ইমামের পিছনে সূরা ফাতিহা পড়ার সঠিক নিয়ম: কখন পড়বে, জোহর-আসরে কি শুধু ফাতিহা নাকি অন্য সূরাও?

Salah-Prayer · Ahle Hadith / Salafi

Question No: 3142
Questioner: Sadman
Question Asked: 26 Jul 2026, 08:21 PM
Reviewed & Published: 26 Jul 2026, 08:34 PM
Views: 38
Tokens: 6,078
This answer is according to the 'Ahle Hadith / Salafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

ইমামের পিছনে সূরা ফাতিহা কখন পড়তে হবে? ইমাম একটি আয়াত পড়লে মুক্তাদি একটি আয়াত পড়বে নাকি ইমাম সম্পূর্ণ সূরা পড়লে মুক্তাদীও সম্পূর্ণ সূরা পড়বেন? জোহর ও আসরের সালাতে কি মুক্তাদি শুধু সূরা ফাতিহা পড়বে নাকি সাথে অন্য সূরাও মিলাবে?

রুকুর সময় কি হাঁটু সোজা রাখতে হবে এমন কোনো নিয়ম আছে? হাঁটু সম্পূর্ণ সোজা রেখে রুকু আদায় করতে গেলে আমি পিঠ কোমর মাথা এক সোজা রাখতে পারিনা। পিঠ কোমর এবং মাথা এক সোজা রাখতে হলে আমার হাঁটু কিছুটা ভাঙতে হয়। সেক্ষেত্রে করণীয় কি যদি জানাতেন রেফারেন্সসহ বিশেষ করে সূরা ফাতিহা পড়ার বিষয়টি রেফারেন্সসহ জানালে অত্যন্ত উপকৃত হতাম

Answer

ইমামের পিছনে সূরা ফাতিহা পড়ার বিধান

১. সূরা ফাতিহা পড়া কি ওয়াজিব?

উত্তর: হ্যাঁ, ইমামের পিছনে সূরা ফাতিহা পড়া প্রত্যেক রাকাতে ওয়াজিব। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

لَا صَلَاةَ لِمَنْ لَمْ يَقْرَأْ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ
"যে ব্যক্তি সূরা ফাতিহা পড়েনি, তার নামায নেই।"
(সহীহ বুখারী: ৭৫৬, সহীহ মুসলিম: ৩৯৪)

ইমামের পিছনে থাকা অবস্থায়ও এই হুকুম প্রযোজ্য। রাসূল ﷺ বলেছেন:

لَعَلَّكُمْ تَقْرَءُونَ خَلْفَ إِمَامِكُمْ؟ قُلْنَا: نَعَمْ، قَالَ: لَا تَفْعَلُوا إِلَّا بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ فَإِنَّهُ لَا صَلَاةَ لِمَنْ لَمْ يَقْرَأْ بِهَا
"তোমরা কি ইমামের পিছনে পড়ো? আমরা বললাম: হ্যাঁ। তিনি বললেন: তা করো না, তবে সূরা ফাতিহা পড়ো, কারণ যে এটি পড়েনি তার নামায নেই।"
(সহীহ আবু দাউদ: ৮২৩, সহীহ ইবনে খুযাইমা: ১৬২২, শায়খ আলবানী সহীহ বলেছেন)

২. জোহর ও আসরের সালাতে কি অন্যান্য সূরাও পড়বে?

