ইসলামের দৃষ্টিতে একজন নারী কি একা হিজরত করতে পারে?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
উত্তর
সংক্ষেপে
উল্লেখিত অবস্থায় স্ত্রীর জন্য স্বামীর কাছে একাকী হিজরত করা জায়েজ নয়, যদি দূরত্ব শরিয়তের সফর (প্রায় ৪৮ মাইল বা ৭৭ কিমি) পরিমাণ হয়। তবে জরুরি অবস্থায় (যেমন ধর্মীয় নিরাপত্তা বা চরিত্র রক্ষার জন্য) কিছু হানাফি আলিম সুরক্ষিত দলের সাথে ভ্রমণের অনুমতি দিয়েছেন, তবে মাহরাম ব্যতীত একা যাওয়া নাজায়েজ। স্বামী দেশে ফিরে এলে তার বিপদের সম্ভাবনা থাকলে তাকে ফিরে আসা থেকে বিরত থাকতে হবে। উত্তম সমাধান হলো মাহরামের ব্যবস্থা করে স্ত্রীকে পাঠানো অথবা নিরাপদ স্থানে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করা।
বিস্তারিত আলোচনা
প্রশ্নের সারাংশ:
একজন মুজাহিদ হিজরত করছেন। তার পরিবার তাকে ত্যাগ করেছে এবং স্ত্রীর পরিবারও তার কাছে স্ত্রীকে যেতে দিচ্ছে না। স্বামী চরিত্র হেফাজতের জন্য স্ত্রীকে নিজের কাছে চান। স্ত্রী যেতে চায়, কিন্তু মাহরাম (পুরুষ অভিভাবক) না থাকায় যেতে পারছে না। স্ত্রী কি একা হিজরত করে স্বামীর কাছে যেতে পারে? এবং স্বামী দেশে ফিরে এলে কি তার বিপদ হতে পারে?
মূল নীতি:
হানাফি মাজহাবের মতে, একজন মহিলার জন্য শরিয়তের সফর (প্রায় ৪৮ মাইল বা তার বেশি) একা বা মাহরাম ব্যতীত যাওয়া জায়েজ নয়। হাদিসে এসেছে,
“কোনো মহিলা যেন মাহরাম ব্যতীত তিন দিনের পথ সফর না করে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১০৮৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৩৩৮)
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এবং ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতে, হজ ফরজ হলেও মহিলা মাহরাম ছাড়া যেতে পারে না। শুধুমাত্র ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) নিরাপদ দলের সাথে অনুমতি দিয়েছেন, কিন্তু ফতোয়া প্রচলিত ইমাম আবু হানিফার মত অনুসারে। (রদ্দুল মুহতার, ২/৪৬৩; আল-হিদায়া, ১/২১৩)
প্রযোজ্যতা:
এই ক্ষেত্রে স্ত্রী স্বামীর কাছে যেতে চান, যা এক ধরনের হিজরত। কিন্তু যদি স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে দূরত্ব সফর পরিমাণ হয়, তাহলে মাহরাম ছাড়া একা যাওয়া জায়েজ নয়। কারণ মহিলার নিরাপত্তা ও ইজ্জতের জন্য মাহরামের সঙ্গ আবশ্যক। ইমদাদুল ফতোয়া (২/১২৩) এই বিষয়টি স্পষ্ট করেছে।
তবে হানাফি মাজহাবে কিছু ইস্তিসনা (ব্যতিক্রম) আছে:
- যদি মহিলার জীবন বা ঈমানের জন্য ভয় থাকে এবং মাহরাম পাওয়া না যায়, তাহলে জরুরি অবস্থায় নিরাপদ দলের সাথে যেতে পারে। (ফতোয়া হিন্দিয়া, ১/২৫৮; শামি, ২/৪৬৪)
- কিন্তু এখানে স্ত্রীর জীবন বা ঈমানের হুমকি নেই বরং স্বামীর চরিত্র হেফাজতের প্রয়োজন। এটি জরুরি (ضرورة) হিসেবে গণ্য হবে কি? হানাফি ফুকাহার মতে, স্বামীর চরিত্র হেফাজতের জন্য স্ত্রীর জন্য মাহরাম ব্যতীত সফর জায়েজ নয়, কারণ এটি অপেক্ষাকৃত কম জরুরি। (তাহতাবী আলাল মারাকি, ২/৪৭)
স্বামীর দেশে ফেরা:
যদি স্বামী দেশে ফিরে আসেন এবং তার জন্য প্রাণ বা ধর্মের বিপদ হয়, তাহলে তার জন্য ফিরে আসা জায়েজ নয়। বরং তাকে হিজরত অবস্থায় থাকতে হবে এবং নিরাপদ উপায়ে স্ত্রীকে কাছে নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। (ফতোয়া উসমানী, ১/২৩৪)
সমাধানের পথ:
১. স্ত্রীর জন্য একজন মাহরাম (যেমন পিতা, ভাই, চাচা ইত্যাদি) তৈরি করা। পরিবার রাজি না হলে স্থানীয় ইমাম বা আলিমের মাধ্যমে রাজি করানোর চেষ্টা করা।
২. স্বামী নিজে নিরাপদ স্থানে চলে আসতে পারেন (যেখানে বিপদ নেই) এবং সেখানে স্ত্রী মাহরামের সাথে যেতে পারেন।
৩. যদি কোনো মাহরামই পাওয়া না যায়, তাহলে স্থানীয় আলিমদের সাথে পরামর্শ করে কোনো নির্ভরযোগ্য মহিলা দলের সাথে যাওয়ার অনুমতি নেওয়া যেতে পারে, যদিও এটি উত্তম নয়।
উপসংহার:
উল্লেখিত অবস্থায় স্ত্রীর একাকী হিজরত জায়েজ নয়। স্বামী দেশে ফিরে এলে বিপদের সম্মুখীন হতে পারেন। তাই মাহরামের ব্যবস্থা করেই স্ত্রীকে পাঠানো বা নিরাপদ স্থানে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করাই শ্রেয়। আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য সহজ পথ করে দিন।
মারকাজি রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার: ২/৪৬৩-৪৬৪ (মাহরাম ছাড়া সফর)
- আল-হিদায়া: ১/২১৩ (মহিলার সফর)
- ফতোয়া হিন্দিয়া: ১/২৫৮ (জরুরতের ক্ষেত্রে)
- ইমদাদুল ফতোয়া: ২/১২৩ (মহিলার হিজরত)
- ফতোয়া উসমানী: ১/২৩৪ (হিজরত অবস্থায় নিরাপত্তা)