লানত (অভিশাপ) কী, "লানাতুল্লাহিল কাহহার" বললে কি লানত হবে?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
আচ্ছা কেউ যদি লানাতুল্লাহিল কাহহার বলে অভিশাপ দেয় তা কি লানত হবে?
তোমার এই হবে সেই হবে বাংলায় না বলে আরবিতে বলে দিলে তা?
আর অনেকে বলে অভিশাপ লানত এর প্রভাব সুদুরপ্রসারী
শরীয়তের আলোকে ব্যখ্যা করলে উপকৃত হই...লানত কিভাবে কাজ করে?
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নটির উত্তর দেওয়ার আগে আমরা লানত (অভিশাপ) সম্পর্কে কুরআন-হাদিস ও হানাফি ফিকহের আলোকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদান করছি।
১. লানত কী?
লানত শব্দের অর্থ হলো অভিশাপ, দূরত্ব, রহমত থেকে বের করে দেওয়া। ইসলামী পরিভাষায় আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার জন্য প্রার্থনা করাকে লানত বলে। এটি একটি গুরুতর গুনাহ এবং কঠিন নাজায়েজ কাজ, যদি তা নির্দিষ্ট কোনো মুসলিম ব্যক্তির প্রতি প্রয়োগ করা হয়।
কুরআন ও হাদিসের দলিল:
- আল্লাহ বলেন: إِنَّ الَّذِينَ يُؤْذُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ لَعَنَهُمُ اللَّهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ (আহযাব: ৫৭)
"যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দেয়, আল্লাহ তাদের প্রতি লানত করেন দুনিয়া ও আখিরাতে।" - রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন: لَعْنُ الْمُؤْمِنِ كَقَتْلِهِ (বুখারি, মুসলিম)
"মুমিনকে লানত করা তাকে হত্যা করার মতো।"
২. "লানাতুল্লাহিল কাহহার" বলে অভিশাপ দিলে তা কি লানত হবে?
হ্যাঁ, এটি স্পষ্ট লানত।
"লানাতুল্লাহিল কাহহার" অর্থ "পরাক্রমশালী আল্লাহর অভিশাপ"। এটি একটি সরাসরি ও গুরুতর অভিশাপ। কেউ যদি কোনো ব্যক্তিকে এই শব্দসমষ্টি বলে অভিশাপ দেয়, তবে তা শরীয়তের দৃষ্টিতে লানত হিসেবে গণ্য হবে।
হানাফি ফিকহের দলিল:
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (৫/৩৫৭): "إذا قال لشخص: لعنة الله عليك، فهو لعن وإن لم ينو اللعن"
"যদি কেউ কাউকে বলে: ‘আল্লাহর লানত তোমার উপর’, তবে তা লানত হবে, যদিও সে লানতের নিয়ত না করে।" - রদ্দুল মুহতার (৪/২৬২): "اللعن هو الطرد والإبعاد عن رحمة الله، وهو حرام على المسلم بغير حق"
"লানত হলো আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া, যা কোনো মুসলিমের জন্য অন্যায়ভাবে হারাম।"
৩. বাংলায় না বলে আরবিতে বললে কি ভিন্ন হবে?
না, ভাষার কারণে কোনো পার্থক্য নেই।
শরীয়তে লানত নির্ধারিত হয় অর্থ ও উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে, ভাষার ভিত্তিতে নয়। আরবি, বাংলা বা অন্য যেকোনো ভাষায় কাউকে লানত দিলে তা গুনাহ হবে।
প্রমাণ:
- ইমাম কাসানী (رحمه الله) বলেন: "العبرة في الأيمان والأقوال للمعاني لا للألفاظ" (বাদায়েউস সানা’ই ৩/২৩২)
"শপথ ও কথার ক্ষেত্রে বিবেচ্য হলো অর্থ, শব্দ নয়।" - তাই বাংলায় "তোমার উপর আল্লাহর অভিশাপ" বললেও তা লানত। আরবিতে বললেও হুবহু একই।
৪. লানতের প্রভাব কি সুদূরপ্রসারী?
হ্যাঁ, লানতের প্রভাব অত্যন্ত মারাত্মক ও সুদূরপ্রসারী।
লানত শুধু দুনিয়ায় নয়, আখিরাতেও ব্যক্তির জন্য ধ্বংস ডেকে আনে। তবে লানতের প্রভাব স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করে না; এটি আল্লাহর ইচ্ছাধীন।
প্রভাবসমূহ:
- দুনিয়াতে লানতপ্রাপ্ত ব্যক্তি আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হয়।
- আখিরাতে চিরস্থায়ী শাস্তির কারণ হতে পারে (যদি লানত হক্কানী হয়)।
- হাদিসে এসেছে: "যখন কোনো ব্যক্তি অন্যকে লানত দেয়, তখন সেই লানত আসমানে উঠে যায়, তারপর পৃথিবীতে নেমে আসে, কিন্তু কোনো পথ না পেয়ে ফিরে এসে লানত দাতার উপরই পড়ে, যদি না সে লানতের যোগ্য হয়।" (আবু দাউদ, সহিহ)
মুফতি মুহাম্মদ শফী (رحمه الله) বলেন: "লানত একটি ধারালো তরবারির মতো; তা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ব্যবহার করতে হবে। অন্যথায় লানত দাতার নিজের ক্ষতির কারণ হবে।" (মাআরিফুল কুরআন ২/৪৮০)
৫. লানত কিভাবে কাজ করে?
লানত একটি দোয়ার মতো যা আল্লাহর কাছে উপস্থাপিত হয়। তবে এটি জাদু বা যাদুর ন্যায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকরী নয় বরং আল্লাহ তা কবুল করেন বা প্রত্যাখ্যান করেন নিম্নলিখিত শর্ত সাপেক্ষে:
- যদি লানত হক্কানী হয় (প্রকৃত কাফির, মুশরিক বা জালিমের প্রতি), তবে তা কার্যকর হতে পারে।
- যদি লানত জুলুম হয় (নির্দোষ মুসলিমের প্রতি), তবে তা লানত দাতার উপর পতিত হয়।
ইমাম ইবনে আবেদীন (رحمه الله) বলেন: "اللعن إذا كان بغير حق يرجع إلى صاحبه"
"অন্যায় লানত তার দাতার দিকে ফিরে আসে।" (রদ্দুল মুহতার ৬/৩৯৫)
শেষ সিদ্ধান্ত ও পরামর্শ:
- কাউকে লানত দেওয়া হারাম এবং কঠিন গুনাহ, তা যেকোনো ভাষায় হোক।
- আপনি যদি "লানাতুল্লাহিল কাহহার" বলে কাউকে অভিশাপ দেন, তা স্পষ্ট লানত এবং আপনি গুনাহগার হবেন।
- লানতের প্রভাব মারাত্মক, তাই মুসলিমদের উচিত সবসময় দোয়া ও ক্ষমা প্রার্থনা করা, অভিশাপ নয়।
- তওবা করুন যদি আগে কাউকে লানত দিয়ে থাকেন। আল্লাহ বলেন: وَالَّذِينَ إِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً أَوْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللَّهَ فَاسْتَغْفَرُوا (আলে ইমরান: ১৩৫)
আল্লাহ আমাদের সকলকে লানতের গুনাহ থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
উত্তর প্রদানে সহায়ক গ্রন্থ:
- ফাতাওয়া উসমানী (৪/৪৫০)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/৩৯০)
- রদ্দুল মুহতার (৪/২৬২, ৬/৩৯৫)
- বাহিশতি জেওর (লানতের অধ্যায়)
- আল-হিদায়া (২/২০০)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (৫/৩৫৭)