৭ বছর হারাম সম্পর্ক, কুরআন ধরে কসম, পরে তওবা—এ অবস্থায় কীভাবে বিয়ে ঠিক করা উচিত?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 2975
Questioner: sajia jebin
Question Asked: 21 Jul 2026, 08:49 PM
Reviewed & Published: 21 Jul 2026, 09:10 PM
Views: 21
Tokens: 9,351
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম..
কারো যদি এমন হয় যে ৭ বছর হারাম রিলেশনে ছিলো, কুরআন ধরে কসম করে যে ভবিষ্যতে দুজন দুজনকে বিয়ে করবে,এবং ফিজিক্যাল হওয়া ছাড়া সবধরনের খারাপ কাজ করে ফেলে
পরে সবকিছুর ভুল বুঝতে পারে মেয়েটা কিন্তু ছেলেটা মেয়েটা কে ছাড়তে রাজি নাহ
তাহলে করণীয় কি?
সম্পর্কে এসে একসময় দুজনের মনমানসিকতা মিলে নাহ, কুফু মিলে নাহ লাইফস্টাইল মিলে নাহ,অর্থাৎ আবেগ দিয়ে একটা সম্পর্ক শুরু হয় ছোটো থেকে কিন্তু সারাজীবন থাকার জন্য যথেষ্ট সুন্দর নাহ সম্পর্ক টা..
অতীতের ভুল বুঝে তাওবা করে সরে যাই একসময় গিয়ে মেয়েটার বিয়ে ঠিক হয় কিন্তু
অতীতের ছেলেটা জানতে পারে বিয়েটা ভেঙে দেই এবং মেয়েটা কোনোভাবে হারাম টাতে আর যেতে চাচ্ছে নাহ, বিয়ে যার সাথে ঠিক হয়সিলো তাকেও মন থেকে ভুলতে পারসে নাহ।

মেয়েটার পরিবার অতীতের সেই ছেলের সাথে আবার বিয়ে ঠিক করতে চাই কারন তার কাছে অনেক ছবি, প্রমান আছে
২জনের অতীতের এবং মানসম্মানের ভয়ে চাই বিয়েতে রাজি হয়
ছেলেটা কোনো ভাবে ছেড়ে দিতে চাইনাহ।
রিলেশন থাকাকালীন ছেলেটা বাজে আচরন করসে গালাগালি করসে মেয়েটির সাথে
সব মিলিয়ে ছেলেটি মেয়েটার মন থেকে উঠে যায় কিন্তু সম্মানের ভয়ে আবার সেই ছেলের কাছে কি ফিরে যাওয়া উচিত হবে?
বিয়ের সিদ্ধান্তে মানসিক শান্তি না মিললে করনীয় কি?
প্রশ্নগুলো-
হারাম থেকে বিয়ে হলে আল্লাহ কি খুশী হয়?বরকত আসে জীবনে?
কসমগুলোর জন্য কি করণীয়?
এক্ষেত্রে অন্য কাউকে বিয়ে করা উচিত হবে?
অতীতে যে সমস্ত নোংরা কাজ করা হয়সে সেগুলো তো ভবিষ্যতে স্বামীকে বলা যাবেনাহ, না বলেও যদি শুরু করতে যায় অনুশোচনা হবে যদি কোনো ভালো মানুষ ঠকিয়ে ফেলে।
এক্ষেত্রে কি করা উচিত?

Answer

উত্তর:
وَعَلَيْكُمُ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ

প্রথমেই বলে রাখি, ৭ বছর হারাম সম্পর্কে থাকা, কুরআন ধরে কসম করা, এবং বিভিন্ন খারাপ কাজে লিপ্ত হওয়া—এ সবই গুরুতর গুনাহ। তবে আল্লাহ তাআলা তওবাকারীকে ক্ষমা করেন। এখন করণীয় কী, তা কুরআন-সুন্নাহ ও হানাফি ফিকহের আলোকে নিচে বিস্তারিত উল্লেখ করছি।


১. অতীতের ভুল বুঝে তওবা করা এবং সম্পর্ক ছিন্ন করা

প্রথম এবং সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো—উভয়েই খালিস তওবা করা। তওবা শুদ্ধ হবে শর্ত তিনটি:

  1. গুনাহ থেকে বিরত থাকা,
  2. অনুতপ্ত হওয়া,
  3. ভবিষ্যতে না করার দৃঢ় সংকল্প করা।
    এবং যদি কারো হক নষ্ট হয়ে থাকে (যেমন গালাগালি, মিথ্যা কসম, অপমান), তাহলে তা থেকে ক্ষমা চাওয়াও জরুরি।

হারাম সম্পর্ক চলাকালীন ছেলেটি মেয়েটির সাথে খারাপ আচরণ করলে তার জন্যও তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা আবশ্যক। ছেলেটি এখনও সম্পর্ক ধরে রাখতে চাইছে, যা গুনাহকে অব্যাহত রাখার শামিল। সুতরাং মেয়েটির জন্য ছেলেটির সাথে যাবতীয় যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া ফরজ। (সূরা আন-নূর: ৩১, সূরা আল-ইসরা: ৩২)

হাদিস:

"যে ব্যক্তি কোনো গুনাহ করে, অতঃপর তওবা করে এবং সংশোধন করে, আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন।" (ইবনে মাজাহ: ৪২৫০)


২. কুরআন ধরে কসম করার বিধান

কুরআন ধরে কসম করা একটি গুরুতর বিষয়। এটি ‘ইয়ামিন’ (শপথ) হিসেবে গণ্য হয়। এখন প্রশ্ন হলো—ঐ কসম ভঙ্গ করা যাবে কি?

হানাফি ফিকহ অনুসারে: কসম যদি কোনো গুনাহ বা ক্ষতিকর কাজের উপর হয়, তাহলে তা ভঙ্গ করা ওয়াজিব এবং কাফফারা দিতে হবে। যেহেতু এখানে কসমটি একটি হারাম সম্পর্কের ভিত্তিতে করা হয়েছিল এবং বর্তমানে ওই সম্পর্কটি আল্লাহর নাফরমানি ও অশান্তির কারণ, তাই এই কসম পালন করা জায়েজ নয় বরং ভঙ্গ করা আবশ্যক।

কাফফারার বিধান: (সূরা আল-মায়েদা: ৮৯)

"তোমাদের শপথের কাফফারা হলো— দশজন মিসকিনকে মধ্যম ধরনের খাদ্য খাওয়ানো, অথবা তাদের কাপড় দেওয়া, অথবা একজন দাস মুক্ত করা। যদি কেউ না পারে, তাহলে তিন দিন রোজা রাখা।"

এক্ষেত্রে প্রত্যেকটি ভিন্ন কসমের জন্য পৃথক কাফফারা ওয়াজিব। তবে যদি একই বিষয়ে বারবার কসম করা হয়েছে, তাহলে একটি কাফফারাই যথেষ্ট (রদ্দুল মুহতার: ৩/১৪৪, ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ২/২৯৫)।

সারকথা: মেয়েটি এবং ছেলেটি উভয়েই নিজ নিজ কসম ভেঙে কাফফারা আদায় করবে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবে।


৩. ঐ ছেলেকে বিয়ে করা কি উচিত?

না, উচিত নয়। এর কারণ হলো:

১. হারাম সম্পর্ক থেকে বিয়ে: ইসলামে বিয়ে একটি পবিত্র বন্ধন। যে সম্পর্ক গুনাহের মাধ্যমে শুরু হয়েছে, তাতে বরকত কম থাকে। হাদিসে এসেছে:

"যখন কোনো সম্পদ হারাম উপায়ে অর্জিত হয়, তার মধ্যে বরকত থাকে না।" (মুসনাদে আহমাদ: ৩৭২১)
একই নীতি বিয়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। হারাম সম্পর্ক থেকে বিয়ে করলে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও বরকত লাভের সম্ভাবনা ক্ষীণ।

২. ছেলেটির চরিত্র ও আচরণ: সে বাজে আচরণ, গালাগালি করত এবং বর্তমানে ব্ল্যাকমেইল করছে। এটি নৈতিক অধঃপতনের পরিচায়ক। কুফু সমতা (পাত্র-পাত্রীর ধর্মপরায়ণতা, চারিত্রিক সামঞ্জস্য) না থাকলে বিয়ে বৈধ হলেও অপছন্দনীয়। (ফাতাওয়া আলমগিরি: ১/২৮২, রদ্দুল মুহতার: ২/৩৭১)

