মসজিদে দিতীয় জামাত করা প্রসঙ্গে
Salah-Prayer · Hanafi
Question
শ্রদ্ধেয় মুক্তি সাহেবগণ,
প্রথম প্রশ্নঃ
কোনো ওয়াক্তিয়া বা জামে মসজিদে যদি নির্ধারিত সময়ে জামাত সম্পন্ন হয়ে যায় এবং পরে কয়েকজন নতুন মুসল্লি মসজিদে আসে তখন তারা এক হয়ে কি নতুন আরেকটি জামাত করতে পারবে? নাকি একাকি নামাজ পড়াই উত্তম এই পরিস্থিতিতে?
এবিষয়ে পরিস্কার ভাবে যদি জানতে পারি তাহলে সেভাবে আমল করে চলতে সুবিধা হবে ইনশাআল্লাহ।
দিতীয় প্রশ্নঃ
ইলমে ফারায়েজ বা ফারায়েজ বন্টন তো মৃত্যুর পরে সংঘটিত হয় কোনো ব্যাক্তির। কিন্তু আমার এলাকায় এক চাচাকে দেখলাম তিনি তার বউকে জমি লিখে দিছেন এই ভয়ে যে তার ছেলে সন্তান নাই শুধু দুই মেয়ে তাই কোনো ভাবে যেনো তার সম্পদ তার ভাই বা ভাতিজা না পায় তাই।
এভাবে ইচ্ছাকৃতভাবে কি মৃত্যুর পুর্বে বউ বা মেয়ে বা অন্য কাউকে এভাবে সম্পদ লিখে দেয়াটা উচিত হবে যাতে অন্য কেউ তার সম্পদ থেকে অংশ না পায়?
দয়া করে জানালে অনেক উপকৃত হবো ইনশাআল্লাহ।
جزاك الله خيرا كثيرا
Answer
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
উত্তর প্রদানে: ইসলামী আইন ও ফতোয়া বিভাগ
প্রথম প্রশ্ন: মসজিদে দ্বিতীয় জামাত করা প্রসঙ্গে
উত্তর:
হানাফী মাযহাবের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী, যে মসজিদে নির্ধারিত সময়ে প্রথম জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেই মসজিদে পুনরায় দ্বিতীয় জামাত করা মাকরূহ তাহরীমী (নিষিদ্ধের কাছাকাছি) বা মাকরূহ তানযীহী (অপছন্দনীয়) বলে গণ্য। ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, দ্বিতীয় জামাত মাকরূহ। তবে ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, এটি জায়েয কিন্তু মাকরূহ তানযীহী। অধিকাংশ ফুকাহার মতে, যদি মসজিদের কোনো নির্ধারিত ইমাম ও মুয়াজ্জিন থাকে এবং প্রথম জামাতের পর আরেক দল জামাত করে, তাহলে তা মাকরূহ। কিন্তু যদি মসজিদটি সাধারণ হয় (যেমন: কোনো নির্ধারিত ইমাম নেই) এবং দ্বিতীয় জামাতকারীরা প্রথম জামাতের ইমাম বা মুক্তাদি না হন, তাহলে কিছু ফুকাহা তা জায়েয বলেছেন। তবে উত্তম হলো যে, তারা একাকী নামায পড়ে নেবে অথবা অন্য মসজিদে গিয়ে জামাতে শরিক হবে।
কিতাবের উল্লেখ:
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন):
"একই মসজিদে দুই জামাত মাকরূহ, বিশেষ করে যদি প্রথম জামাতের ইমাম নির্ধারিত থাকে।" (২/১২৩)
- ফাতাওয়া আলমগিরী (হিন্দিয়া):
"যদি কোনো মসজিদে এক জামাত হয়ে যায়, তাহলে সেখানে দ্বিতীয় জামাত করা মাকরূহ। তবে যদি প্রথম জামাতের ইমাম মসজিদের নির্ধারিত ইমাম না হন, তাহলে জায়েয।" (১/৫৯)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানবী):
"মসজিদে দ্বিতীয় জামাত করা থেকে বিরত থাকা উচিত, কারণ এতে একতা ভঙ্গের আশঙ্কা।" (১/২১২)
সারসংক্ষেপ:
- উত্তম: একাকী নামায পড়া।
- জায়েয: যদি দ্বিতীয় জামাতকারীরা প্রথম জামাতের সাথে সম্পর্কিত না হন এবং মসজিদের কোনো নির্ধারিত ইমাম না থাকেন, তবে জায়েয মনে করা হয়। তবে ফিতনা এড়াতে একাকী পড়াই উত্তম।
দ্বিতীয় প্রশ্ন: মৃত্যুর পূর্বে সম্পদ বিলি করে দেওয়া প্রসঙ্গে
উত্তর:
