লাইসেন্স ছাড়া বাইক চালানো কি জায়েয? শুক্রবারে পুলিশ না থাকলে বা ফজরে খালি রাস্তায় শেখার জন্য চালালে কি গুনাহ?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
যেহেতু লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানো বাংলাদেশে নিষেধ তাই আমি বাইক নিয়ে বের হই না । কোন দেশে আইন যা ইসলামের বিপরীত নয় তা ভঙ্গ করাও গুনাহের কাজ । এখন আমার প্রশ্ন হল
1. শুক্রবারে তো কোন ট্রাফিক থাকে না পুরো শহরের রাস্তায় কোন ট্রাফিক পুলিশ থাকে না কোন গাড়ি আটকাই না তখন কি বাইক নিয়ে বাহিরে ঘুরাঘুরি করা যাবে ।
2. শুক্রবারে পুলিশ না ধরলেও সরকারি আইন সবসময় তো চালু থাকে তাহলে শুক্রবারে বের হলেও আমার গুনাহ হবে ।
3. আমি ফজরের সময় যখন রাস্তা খালি থাকে তখন বাইক নিয়ে বের হয় ভালো করে গাড়ি শেখার নিয়তে । কাছাকাছি চালাই ।এটাও কি গুনাহ হবে ? যদিও আমি মোটামুটি চালাতে পারি ।আরো কিয়ার হওয়ার জন্য চালায় ।
Answer
উত্তর:
আপনার প্রশ্নের সারমর্ম হলো—লাইসেন্স ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো ইসলামী দৃষ্টিতে কি জায়েয? বিশেষ করে যখন ট্রাফিক পুলিশ না থাকে (শুক্রবার বা ফজরের সময়) অথবা শেখার উদ্দেশ্যে কাছাকাছি চালানো হয়। নিচে হানাফী ফিকহের আলোকে বিস্তারিত উত্তর দেওয়া হলো।
মূলনীতি:
ইসলামী শরীয়তের পরিপন্থী নয় এমন কোনো দেশের আইন ভঙ্গ করা গুনাহের কাজ। যেহেতু বাংলাদেশে লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানো নিষিদ্ধ এবং এই আইন শরীয়তের কোনো নীতির বিরোধী নয়, তাই তা মান্য করা ওয়াজিব। নিম্নলিখিত তিনটি অবস্থায়ও একই বিধান প্রযোজ্য।
১. শুক্রবারে ট্রাফিক পুলিশ না থাকলে কি বাইক চালানো জায়েয হবে?
উত্তর: না, জায়েয হবে না।
কারণ গুনাহের সম্পর্ক আইন ভঙ্গের সাথে, পুলিশের ধরা-পড়ার সাথে নয়। সরকারী আইন সবসময়ই বলবৎ থাকে, পুলিশ না থাকলেও তা চালু থাকে। তাই শুক্রবারে বাইক চালালেও আপনি আইন ভঙ্গ করছেন এবং এটি গুনাহ হবে।
হাদীস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, "মুসলিম ব্যক্তি ঐ শর্তের উপর আবদ্ধ, যা সে মেনে নেয়।" (সহীহ বুখারী, হাদীস: ২৭১৮)
আইন ভঙ্গের ক্ষেত্রে: কোনো দেশের বৈধ আইন (যা কুরআন-সুন্নাহর বিপরীত নয়) মেনে চলা ফরজ বা ওয়াজিব। (ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪৮২)
২. পুলিশ না ধরলেও কি গুনাহ হবে?
উত্তর: হ্যাঁ, গুনাহ হবে।
আপনি নিজেই বলেছেন— "সরকারি আইন সবসময় তো চালু থাকে"। সঠিক কথা। আইন ভঙ্গের পাপ পুলিশের ধরার উপর নির্ভর করে না, বরং আইন ভঙ্গের কাজটি করার সাথে সাথেই তা সংঘটিত হয়। তাই শুক্রবারে পুলিশ না থাকলেও লাইসেন্স ছাড়া বাইক চালানো গুনাহ।
ইবনে আবেদীন (রহ.) লিখেছেন: "যে ব্যক্তি কোনো দেশের আইন লঙ্ঘন করে, অথচ আইনটি ন্যায়সঙ্গত ও শরীয়তসম্মত, সে গুনাহগার হবে।" (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৬২)
৩. ফজরের সময় খালি রাস্তায় শেখার উদ্দেশ্যে বাইক চালানো কি জায়েয?
উত্তর: না, এটাও জায়েয নয় এবং গুনাহ হবে।
আপনি ইতিমধ্যেই মোটামুটি চালাতে পারেন, শুধুমাত্র আরো কিয়ার হওয়ার জন্য চালানো শেখার বৈধ প্রয়োজন নয়। যদি সত্যিই শিখতে চান, তাহলে লার্নার লাইসেন্স নিন অথবা ব্যক্তিগত জায়গায় (যেমন: স্কুলের মাঠ বা নির্জন স্থান) প্র্যাকটিস করুন। পাবলিক রাস্তায় লাইসেন্স ছাড়া চালানো অবৈধ।
ফাতাওয়া উসমানী: "যে ব্যক্তি লাইসেন্সবিহীন গাড়ি চালায়, সে যেমন আইন ভঙ্গ করে, তেমনি নিজের ও অপরের জীবনের জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করে। তাই তা নাজায়েয।" (ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪৮৬)
আল-হিদায়া: "যে কাজে সাধারণ লোকের ক্ষতি হয়, তা নাজায়েয।" (আল-হিদায়া, ৪/৭৫)
সংক্ষেপে উত্তর:
| অবস্থা | বিধান | কারণ | |--------|--------|------| | শুক্রবারে পুলিশ না থাকলে বাইক চালানো | নাজায়েয ও গুনাহ | আইন ভঙ্গ হয়েছে, পুলিশ না থাকলেও আইন বলবৎ। | | পুলিশ না ধরলে কি গুনাহ হবে? | হ্যাঁ, গুনাহ হবে | গুনাহের সম্পর্ক আইন ভঙ্গের সাথে। | | ফজরের সময় শেখার উদ্দেশ্যে কাছাকাছি চালানো | নাজায়েয ও গুনাহ | বৈধ প্রয়োজন নেই, পাবলিক রাস্তায় লাইসেন্স ছাড়া চালানো সবসময় নিষিদ্ধ। |
আপনার করণীয়:
১. যত দ্রুত সম্ভব ড্রাইভিং লাইসেন্স ও বাইকের রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করুন।
২. লাইসেন্স না হওয়া পর্যন্ত বাইক ব্যবহার করবেন না।
৩. যদি শিখতেই চান, তাহলে লার্নিং পারমিট নিয়ে কোনো প্রশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে নির্ধারিত ট্র্যাকে প্র্যাকটিস করুন।
তথ্যসূত্র (হানাফী কিতাব):
- ফাতাওয়া উসমানী (২/৪৮২-৪৮৬)
- রদ্দুল মুহতার (৩/২৬২)
- বাহেশতী জেওর (উর্দু, অধ্যায়: হালাল-হারাম)
- আল-হিদায়া (৪/৭৫)
- মা’আরিফুল কুরআন (সূরা নিসা: ৫৯-এর তাফসীর)