জুলুম থেকে বাঁচতে করণীয়
Halal and Haram · Hanafi
Question
আল্লাহ আমাদের এত ক্ষমতা দেয় নাই ।
তার জুলুমের হাত থেকে বাবকে বাঁচানোর জন্য আমরা বাবাকে বিদেশে পাঠাতে চাইতাছি।
1. বাবাকে পাঠাতে হয়তো অনেক জায়গায় ঘুষ দেওয়া লাগতে পারে কাগজ পাতি করতে এ ছাড়া উপায় নেই উপায় নেই এটা করা কি জায়েজ হবে ।
2। এই কাজটা করতে হয়তো অনেক দেশের অনেক আইন লংঘন করা হবে করতে হবে মিথ্যার আশ্রয় নিতে হবে এটা কি জায়েজ হবে।
এছাড়া আমার বাবাকে বাঁচানোর তো উপায় দেখতেছি না (আল্লাহ ভরসা) এগুলো না করলে হয়তো বাবা নিজে অন্যায় কাজে জড়িয়ে পড়বে খুন-খারাবি হতে পারে আর উনি অনেক বড় মাপের মানুষ আমাদের অনেক নির্যাতন আসতে পারে । কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে আমাকে ভালো পরামর্শ দিন
Answer
বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম
উত্তর:
প্রশ্নে বর্ণিত পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন ও সংকটময়। আপনাদের ওপর জুলুম করা হচ্ছে, বাবার জীবন ও ইজ্জত হুমকির মুখে। ইসলাম সবসময় জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের নির্দেশ দেয়, তবে প্রতিরোধের পদ্ধতি শরীয়তসম্মত হতে হবে। নিচে আপনার প্রশ্নের আলোকে কুরআন-হাদিস ও হানাফি ফিকহের কিতাবের ভিত্তিতে বিস্তারিত উত্তর প্রদান করা হলো:
১. ঘুষ দেওয়া জায়েজ হবে কি?
ঘুষ (রিশওয়াত) ইসলামে স্পষ্টভাবে হারাম। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"ঘুষ দাতা ও গ্রহীতা উভয়েই জাহান্নামের আগুনে যাবে।"
(সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ৩৫৮০; মুসনাদে আহমাদ)
তবে জরুরতের (প্রয়োজনের) ক্ষেত্রে ঘুষ দেওয়ার অনুমতি কিছু শর্তে দেওয়া হয়েছে। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও তার সাহাবাগণ বলেছেন:
"যদি কেউ জালিমের জুলুম থেকে নিজের জান, মাল বা ইজ্জত রক্ষার জন্য ঘুষ দিতে বাধ্য হয়, তবে তা দিতে পারে, কিন্তু ঘুষ গ্রহীতা গুনাহগার হবে।"
(রদ্দুল মুহতার, ৬/৪২৪; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ২/৩৩৬)
এক্ষেত্রে শর্ত হলো:
- ঘুষ দেওয়া ছাড়া অন্য কোনো হালাল উপায় না থাকা।
- জুলুম থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যই ঘুষ দেওয়া, নিজের কোনো অবৈধ কাজ সহজ করার জন্য নয়।
- যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই ঘুষ দেওয়া, অতিরিক্ত নয়।
উপসংহার: আপনার বাবাকে জুলুমের হাত থেকে বাঁচাতে যদি ঘুষ দেওয়া ছাড়া কোনো উপায় না থাকে, তবে প্রয়োজনীয় পরিমাণ ঘুষ দেওয়া জায়েজ হতে পারে, তবে ঘুষ গ্রহীতা গুনাহগার হবে। তবে চেষ্টা করবেন যেন ঘুষ কমাতে পারেন এবং হালাল উপায়ে কাজটি সম্পন্ন করেন।
২. দেশের আইন লঙ্ঘন ও মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া জায়েজ হবে কি?