ইসলামী শরীয়তে সম্পদ বণ্টনের নিয়ম আল্লাহ নির্ধারণ করে দিয়েছেন (সূরা নিসা: ১১-১২)। মৃত্যুর পূর্বে কেউ নিজ ইচ্ছামতো সম্পদ কাউকে দিয়ে দিতে পারেন, তবে তা হিবা (দান) বা ওসিয়াত এর মাধ্যমে হতে পারে। কিন্তু এখানে উদ্দেশ্য যদি হয় শরীয়তের নির্ধারিত ওয়ারিসদের বঞ্চিত করা, তাহলে তা জায়েয নয়।
প্রশ্নে বর্ণিত অবস্থা:
এক ব্যক্তির শুধু দুই মেয়ে আছে, কোনো ছেলে নেই। সে ভয় করছে যে তার ভাই বা ভাতিজারা তার সম্পদের অংশ পাবে (ইসলামী আইনে ভাই-ভাতিজা মৃতের সম্পদের অংশীদার হয় না যদি মৃতের কন্যা থাকে; বরং কন্যারা নির্ধারিত অংশ পায় এবং বাকি সম্পদ আসাবা (অবশিষ্ট) হিসেবে নিকটাত্মীয়দের মধ্যে বণ্টিত হয়)। সে তার স্ত্রীকে জমি লিখে দিচ্ছে যাতে ভাই-ভাতিজারা না পায়।
হুকুম:
এভাবে মৃত্যুর পূর্বে স্ত্রীকে সম্পদ লিখে দেওয়া যদি ওয়ারিসদের বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে হয়, তাহলে তা হারাম ও গুনাহের কাজ। কারণ রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"আল্লাহ তা‘আলা প্রত্যেক হকদারকে তার হক দান করেছেন। সুতরাং কোনো ওয়ারিসের জন্য ওসিয়াত করা জায়েয নয়।" (তিরমিযী, ইবনে মাজাহ)
উপরন্তু, ওয়ারিসদের বঞ্চিত করার জন্য মৃত্যুর আগে সম্পদ হস্তান্তর করা ধোঁকা ও প্রতারণার শামিল। ইসলামী আইনে মৃত ব্যক্তির সম্পদ তার মৃত্যুর পর শরীয়তের নিয়মানুযায়ী বণ্টন হবে। যদি সে জীবিত থাকা অবস্থায় স্ত্রীকে জমি হিবা করে দেয়, তবে তা বৈধ যদি সঠিক পদ্ধতিতে দান করা হয় (যেমন: দখল ও কবজা দেওয়া)। কিন্তু যদি উদ্দেশ্য হয় ভাইবোনদের বঞ্চিত করা, তাহলে সেই দান নাজায়েয হবে এবং ফকিহদের মতে তা গুনাহ ও অন্যায়।
কিতাবের উল্লেখ:
- সহীহ বুখারী (২৭৩৩):
"নবী (সা.) বলেছেন: নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রত্যেক হকদারকে তার হক দান করেছেন। সুতরাং ওয়ারিসের জন্য ওসিয়াত করো না।"
- রাদ্দুল মুহতার:
"মৃত্যুকালীন অসুস্থতায় (মারজুল মওত) ওয়ারিসদের জন্য দান করা নাজায়েয, এবং সুস্থ অবস্থায় ওয়ারিসদের বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে দান করাও মাকরূহ।" (৫/২৬৩)
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকী উসমানী):
"কেউ যদি তার ওয়ারিসদের বঞ্চিত করার জন্য সম্পদ হস্তান্তর করে, তাহলে তা বৈধ নয় এবং তা ফেরত আনার বিধান রয়েছে।" (২/২৩৪)
সারসংক্ষেপ:
- জায়েয নয়: ওয়ারিসদের বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে মৃত্যুর পূর্বে সম্পদ অন্যকে দিয়ে দেওয়া।
- উত্তম: শরীয়তের বণ্টন পদ্ধতি মেনে চলা এবং মৃত্যুর পর সম্পদ আল্লাহর নির্ধারিত নিয়মে বণ্টন করা।
- যদি কেউ ন্যায়সঙ্গত কারণে দান করতে চান (যেমন: স্ত্রীর খেদমতের স্বীকৃতি), তবে তা দানের নিয়তে দিতে পারেন, কিন্তু ওয়ারিসদের বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে নয়।
পরামর্শ:
প্রথম প্রশ্নে: দ্বিতীয় জামাত না করে একাকী নামায পড়া বা অন্য মসজিদে যাওয়া উত্তম।
দ্বিতীয় প্রশ্নে: শরীয়তের বণ্টন মেনে চলা এবং ওয়ারিসদের বঞ্চিত করার চেষ্টা না করা। আপনার চাচাকে বুঝিয়ে বলা উচিত যে, ইসলামী আইন অনুযায়ী তার কন্যারা ও স্ত্রী নির্ধারিত অংশ পাবেন এবং ভাই-ভাতিজারা কন্যাদের উপস্থিতিতে কোনো অংশ পাবেন না (মৃতের পিতা বা মাতা জীবিত থাকলে ভিন্ন)। তাই ভয়ের কোনো কারণ নেই।
وَاللهُ أَعْلَمُ بِالصَّوَابِ