সুদের টাকা খরচের ব্যাপারে।
Halal and Haram · Ahle Hadith / Salafi
Question
শুধুমাত্র রাস্তা থেকে একটি বাড়ির দিকে যাওয়ার জন্য এই ব্রিজ নির্মিত হবে। যেখানে বাস করে তাদের চাচাতো, জ্যাঠাতো ভাই বোন, এক বাড়িতে এইরকম কতগুলি ফ্যামিলির মানুষেরঘর আছে, তাদের যাতায়াতের সুবিধের জন্য ব্রিজ করা।
এদিকে সেই মৃত ব্যক্তির জামাই কিস্তিতে কিছু টাকা উঠিয়ে, জামাতার ভাইকে বিদেশ পাঠিয়েছিল, বিদেশে মাইর খেয়ে ধরা খেয়ে দেশে ফেরত আসলো তার ভাই, তাই কিস্তির টাকা অনেক কষ্ট করে জামাতার পরিশোধ করতেহয়, এখন আমি জানতে চাই , তার জামাতা উনার শ্বশুরের সুদের টাকাগুলো দিয়ে কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে পারবে কি???
Answer
উত্তর:
প্রশ্নটি সুদ (রিবা) সংক্রান্ত। সুদ ইসলামে হারাম ও কবিরা গুনাহ। কুরআন ও হাদিসে এর কঠোর নিষেধাজ্ঞা এসেছে। আল্লাহ বলেন:
“আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।” (সূরা আল-বাকারা, ২:২৭৫)
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
“সুদখোর, সুদদাতা, লেখক ও সাক্ষী—সবাই লানতপ্রাপ্ত।” (সহীহ মুসলিম, ১৫৯৮)
সুদের টাকা ব্যবহারের বিধান:
সুদের টাকা ব্যক্তিগতভাবে ভোগ করা বা নিজের কোনো প্রয়োজনে ব্যবহার করা জায়েজ নয়। তবে এই টাকা কোনো সওয়াবের উদ্দেশ্য ছাড়া জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করা যেতে পারে। শাইখ ইবনু উসাইমীন (রহ.) বলেন:
“সুদের টাকা বৈধ নয়; এটি গরিব-মিসকিনদের দেওয়া উচিত, অথবা রাস্তা-ঘাট, মসজিদ, হাসপাতাল ইত্যাদি জনসাধারণের কল্যাণের কাজে ব্যয় করা উচিত—এতে ব্যক্তির কোনো সওয়াব নেই, তবে গুনাহ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।” (মাজমু‘ ফাতাওয়া, ১৪/৩৪৫)
শাইখ বিন বায (রহ.) বলেন:
“সুদ থেকে প্রাপ্ত অর্থ কোনো ব্যক্তি নিজে ব্যবহার করতে পারবে না, বরং তা ফেলে দেবে অথবা জনকল্যাণমূলক কাজে (যেমন রাস্তা নির্মাণ) ব্যয় করবে—সওয়াবের আশা না করে।” (মাজমু‘ ফাতাওয়া, ১৯/২৯৪)
প্রথম প্রশ্ন: মৃত ব্যক্তির সুদের টাকা দিয়ে ব্রিজ নির্মাণ এবং তার ছেলেরা সেই ব্রিজ ব্যবহার করলে তা কি জায়েজ?