উত্তর: জোহর ও আসরের সালাতে ইমাম চুপে চুপে কিরাত করে। মুক্তাদির জন্য শুধু সূরা ফাতিহা পড়াই যথেষ্ট এবং এটাই ওয়াজিব। অন্য সূরা মেলানো জরুরি নয়, বরং কিছু সালাফ এটাকে অপছন্দ করেছেন যখন ইমাম কিরাত করছেন তখন অন্য সূরা পড়া। শায়খ ইবনে বায ও শায়খ ইবনে উসাইমীন বলেন: জোহর ও আসরে মুক্তাদি শুধু সূরা ফাতিহা পড়বে, অন্য সূরা পড়বে না। তবে কেউ পড়তে চাইলে নিষেধ নেই, কিন্তু উত্তম হলো শুধু ফাতিহা পড়া। (মাজমু' ফাতাওয়া ইবনে বায, ১১/২২২; ফাতাওয়া ইবনে উসাইমীন, ১৫/১৫৫)

৩. ইমাম এক আয়াত পড়লেও কি মুক্তাদি সম্পূর্ণ ফাতিহা পড়বে?

উত্তর: ইমাম যে কোনো অবস্থায় থাকুক না কেন, মুক্তাদি সম্পূর্ণ সূরা ফাতিহাই পড়বে। ইমাম এক আয়াত পড়লেও মুক্তাদি তার সম্পূর্ণ ফাতিহা পড়ে নেবে। কারণ ফাতিহা পুরো সূরা হিসেবে পড়ার নির্দেশ, আয়াত হিসেবে নয়। শায়খ ইবনে উসাইমীন বলেন:

"মুক্তাদি ইমামের যেকোনো অবস্থায় সূরা ফাতিহা সম্পূর্ণ পড়ে নেবে, ইমাম চুপে থাকুক বা উচ্চস্বরে পড়ুক।"
(আশ-শারহুল মুমতি', ৩/২৭২)

৪. ফাতিহা পড়ার সময়: ইমাম যখন শুরু করে নাকি যখন চুপ থাকে?

উত্তর: কথিত মতানৈক্যের সমাধান হলো:

  • উচ্চস্বরে কিরাতের সময় (ফজর, মাগরিব, ইশা): ইমামের কিরাত শেষে বা ইমাম যখন থামে (যেমন: আয়াতের মাঝে বিরতি) তখন পড়বে।
  • নীরব কিরাতের সময় (জোহর, আসর): ইমামের কিরাত শুরুর পরপরই পড়বে, কারণ কেউ শুনছে না।
  • উত্তম পদ্ধতি: ইমাম যখন ফাতিহা শুরু করে, তখন মুক্তাদি নীরবে একসাথে পড়বে। কিছু হাদীসে এসেছে যে সাহাবীগণ ইমামের পিছনে ফাতিহা পড়তেন (সহীহ বুখারী, বাবু জাহার)।

শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ বলেন: "ইমামের পিছনে ফাতিহা পড়া ওয়াজিব, তবে ইমাম যখন উচ্চস্বরে পড়ে তখন মুক্তাদি নীরবে পড়বে।"
(মাজমু' ফাতাওয়া, ২৩/২৭৪)


রুকুতে হাঁটুর অবস্থান ও পিঠ সোজা রাখা

১. রুকুতে পিঠ-মাথা-কোমর সোজা রাখার বিধান

রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর রুকু ছিল পূর্ণ সোজা, যেমন হাদীসে এসেছে:

كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ إِذَا رَكَعَ سَوَّى ظَهْرَهُ وَلَمْ يُصَوِّبْ رَأْسَهُ وَلَمْ يَرْفَعْهُ
"রাসূল ﷺ যখন রুকু করতেন, তখন তাঁর পিঠ সোজা রাখতেন, মাথা নিচু করতেন না বা উপরে তোলেন না (বরং মাথা পিঠের সমান রাখতেন)।"
(সহীহ আবু দাউদ: ৮৬২, সহীহ ইবনে মাজাহ: ৮৭১, শায়খ আলবানী সহীহ বলেছেন)

২. হাঁটু কি সম্পূর্ণ সোজা রাখতে হবে?

