স্বপ্নে কুরআন পড়ার অর্থ কি?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
আমি স্বপ্নে দেখলাম আমি কুরআন তিলাওয়াত করছি।আমার সাথে আমার একটা বোন কথা বলতে আসলে কুরআনের পাতা গুলোর সেলাই খুলে একটু উলটা পালটা হয়ে যায়।তখন আমি বলছিলাম সূরা কাহাফ কোথায়,পাতাগুলো এক করতে হবে,পড়তে হবে আমার।আমি খুজছিলাম একসাথে করার জন্য কিন্তু পাচ্ছিলাম না।
(আমি প্র্যাকটিসিং,মেয়ে
এবং শরীর বেশ খারাপ থাকায় এশার নামায টা পড়তে পারি নি,ঘুমায়ে গেছিলাম..এরপর স্বপ্ন টা দেখি)
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় প্রশ্নকারী বোন, আপনার স্বপ্নের বিবরণ দিয়ে প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। স্বপ্ন নিয়ে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বলতে গেলে, স্বপ্ন তিন প্রকার: (১) আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ, (২) শয়তানের পক্ষ থেকে ভীতি বা দুশ্চিন্তা এবং (৩) নিজের মনের কল্পনা ও দৈনন্দিন চিন্তার প্রতিফলন। (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৬৪৯২; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২২৬৩)
আপনি স্বপ্নে দেখেছেন যে আপনি কুরআন তিলাওয়াত করছেন, কিন্তু একটি বোনের সাথে কথা বলার সময় কুরআনের পাতার সেলাই খুলে গিয়ে পাতাগুলো উল্টা-পাল্টা হয়ে যায়। আপনি সূরা কাহাফ খুঁজছিলেন কিন্তু পাচ্ছিলেন না।
স্বপ্নের সম্ভাব্য ব্যাখ্যা:
১. কুরআন তিলাওয়াত করা: এটি একটি ভালো স্বপ্ন। কুরআন তিলাওয়াত করা ইমান, নেকি ও হিদায়াতের প্রতীক। স্বপ্নে কুরআন পড়া দেখলে সাধারণত তা দ্বীনের প্রতি আগ্রহ ও ভালোবাসার ইঙ্গিত বহন করে। ইমাম ইবনে সিরীন (রহ.)-এর মতে, স্বপ্নে কুরআন তিলাওয়াত করা সত্য পথে থাকার ও নেক কাজে অগ্রসর হওয়ার নিদর্শন। (তাফসীরুল আহলাম, ইবনে সিরীন)
২. পাতার সেলাই খুলে যাওয়া ও উল্টা-পাল্টা হওয়া: এটি আপনার বর্তমান মানসিক অবস্থার প্রতিফলন হতে পারে। আপনি শরীর খারাপ থাকায় এশার নামাজ পড়তে পারেননি এবং ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। এর ফলে আপনার মনে সম্ভবত এক ধরনের অস্বস্তি ও অস্থিরতা কাজ করছিল। স্বপ্নে কুরআনের পাতা এলোমেলো হওয়া আপনার ইবাদত ও সময়ের প্রতি অনিয়ম বা দুনিয়ার ব্যস্ততায় দ্বীনি কাজে ব্যাঘাত ঘটার ইঙ্গিত দিতে পারে।
৩. সূরা কাহাফ খোঁজা ও না পাওয়া: সূরা কাহাফ একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ সূরা। এর ফজিলত সম্পর্কে হাদীসে এসেছে, যে ব্যক্তি জুমার দিন সূরা কাহাফ পড়বে, তার জন্য দুই জুমার মধ্যবর্তী সময়ে নূর (আলো) হবে। (মুস্তাদরাক হাকিম, ২/৩৬৮) স্বপ্নে সূরা কাহাফ খোঁজা আপনার আধ্যাত্মিক সুরক্ষা ও হিদায়াতের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করে। তবে পাতা এলোমেলো থাকায় তা না পাওয়া বর্তমানে আপনার মধ্যে বিদ্যমান কিছু অস্থিরতা বা শারীরিক দুর্বলতার কারণে নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত ও জিকিরে অলসতা আসার ইঙ্গিত দিতে পারে।
৪. সতর্কতা: শাইখুল হাদীস মাওলানা মুহাম্মদ জাকারিয়া কান্ধলবী (রহ.) স্বপ্ন সম্পর্কে বলেন, “সাধারণত কোনো স্বপ্ন দেখলে তার দ্বারা কোনো বিধান বা সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়, বরং তা ভালো হলে শুকরিয়া আদায় করবে এবং মন্দ হলে শয়তানের প্ররোচনা মনে করে বাম দিকে তিনবার থুথু ফেলে (শুকনোভাবে) আল্লাহর কাছে পানাহ চাইবে।” (আদাবুল মুআশারাত, পৃষ্ঠা ৩৭)
হানাফী ফিকহের আলোকে করণীয়:
তাই আপনার জন্য আমার পরামর্শ:
১. নামাজের কাজা আদায় করুন: আপনি শরীর খারাপ থাকায় এশার নামাজ পড়তে পারেননি। নামাজের কাজা আদায় করা ফরয। যখনই সুস্থ হবেন বা সময় পাবেন, তখনই উক্ত নামাজের কাজা পড়ে নিন। (ফতোয়া হিন্দিয়া, ১/১২৪; রদ্দুল মুহতার, ২/৭৯)
২. সূরা কাহাফ নিয়মিত পড়ুন: বিশেষ করে প্রতি জুমার দিন সূরা কাহাফ পড়ার অভ্যাস করুন। এটি আপনার দ্বীনি আগ্রহকে আরো দৃঢ় করবে এবং শয়তানের প্ররোচনা থেকে রক্ষা করবে।
৩. দুআ ও ইস্তিগফার করুন: স্বপ্নের কারণে কোনো ভয় বা দুশ্চিন্তা না করে, এই স্বপ্নকে আপনার ইমান ও আমলের প্রতি আরো যত্নবান হওয়ার সংকেত হিসেবে নিন। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান এবং দ্বীনের উপর অটল থাকার জন্য দুআ করুন।
৪. স্বপ্ন নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা না করা: ইসলামী আকীদায় স্বপ্নের শরয়ী কোনো মূল্য নেই। তাই কেবল ভালো স্বপ্নের ব্যাখ্যা আশা করা উচিত এবং মন্দ স্বপ্ন দেখলে তা উপেক্ষা করা উচিত। যেমন হাদীসে এসেছে, “যদি কেউ অপছন্দনীয় কিছু দেখে, তবে সে যেন বাম দিকে তিনবার থুথু ফেলে এবং আল্লাহর কাছে শয়তানের অনিষ্ট থেকে পানাহ চায়।” (মুসলিম, হাদীস: ২২৬২)
রেফারেন্স সমূহ:
- সহীহ বুখারী, হাদীস: ৬৪৯২
- সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২২৬২, ২২৬৩
- তাফসীরুল আহলাম লি ইবনে সিরীন
- ফতোয়া হিন্দিয়া, ১/১২৪
- রদ্দুল মুহতার, ২/৭৯
- আদাবুল মুআশারাত, মাওলানা মুহাম্মদ জাকারিয়া কান্ধলবী (রহ.)
আল্লাহ তাআলা আপনাকে সহীহ-সুস্থতা দান করুন এবং দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন। আমীন।