরে পোষণ করা উচিত নয়। তবে আপনি যদি তা দমন করার চেষ্টা করেন এবং আল্লাহর কাছে তাওবা করেন, তাহলে ইনশাআল্লাহ গুনাহ হবে না।
২) যদি নাজায়েজ হয়, তাহলে কীভাবে মন থেকে দূর করব?
উত্তর:
হিংসা দূর করার উপায়:
১. আল্লাহর কাছে দুআ করুন: "রব্বানা ইগফির লানা ওয়া লি ইখওয়ানিনা" (সূরা হাশর: ১০)
২. হিংসার ক্ষতি স্মরণ করুন: হাদীসে এসেছে, হিংসা নেক আমলকে নষ্ট করে। (মুসলিম, হাদীস: ২৫৬৪)
৩. বান্ধবীর জন্য কল্যাণ কামনা করুন: আপনি যখন চান সে শুধু আপনারই বন্ধু থাকুক, তা অহংকার ও স্বার্থপরতা। বরং তার জন্য ভালোবাসা ও কল্যাণ কামনা করুন।
৪. মনের বিপরীত কাজ করুন: যখনই হিংসা আসে, মনে মনে বলুন "আল্লাহুম্মা বারিক লাহা ফি উখুওওয়াতিহা" (আল্লাহ তার বন্ধুত্বে বরকত দিন)।
৫. ইলম অর্জন করুন: হিংসা সম্পর্কে কুরআন-হাদীস পড়ুন, যেমন সূরা ফালাক ও নাসের তাফসীর। (মাআরিফুল কুরআন, সূরা ফালাকের তাফসীর)
বাহিশ্তী জেওরে বলা হয়েছে: "যার মধ্যে হিংসা আছে, সে যেন প্রতিদিন সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পড়ে এবং মনে মনে বলে, 'হে আল্লাহ, তুমি আমাকে হিংসামুক্ত কর।'" (বাহিশ্তী জেওর, ১/২৪৪)
৩) ইসলাম কি বেস্টফ্রেন্ড (একান্ত বন্ধু) ধারণাকে সমর্থন করে?
উত্তর:
ইসলামে "বেস্টফ্রেন্ড" বলে কোনো নির্দিষ্ট ধারণা নেই, তবে "খলীল" বা ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বের অনুমতি আছে, যতক্ষণ তা আল্লাহর জন্য হয় এবং অন্য মুমিনের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন না করে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি যে তার পরিবারের জন্য উত্তম, এবং আমি আমার সাহাবীদের জন্য উত্তম।" (তিরমিযী, হাদীস: ৩৮৯৫)
তবে "একান্ত বন্ধু" ধারণায় যদি এমন হয় যে অন্য সকল বন্ধুকে বাদ দিয়ে শুধু একজনকে কেন্দ্র করে থাকে, তাহলে তা ইসলাম সমর্থন করে না, কারণ মুমিনরা তো ভাই ভাই (সূরা হুজুরাত: ১০)। হাদীসে এসেছে:
"মুমিন মুমিনের জন্য আয়নার মতো।" (আবু দাউদ, হাদীস: ৪৯০৩)
অতএব, আপনি চাইলে কাউকে বেশি ভালোবাসতে পারেন, কিন্তু সেই ভালোবাসা যেন অন্যদের প্রতি হিংসা বা সম্পর্ক ছিন্নের কারণ না হয়।
৪) শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে দ্বীনি বন্ধুত্ব কেমন হওয়া উচিত?
উত্তর:
দ্বীনি বন্ধুত্বের ভিত্তি হওয়া চাই তাকওয়া ও আল্লাহর সন্তুষ্টি। হাদীসে এসেছে:
"ব্যক্তি তার বন্ধুর দ্বীনের অনুসরণ করে। তাই তোমাদের প্রত্যেকে যেন দেখে নেয় সে কাকে বন্ধু বানায়।" (আবু দাউদ, হাদীস: ৪৮৩৩)
হানাফী ফিকহের কিতাবে বলা হয়েছে:
- বন্ধুত্ব হবে আল্লাহর জন্যই, দুনিয়ার স্বার্থের জন্য নয়।
- পরস্পরকে নেক কাজে উৎসাহ দেওয়া, গুনাহ থেকে বিরত রাখা।
- নম্রতা ও সহানুভূতি বজায় রাখা।
- গীবত, সুদ, মিথ্যা ইত্যাদি থেকে বিরত থাকা। (রদ্দুল মুহতার, ৫/২৬৭; ফাতাওয়া উসমানী, ৩/৪৫)
আপনার বন্ধুত্ব যেহেতু হিফজ প্রতিষ্ঠানে, তাই একে অপরকে কুরআন শেখার ও তাকওয়ার পথে সহায়তা করা উচিত।
৫) একজন দ্বীনি বান্ধবীর প্রতি অন্য বান্ধবীর হক্ব কি কি? এবং কোন বিষয়গুলো থেকে বেঁচে থাকা উচিত?