উত্তর: রুকুতে পা সোজা থাকে, কিন্তু হাঁটুতে চাপ দিয়ে সম্পূর্ণ সোজা করার কোনো বিধান নেই। রুকুর সময় হাঁটু স্বাভাবিকভাবে কিছুটা বাঁকা থাকে, সেটাই স্বাভাবিক অবস্থা। বরং গুরুত্ব হলো:

  • পিঠ সোজা রাখা (যেন তার উপর পানি ঢাললে গড়িয়ে পড়ে)
  • মাথা পিঠের সমান রাখা (নিচু বা উঁচু না করা)

হাঁটু সম্পূর্ণ সোজা করলে অস্বাভাবিক অবস্থা তৈরি হয় এবং পিঠ সোজা রাখা কঠিন হয়। তাই হাঁটু স্বাভাবিক বাঁকা রেখে পিঠ সোজা রাখাই সুন্নত

শায়খ ইবনে উসাইমীন বলেন: "রুকুর সুন্নত হলো পিঠ সোজা রাখা, কিন্তু হাঁটু সোজা করার প্রয়োজন নেই। হাঁটু মানুষের স্বাভাবিক গঠন অনুযায়ী বাঁকা থাকে।"
(আশ-শারহুল মুমতি', ৩/৮৩)

৩. আপনার সমস্যার সমাধান

আপনি যদি পিঠ সোজা রাখতে গিয়ে হাঁটু ভাঙতে বাধ্য হন, তাহলে স্বাভাবিক অবস্থায় হাঁটু কিছুটা বাঁকা থাকাটাই ঠিক। পিঠ সোজা করার চেষ্টা করুন, হাঁটুতে চাপ দেবেন না। নিম্নোক্ত বিষয়গুলো মনে রাখুন:

  • রুকুতে পিঠ ও মাথা সমান্তরাল রাখাই মূল লক্ষ্য
  • হাঁটু বাঁকা থাকলে নামায নষ্ট হয় না
  • অনেকের শারীরিক গঠনে পিঠ পুরোপুরি সোজা রাখা কষ্টকর, সেক্ষেত্রে সাধ্যানুযায়ী চেষ্টাই যথেষ্ট

শায়খ সালেহ আল-ফাওজান বলেন: "রুকুতে পিঠ সোজা রাখা সুন্নত, কিন্তু যদি কেউ না পারে তাহলে তার সাধ্যানুযায়ী করবে, নামায সহীহ হবে।"
(আল-মুনতাকা মিন ফাতাওয়া আল-ফাওজান, ২/২৪)

সারসংক্ষেপ সুন্নত পদ্ধতি:

  1. হাঁটু স্বাভাবিক বাঁকা রেখে দাঁড়ান
  2. পিঠ সোজা করে ঝুঁকুন (যেন পিঠ সমতল হয়)
  3. মাথা পিঠের সমান রাখুন (নিচে বা উপরে না)
  4. হাত হাঁটুর উপর রাখুন (আঙুল ফাঁকা করে)

রাসূল ﷺ বলেছেন: "যখন তোমরা রুকু করো, তখন তোমরা হাত হাঁটুর উপর রাখো এবং পিঠ সোজা রাখো।"
(সহীহ ইবনে খুযাইমা: ৫৯২, শায়খ আলবানী সহীহ বলেছেন)


রেফারেন্সসূত্র:

  1. সহীহ বুখারী (৭৫৬), সহীহ মুসলিম (৩৯৪) – সূরা ফাতিহা ওয়াজিব
  2. সহীহ আবু দাউদ (৮২৩) – ইমামের পিছনে ফাতিহা পড়া
  3. মাজমু' ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়্যাহ (২৩/২৭৪)
  4. ফাতাওয়া ইবনে বায (১১/২২২)
  5. আশ-শারহুল মুমতি' ইবনে উসাইমীন (৩/২৭২, ৩/৮৩)
  6. আল-মুনতাকা মিন ফাতাওয়া আল-ফাওজান (২/২৪)
  7. সহীহ আবু দাউদ (৮৬২) – রুকুতে পিঠ সোজা রাখা

আল্লাহই সর্বজ্ঞ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.