উত্তর: যেহেতু ব্রিজটি মৃত ব্যক্তির ছেলেরা নিজেরা ব্যবহার করবে এবং তাদের পরিবারের যাতায়াতের জন্যই মূলত নির্মাণ করা হচ্ছে, তাই এটি ব্যক্তিগত সুবিধার আওতায় পড়ে। সুদের টাকা নিজের ব্যক্তিগত উপকারে ব্যবহার করা জায়েজ নয়। শাইখ সালিহ আল-ফাওযান (হাফি.) বলেন:
“যে টাকা হারাম (সুদ) তা দিয়ে নিজের বা নিজ পরিবারের কোনো প্রয়োজন পূরণ করা বৈধ নয়। তবে তা জনসাধারণের জন্য কোনো স্থায়ী সম্পদ তৈরিতে ব্যয় করা যেতে পারে, যদি তাতে ব্যক্তি নিজে কোনো উপকার না নেয়। যদি ব্যক্তি নিজেও সেই সম্পদ ব্যবহার করে, তবে তা জায়েজ হবে না।” (আল-মুনতাকা, ৪/২৫০)
সুতরাং মৃত ব্যক্তির ছেলেরা এই টাকা দিয়ে ব্রিজ নির্মাণ করতে চাইলে তা জায়েজ হবে না, কারণ তারা নিজেরাও এর থেকে সুবিধা গ্রহণ করবে। তারা চাইলে সুদের টাকা অন্য কোনো জনকল্যাণমূলক কাজে (যেমন একটি সর্বসাধারণের রাস্তায়) ব্যয় করতে পারে, যেখানে তাদের নিজেদের কোনো সম্পৃক্ততা না থাকে। অথবা এ টাকা গরিব-মিসকিনদের সাদাকা করে দেবে—সওয়াবের আশা না করে।
দ্বিতীয় প্রশ্ন: মৃত ব্যক্তির জামাই (দামাদ) তার শ্বশুরের সুদের টাকা দিয়ে কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে পারবে কি?
উত্তর: না, এটি জায়েজ নয়। কিস্তির টাকা (ঋণ) পরিশোধন করা একটি ব্যক্তিগত দায়িত্ব। ব্যক্তিগত দেনা সুদের টাকা দিয়ে শোধ করা জায়েজ নয়, কারণ সুদের টাকা নিজের কোনো উপকারে ব্যবহার করা হারাম। শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন:
“যে ব্যক্তির কাছে সুদের টাকা আছে, সে তা নিজের বা তার পরিবারের কোনো প্রয়োজনে খরচ করতে পারবে না। বরং তা জনসাধারণের কল্যাণে দান করে দেবে।” (মাজমু‘ ফাতাওয়া, ২৯/৩০০)
জামাইয়ের জন্য একমাত্র পথ হলো হালাল উপার্জন থেকে কিস্তি পরিশোধ করা। যদি সে সুদের টাকা নেয়, তবে তা গুনাহ হবে এবং তার ঋণও শুদ্ধ হবে না, বরং নতুন করে হারাম ভোগ করার অপরাধ হবে।
ফতোয়া (সংক্ষেপে):
- মৃত ব্যক্তির সুদের টাকা দিয়ে ব্রিজ নির্মাণ করা যাবে না, যদি তাতে তার সন্তানরা বা পরিবারের লোকেরা উপকার পায়।
- সুদের টাকা জনসাধারণের জন্য কোনো কল্যাণমূলক কাজে (যেখানে নিজেরা কোনো উপকার না পায়) ব্যয় করা যেতে পারে, অথবা গরিবদের সাদাকা করা যেতে পারে—সওয়াবের আশা না করে।
- জামাই তার শ্বশুরের সুদের টাকা দিয়ে নিজের কিস্তি শোধ করতে পারবে না।
সর্বোত্তম সমাধান:
- সুদের টাকা আলাদা করে রেখে কোনো স্থানীয় মসজিদ, মাদরাসা বা পাবলিক রাস্তা নির্মাণে দান করুন, যাতে আপনার পরিবারের কেউ সরাসরি উপকার না পায়।
- জামাই হালাল উপার্জন করে অথবা অন্য কারো কাছ থেকে (হালালভাবে) ঋণ নিয়ে নিজের দেনা পরিশোধ করবেন।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে হারাম থেকে দূরে থাকার তাওফিক দান করুন। (আমিন)
রেফারেন্স:
১. কুরআন: সূরা আল-বাকারা ২:২৭৫-২৭৯
২. সহীহ মুসলিম: ১৫৯৮
৩. মাজমু‘ ফাতাওয়া ইবনু তাইমিয়্যাহ: ২৯/৩০০
৪. মাজমু‘ ফাতাওয়া ইবনু উসাইমীন: ১৪/৩৪৫
৫. মাজমু‘ ফাতাওয়া ইবনু বায: ১৯/২৯৪
৬. আল-মুনতাকা ফী ফাতাওয়া ফাওযান: ৪/২৫০