উত্তর:
হক্ব (অধিকার):
১. ভালোবাসা ও সম্মান: রাসূল ﷺ বলেছেন: "এক মুমিন অন্য মুমিনের ভাই।" (বুখারী, হাদীস: ২৪৪৪)
২. গোপনীয়তা রক্ষা: বান্ধবীর গোপন কথা অন্যদের না বলা। (মুসলিম, হাদীস: ২৫৬৪)
৩. সাহায্য ও সমর্থন: প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানো।
৪. নসীহত: ভুল হলে সঠিক পথ দেখানো।
৫. সালাম ও দেখা-সাক্ষাৎ বজায় রাখা।
যেসব বিষয় থেকে বেঁচে থাকা উচিত:
- হিংসা, হাসাদ, ও অহংকার।
- গীবত (পিছনে দোষচর্চা)।
- মিথ্যা ও প্রতারণা।
- কোনো অনৈসলামিক কাজে সহযোগিতা।
- অন্য বন্ধুর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা বা হিংসা করে তাকে বাদ দেওয়া।
(ফাতাওয়া উসমানী, ২/১২৩; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৫৪)
৬) কোন বিষয়গুলোর প্রতি দৃষ্টি রেখে বন্ধুত্ব করা বা দূরত্ব রাখা উচিত?
উত্তর:
বন্ধু বাছাইয়ের মানদণ্ড:
- দ্বীনের আমল : যে ব্যক্তি ভালো আমল করে, তাকে বন্ধু বানানো।
- আখলাক : সচ্চরিত্র ও নম্র ব্যক্তি।
- সৎ ও বিশ্বাসী : যে প্রতারণা করে না।
- জ্ঞান ও আমলের প্রতি উৎসাহী : যে তোমাকে নেক কাজে সাহায্য করবে।
যেসব বিষয়ে দূরত্ব রাখা উচিত:
- গুনাহগার বা বেপরোয়া বন্ধু : যে পাপাচারে লিপ্ত।
- গীবতকারী ও চোগলখোর : যে অন্যদের কথা নিয়ে বাজে আলোচনা করে।
- অহংকারী ও স্বার্থপর : যে শুধু নিজের সুবিধা দেখে।
হাদীসে এসেছে:
"মিসকের সাথে (সুগন্ধির সাথে) বসলে তুমি সুগন্ধি পাবে, আর কামারের সাথে বসলে তোমার কাপড়ে দাগ লাগবে।" (বুখারী, হাদীস: ২৪৪৪)
(বাহিশ্তী জেওর, ১/২৪০)
৭) কীভাবে দুনিয়াতে এমন বন্ধুত্ব করা যাবে যা আখিরাতে কল্যাণকর হবে?
উত্তর:
আখিরাতে কল্যাণকর বন্ধুত্বের শর্ত:
১. আল্লাহর জন্য ভালোবাসা : রাসূল ﷺ বলেছেন: "সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ তার আরশের ছায়ায় আশ্রয় দেবেন... তাদের মধ্যে একজন সেই ব্যক্তি, যারা আল্লাহর জন্য ভালোবাসে এবং আল্লাহর জন্য মিলিত হয় ও বিচ্ছিন্ন হয়।" (বুখারী, হাদীস: ৬৬০)
২. একে অপরকে তাকওয়া ও সৎকাজে উদ্বুদ্ধ করা।
৩. দুনিয়ার স্বার্থ না রাখা, বরং আখিরাতের কল্যাণ কামনা করা।
৪. গুনাহ ও ভুলত্রুটি সহনশীলতার সাথে মেনে নেওয়া, তবে হিংসা বা ক্ষোভ পোষণ না করা।
৫. একজন আরেকজনের জন্য দুআ করা।
যেসব বিষয় খেয়াল রাখতে হবে:
- ভালোবাসা যেন গুনাহ বা অন্যায়ের দিকে না টানে।
- বন্ধুত্ব যেন কেবল দুনিয়ার সুবিধার জন্য না হয়।
- বিচ্ছেদ হলে আখিরাতে আবার মিলিত হওয়ার আশা রাখা।
ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর ছাত্র ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) বলেছেন:
"সেই বন্ধুই উত্তম যে তোমাকে দুনিয়ার ক্ষতি থেকে বাঁচায় এবং আখিরাতের পথ দেখায়।"
(ফাতাওয়া উসমানী, ৩/৪৭; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৫৫)
সংক্ষিপ্ত উপদেশ:
আপনার হিংসার অনুভূতি স্বাভাবিক, তবে তা লালন করা হারাম। আপনি দুআ, তাওবা ও আমল করে তা দূর করুন। বন্ধুত্বকে আল্লাহর জন্য করুন, দুনিয়ার স্বার্থের জন্য নয়। হিফজের ত্বলিবা হিসেবে yourselves (তোমরা) একে অপরকে কুরআনের পথে সাহায্য কর।
والله أعلم بالصواب
রেফারেন্স:
- কুরআন: সূরা হুজুরাত (৪৯:১০), সূরা ফালাক (১১৩)
- মুসলিম (২৫৬৪), আবু দাউদ (৪৯০৩), বুখারী (৬৬০)
- রদ্দুল মুহতার (৬/৩৮৪) – হিন্দিয়া
- বাহিশ্তী জেওর (১/২৪০-২৪৪)
- ফাতাওয়া উসমানী (২/১২৩, ৩/৪৫-৪৭)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/২৫৪-২৫৫)
- মাআরিফুল কুরআন (সূরা ফালাকের তাফসীর)