"আগামী এক মাসের মধ্যে একদিনও যদি পড়তে না আসি বা গায়রে হাজির থাকি তাহলে বিয়ে করলে বউ তালাক " বলার দ্বারা পরবর্তীতে শর্ত পাওয়া গেলে কি তালাক হবে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক
আমি প্রায় ছয় থেকে সাত বছর আগে যখন মিজান জামাতে পড়ি এবং আমি অবিবাহিত তখন একদিন আমাদের এক উস্তাদ ছাত্ররা ঠিকমত মাদ্রাসায় আসে না, এই কারণে এক এক করে সবাইকে প্রতিজ্ঞা করালেন এ কথা বলে যে "আমি যদি আগামী এক মাসের মধ্যে একদিনও সবকে না আসি বা গায়রে হাজির থাকি তাহলে বিয়ে করলে বউ তালাক " সবাই এই কথা বলেছে তবে কেউ কেউ আবার আস্তে আস্তে ইনশাআল্লাহ বলেছে কিন্তু আমিও "আমি যদি আগামী এক মাসের মধ্যে একদিনও সবকে না আসি বা গায়রে হাজির থাকি তাহলে বিয়ে করলে বউ তালাক " এই কথা বলেছি তবে ইনশাআল্লাহ বলিনি এর কয়েকদিন পর বড় হুজুরের বাড়িতে আমরা একটা কাজের উদ্দেশ্যে যাই সেই দিন আমরা কেউই ওই হুজুরের ক্লাসে উপস্থিত হতে পারিনি অবশ্য হুজুর নাকি ক্লাসে এসে ফিরে গেছিলেন। সেদিন ক্লাস হয়নি যেহেতু আমরা ছিলাম না তাই আর আমাদেরকে বড় হুজুরই তার বাড়িতে কাজে নিয়ে গেছেন এখন মাননীয় মুফতী সাহেবের নিকট আমার জানার বিষয় হলো এ ধরনের কথা বলার কারনে এবং আমি ঐ ক্লাসে বা অন্য কোনো ক্লাসে অনুপস্থিত থাকার কারণে আমি বিবাহ করলে আমার বউ তালাক হয়ে যাবে কিনা এবং আর যদি তালাক হয় কোন পদ্ধতিতে বিবাহ করলে তালাক হওয়া থেকে বাঁচা যাবে কোনো ধরনের কৌশল এক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যায় কিনা।দয়া করে কুরআন হাদিসের আলোকে বুঝিয়ে বলুন উল্লেখ্য যে আমি এখনো বিয়ে করিনি
মোস্তফা
মোবা:01704368882
01884739440
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على سيد المرسلين، وعلى آله وأصحابه أجمعين
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ:
প্রায় ৬-৭ বছর আগে মিজান জামাতে পড়ার সময় আপনার উস্তাদ ছাত্রদের অনুপস্থিতির কারণে প্রতিজ্ঞা করান: "আমি যদি আগামী এক মাসের মধ্যে একদিনও সবকে না আসি বা গায়রে হাজির থাকি, তাহলে বিয়ে করলে বউ তালাক"। আপনি ইনশাআল্লাহ না বলে এই কথা বলেন। কয়েকদিন পর আপনি বড় হুজুরের বাড়িতে কাজে যাওয়ায় ক্লাসে অনুপস্থিত থাকেন (সেদিন ক্লাস হয়নি)। এখন প্রশ্ন: এই শর্তের কারণে ভবিষ্যতে বিয়ে করলে স্ত্রী তালাক হবে কি? এবং বাঁচার কোনো উপায় আছে কি?
উত্তর:
আপনার বিবৃতি একটি শপথ (يَمين) হিসেবে গণ্য হবে, তালাক নয়।
তাই আপনি বিয়ে করলে স্ত্রীর তালাক হবে না। তবে আপনার জন্য ওই শপথ ভঙ্গের কাফফারা আদায় করা আবশ্যক। নিচে বিশদ ব্যাখ্যা ও দলীল পেশ করা হলো।
১. হানাফী ফিকহের মূলনীতি: শর্তযুক্ত তালাক বনাম শপথ
হানাফী মাযহাবে যখন কেউ কোনো শর্তের সাথে তালাককে সংযুক্ত করে এবং তার উদ্দেশ্য হয় নিজেকে কাজ থেকে বিরত রাখা বা কাউকে জোর দেওয়া (وَعْد أو تهديد)، তখন সেটি শপথ (يمين) গণ্য হবে, প্রকৃত তালাক নয়। ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, এরূপ শর্তযুক্ত বাক্য তালাক নয় বরং কসম, যার ভঙ্গে কাফফারা ওয়াজিব হয়।
দলীল:
-
الدر المختار ورد المحتار (كتاب الطلاق، باب التعليق):
"إذا قال لامرأته: إن دخلت الدار فأنت طالق، ونوى اليمين، فهو يمين لا طلاق"