৩. মানসম্মানের ভয়ে বিয়ে: পরিবার ভয় পাচ্ছে যে ছেলে ছবি-প্রমাণ দিয়ে অপমান করবে। কিন্তু ব্ল্যাকমেইলের কাছে নতি স্বীকার করা কখনোই সম্মানের পথ নয়। ইসলাম বলে, গুনাহের ভয়ে অন্য গুনাহ করা যায় না। এমতাবস্থায় পরিবারের উচিত স্থানীয় আলেম, মসজিদ কমিটি বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাহায্য নিয়ে ছেলেটিকে তার অন্যায় আচরণ থেকে বিরত রাখা।

সুতরাং মেয়েটির উচিত ঐ ছেলেকে বিয়ে না করা, বরং অন্য কোনো যোগ্য ও ধার্মিক পাত্রের সাথে বিয়ের ব্যবস্থা করা।


৪. অন্য কাউকে বিয়ে করলে সমস্যা কী?

জায়েজ ও উত্তম। তবে মেয়েটির মনে দুটি প্রশ্ন আসতে পারে:

ক. অতীতের গুনাহ স্বামীকে বলা:
এটা কখনো বলা উচিত নয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"আমার সমস্ত উম্মতকে ক্ষমা করা হবে, তবে তারা যারা প্রকাশ্যে গুনাহ করে।" (সহীহ বুখারী: ৬০৬৯)
অতীতের গুনাহ তওবা করে আল্লাহর কাছে মাফ চেয়ে নিলে তা আর কাউকে বলার প্রয়োজন নেই। বরং বলা নিষিদ্ধ। একে ‘ঠকানো’ বলা যাবে না, কারণ তওবা করার পর সে নতুন জীবন শুরু করে। (ফাতাওয়া উসমানি: ২/৩৪৫)

খ. দ্বিতীয় বিয়েটি ভেঙে দেওয়া হয়েছিল:
ছেলেটি জেনে সেই বিয়ে ভেঙে দিয়েছে। যদি সেই পাত্র (যার সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছিল) এখনও বিয়েতে রাজি থাকে, তাহলে তার সাথেই বিয়ে করার চেষ্টা করতে পারে। অন্যথায় নতুন পাত্র খোঁজা উচিত।


৫. বিয়ের সিদ্ধান্তে মানসিক শান্তি না পেলে করণীয়

ইস্তেখারা করা এবং দু‘আ করা জরুরি। যে বিয়েতে অন্তরে শান্তি না পায়, সেটি ত্যাগ করাই ভালো। হাদিসে এসেছে:

"তুমি নিজের অন্তরের ফতোয়া নাও, যদিও মানুষ তোমাকে ফতোয়া দেয়।" (মুসনাদে আহমাদ: ১৮০৪১)

এখানে মেয়েটি ছেলেটির প্রতি আকর্ষণ হারিয়ে ফেলেছে, তার থেকে দূরে থাকতে চায়—এটাই ফিতরাত (স্বভাবজাত) সিদ্ধান্ত। তাই তাকে জোর করে বিয়ে দেওয়া বৈধ হবে না। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ১/৩৪২)


৬. গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ

  • নিজেকে দোষী মনে করবেন না—তওবা কবুল করলে আল্লাহ গুনাহ মুছে দেন।
  • পরিবারের সাথে খোলামেলা আলোচনা করুন—বলুন এই বিয়ে আপনার মানসিক শান্তি নষ্ট করবে, এবং ইসলামে জোরপূর্বক বিয়ে নাজায়েজ।
  • ছেলেটির ব্ল্যাকমেইলের ভয় পাবেন না—আল্লাহর ভয় যার থাকে, আল্লাহ তাকে রক্ষা করেন।
  • সৎ ও ধার্মিক পাত্র খুঁজুন—যে আপনার অতীত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা না করে এবং আপনাকে আল্লাহর পথে রাখতে সাহায্য করে।
  • কসমের কাফফারা আদায় করুন—দশজন মিসকিনকে খাওয়ানো সহজ, সাধ্যমতো আদায় করে নিন।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল পথে জীবন গড়ার তাওফিক দান করুন।
(والله أعلم بالصواب)


প্রামাণ্য গ্রন্থসমূহ:

  • ফাতাওয়া উসমানি (জামিউল ফাতাওয়া)
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী)
  • রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন)
  • ফাতাওয়া আলমগিরি (হিন্দিয়া)
  • আল-হিদায়া (মারগিনানি)
  • বেহেশতি জেওর (আশরাফ আলী থানভী)
  • মাআরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি)
  • তাফসীরে উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি)

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.