মিথ্যা বলা ও আইন ভঙ্গ করা সাধারণত হারাম। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"মুমিনের মধ্যে মিথ্যা বলা ছাড়া অন্য সব স্বভাব থাকতে পারে।"
(সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১০৫)
তবে জরুরতের ক্ষেত্রে মিথ্যা বলার অনুমতি কিছু নির্দিষ্ট অবস্থায় দেওয়া হয়েছে:
- জালিমের হাত থেকে নিরপরাধকে বাঁচানো।
- স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সৌহার্দ্য স্থাপন।
- যুদ্ধের সময় কৌশল হিসেবে।
(সহীহ মুসলিম, হাদিস: ৬৩০৫; মিশকাত, ২/৪৪৪)
আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে:
- দেশের আইন মেনে চলা ইসলামি নির্দেশের অংশ (যতক্ষণ আইন ইসলামের বিপরীত না হয়)।
- তবে জরুরতের কারণে আইন লঙ্ঘন করা জায়েজ হতে পারে, যদি তা নিজের জান-মাল-ইজ্জত রক্ষার জন্য হয়। ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.) বলেন:
"জরুরত হারামকে হালাল করে দেয়, তবে শর্ত হলো জরুরতের পরিমাণ ও সময়সীমা বজায় রাখা।"
(রদ্দুল মুহতার, ১/২০৮)
উপসংহার:
- আপনার বাবাকে জুলুম থেকে বাঁচাতে যদি মিথ্যা বলতে বাধ্য হন, তবে শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় কথাই বলবেন এবং বিশ্বাস করবেন যে আল্লাহ তায়ালা দয়ালু।
- আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে যতটুকু একান্ত প্রয়োজন ততটুকুই করবেন। যেমন: ভিসার জন্য মিথ্যা তথ্য দেওয়া বা অবৈধ পথে দেশত্যাগ করা—এগুলো শেষ বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করবেন।
তবে মনে রাখবেন: আল্লাহর ভরসা (তাওয়াক্কুল) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ বলেন:
"যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ বের করে দেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না।"
(সূরা তালাক, ২:৩)
বিকল্প পরামর্শ:
আপনার বাবাকে বিদেশে পাঠানোর আগে নিম্নলিখিত হালাল উপায়গুলো চেষ্টা করুন:
- আইনি সহায়তা নিন:
দেশের মানবাধিকার কমিশন, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী বা ইসলামি আইনজীবীর সাহায্য নিন। - স্থানীয় মসজিদের ইমাম বা আলেমের মাধ্যমে মধ্যস্থতা:
জালিম ব্যক্তিকে বোঝানোর চেষ্টা করুন যে আল্লাহ জালিমের শাস্তি দেবেন (সূরা ইব্রাহিম, ৪২)। - ইসলাহ ও দোয়া:
- সূরা ইউসুফ পড়ুন (বিপদ থেকে মুক্তির জন্য)।
- সূরা নাস ও ফালাক পড়ে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চান।
- উপায় বের না হলে:
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, জীবনের হুমকি থাকলে হিজরত করা (স্থানান্তর) জায়েজ, এমনকি হারাম উপায়ে হলেও। তবে চেষ্টা করবেন হালাল উপায়ে।
শেষ কথা:
আপনার বাবার জান-ইজ্জত রক্ষা করা ফরজ। তাই যদি শরীয়তসম্মত কোনো উপায় না থাকে, তাহলে জরুরতের কারণে ঘুষ, মিথ্যা ও আইন লঙ্ঘনের অনুমতি রয়েছে। তবে আল্লাহকে ভয় করুন এবং যতটুকু সম্ভব এসব থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করুন। দোয়া করুন:
"রব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাওঁ ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাওঁ ওয়া ক্বিনা আযাবান্নার।"
আল্লাহই উত্তম সাহায্যকারী।
(মা'আরিফুল কুরআন, ৮/২৪৩; ফাতাওয়া উসমানী, ২/২৪৫