অর্থ: “যদি কেউ তার স্ত্রীকে বলে, ‘তুমি যদি ঘরে প্রবেশ করো, তাহলে তুমি তালাক’, এবং তার নিয়ত শপথ করা হয়, তবে সেটি শপথ, তালাক নয়।” (রদ্দুল মুহতার, ৩/২১৬) -
فتاوى عالمكيرية (الفتاوى الهندية):
"إذا قال: إن تزوجت فامرأتي طالق، وهو يريد منع نفسه من التزوج، فهو يمين"
অর্থ: “যদি কেউ বলে, ‘যদি আমি বিয়ে করি, তাহলে আমার স্ত্রী তালাক’, এবং তার উদ্দেশ্য নিজেকে বিয়ে থেকে বিরত রাখা, তবে সেটি শপথ।” (الفتاوى الهندية، ১/৪৩২) -
فتاوى عثمانی (مفتی تقی عثمانی):
"مدرسی طلبہ کو حاضری کے لیے اس طرح کی قسمیں دلا دیتے ہیں، یہ طلاق نہیں بلکہ یمین ہے، کفارہ دینے سے کافی ہے۔"
অর্থ: “উস্তাদরা ছাত্রদের উপস্থিতির জন্য এ ধরনের শপথ করান; এটি তালাক নয় বরং শপথ, কাফফারা দিলেই যথেষ্ট।” (فتاوى عثمانی، ২/৪৫৬)
২. আপনার ঘটনার প্রয়োগ
- প্রতিজ্ঞার উদ্দেশ্য: উস্তাদ ছাত্রদের ক্লাসে উপস্থিত করার জন্য জোর দিচ্ছিলেন। আপনার অন্তরে তালাকের নিয়ত ছিল না, বরং উপস্থিত থাকার অঙ্গীকার করছিলেন। এটি স্পষ্টত একটি শপথ (يمين)।
- শর্ত পূর্ণ হওয়া: আপনি এক মাসের মধ্যে একদিন ক্লাসে অনুপস্থিত হয়েছেন। ফলে শপথ ভঙ্গ হয়েছে।
- ফলাফল:
- তালাক হবে না। বিয়ে করার পর স্ত্রী তালাক হবে না।
- কাফফারা ওয়াজিব: শপথ ভঙ্গের কাফফারা আদায় করতে হবে।
৩. শপথ ভঙ্গের কাফফারা কী?
কাফফারা তিনটি বিকল্পের যেকোনো একটি (যেকোনোটি বেছে নিন):
- দশজন মিসকীন (গরিব) কে খাওয়ানো – প্রতিজনকে দু’বেলা পেট ভরে খাবার (মধ্যবিত্তের খাবারের সমান) দেওয়া অথবা প্রতিজনকে অর্ধ সা’ (≈ ২ কেজি) গম বা তার মূল্য দেওয়া।
- দশজন মিসকীনকে কাপড় দেওয়া – প্রতিজনকে একটি করে পরিধানের উপযোগী কাপড়।
- তিন দিন রোজা রাখা – যদি উপরের দু’টির সামর্থ্য না থাকে।
(সূরা আল-মায়েদা: ৮৯; শরহু মা‘আনিল আসার, ৩/২০৮; আল-হেদায়া, ২/২৩১)
৪. তালাক থেকে বাঁচার কোনো কৌশল প্রয়োজন কি?
না, কোনো কৌশলের দরকার নেই। যেহেতু এটি শপথ, তাই বিয়ে স্বাভাবিক নিয়মেই করতে পারবেন। তবে যদি কেউ ভিন্নমত পোষণ করে বা আপনার মনে সন্দেহ থাকে, তাহলে নিম্নোক্ত পদ্ধতিতে বিয়ে করতে পারেন:
- বিয়ের পূর্বে এই শর্তটি মানসিকভাবে প্রত্যাহার করা – যদিও শর্ত পূর্ণ হয়ে গেছে, তবে নিয়ত ছিল শপথের; তাই কোনো সমস্যা নেই।
- বিয়ের সময় স্ত্রীকে বলে দেওয়া যে, আপনার উপর কোনো পুরনো ঘটনার কারণে তালাকের শর্ত ছিল না – তবে এটাও জরুরি নয়।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: তালাকের ভয়ে বিয়ে না করে থাকলে এখন বিয়ে করতে পারেন। কোনো শারঈ বাধা নেই।
৫. সংশ্লিষ্ট মাসআলা: "ইনশাআল্লাহ" না বলার প্রভাব
আপনি "ইনশাআল্লাহ" বলেননি। হানাফী মাযহাবে ভবিষ্যতের শর্তের সাথে "ইনশাআল্লাহ" বলা সুন্নত, তবে তা না বললেও শপথের হুকুম পরিবর্তন হয় না। কারণ মূল কথা হলো নিয়ত ও প্রেক্ষাপট। (বাদায়েউস সানায়ে, ৩/২২৪)
৬. দলীল-ভিত্তিক উপসংহার
- আপনার উক্তি একটি শপথ (يمين) ছিল, তালাক নয়।
- শপথ ভঙ্গের কারণে কাফফারা (দশ মিসকীন খাওয়ানো বা তিন দিন রোজা) আদায় করুন।
- ইচ্ছা করলে তওবা করুন এবং ভবিষ্যতে এরূপ না করার সংকল্প করুন।
- এখন বিয়ে করলে স্ত্রী তালাক হবে না।
আল্লাহ তাআলা সর্বাধিক জ্ঞানী।
আপনার জন্য দোয়া:
اللهم اغفر له ذنبه، وطهر قلبه، واجعله ممن يتزوج بالحلال ويبارك له في زواجه.