পাক নাপাকি এবং কয়েকটি বিষয়ে
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
(১) কাপড় পাক করতে চিপড়ানোর কথায় বলা হয় যে শেষের বাড় এমন ভাবে চিপড়াতে যেন আর পানি না পড়ে। কিন্তু এক্ষেত্রে বিষয় হল কাপড় তো একটু বেশি চিপড়াকেই নষ্ট হয়ে যায়, ছিঁড়েই যায়। তাহলে এই শেষের বারের চিপড়ানোটা কেমন হবে?
যেমন, উদাহরণসরুপ..
এক্ষেত্রে সাধ্যমত চিপড়ানো হলেই হবেনা? এমন হয় যে, তৃতীয়বার চিপড়ানো অবস্থায় পানি বের হল না। কিন্তু পরবর্তী কিছুক্ষণ পরে চিপড়ালে আবারো পানি বের হল। এতে তো কোন সমস্যা নেই তাইনা?
আবার অনেক সময় কিছু টাইপের কাপড় আছে সেগুলো চিপড়ানোর সময় পড়ছেনা পানি এবং কিছুক্ষন রেখে দিলে আবারো পড়ে এতে তো কোন সমস্যা নেই তাইনা?
অর্থাৎ তৃতীয়বার চিপড়ানো অবস্থায় পানি না পড়াই উদ্দেশ্য তাইনা? পরবর্তীতে পানি পরুক কি না পরুক এটা তো ধর্তব্য নয়। তাইনা?
(২) আমি আগের প্রশ্নে বলেছিলাম যে কোথাও গেল এবং রক্ত-পুঁজ-পানি বের হয়ে গড়িয়ে পড়ল তাহলে তো ওজু ভেঙ্গে গেল এবং ওই রক্ত-পুঁজ-পানি নাপাক হল।
কিন্তু সবসময় তো আর সেগুলো চলমান থাকেনা। যখন সেগুলো পড়া বন্ধ হয়ে যায়। তারপর যেই রক্তগুলো/ পানি আসে সেগুলোও কি নাপাক হবে? এইটার মধ্যবর্তী সময় কাল কিভাবে করা হবে?
কারোর কোথায় কেটে গেলে অনেক ঘন্টা অতিবাহিত হলে তো রক্ত প্রবাহিত পরিমানে হয় না। তাহলে সেই রক্ত কিভাবে নাপাক হবে?
(৩)বাচ্চার ২ বছর হওয়ার পরেও যদি মায়ের দুধ সাক করে এবং মায়ের বুকে দুকে যদি না থাকে তাহলেও তো গুনাহ হবে?
(৪)যেকোন হালাল প্রাণিরই বুকের উচুঁ অংশটুকু খাওয়া হারাম? এই অংশটুকু চেনার উপায় কি? মুরগির বুকের কোন অংশটুকু হবে এটি কিভাবে চিনব?
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নটিতে চারটি ভিন্ন ভিন্ন মাসআলা আছে। নিচে প্রতিটির পৃথক উত্তর দেওয়া হলো।
(১) কাপড় পাক করার সময় চিপড়ানোর পদ্ধতি
মাসআলা: নাপাক কাপড় পাক করতে গেলে তিনবার ধৌত করতে হয় এবং প্রতিবার ধোয়ার পর এমনভাবে নিংড়াতে হয় যেন পানি বের না হয়। (রদ্দুল মুহতার, ১/৩০৭; আল-হিদায়া, ১/৪২)
আপনার প্রশ্ন:
- কাপড় যদি নাজুক হয় এবং বেশি চিপড়ালে ছিঁড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে সাধ্যমত চিপড়ানোই যথেষ্ট। যদি তৃতীয়বার চিপড়ানোর সময় কোনো ফোঁটা না পড়ে, কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার চিপড়ালে পানি বের হয়, তাহলে তার কোনো প্রভাব নেই। কারণ উদ্দেশ্য হচ্ছে সেই মুহূর্তে পানি বের না হওয়া। পরে যে পানি বের হয়, তা নাপাক নয়, বরং পাক পানি; সুতরাং কাপড় পাক হয়ে গেছে। (ফাতাওয়া উসমানী, ১/৩০৬; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৪৫)
সারকথা: তৃতীয়বার চিপড়ানোর সময় পানি না পড়াই উদ্দেশ্য। পরবর্তীতে পানি আসা বা না আসা ধর্তব্য নয়। নাজুক কাপড়ের ক্ষেত্রে সাধ্যমত চিপড়ানো জরুরি, পুরো শুকানো নয়।
(২) রক্ত-পুঁজ-পানি বের হওয়া ও ওজু ভঙ্গ
মাসআলা:
- শরীরের কোনো অংশ থেকে রক্ত, পুঁজ, বা পানি বের হয়ে গড়িয়ে পড়লে তা ওজু ভঙ্গ করবে এবং ওই বের হওয়া জিনিসটি নাপাক। (শরহু মাআনিল আসার, ১/৫৫; রদ্দুল মুহতার, ২/৪৩)
- যদি প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়, তারপর আবার কিছু বের হয়, তাহলে যদি তা প্রবাহিত পরিমাণে হয় (অর্থাৎ গড়িয়ে পড়ার মতো) , তাহলে আবার ওজু ভঙ্গ হবে এবং নাপাক হবে। প্রবাহিত না হলে ওজু ভঙ্গ হবে না, যদিও তা নাপাক (যদি দিরহামের চেয়ে বেশি হয়)।
মধ্যবর্তী সময়কাল: সময়ের কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই; যতক্ষণ না নতুন করে রক্ত বের হয়, ততক্ষণ ওজু বহাল থাকে। যদি ক্ষতস্থান থেকে অল্প অল্প করে রক্ত বের হয় কিন্তু গড়িয়ে না পড়ে (যেমন জমে থাকে), তাহলে ওজু ভঙ্গ হবে না। তবে কাপড়ে লাগলে নাপাক হবে যদি পরিমাণ দিরহাম (প্রায় ৩-৪ সেমি অঞ্চল) ছাড়িয়ে যায়। (ফাতাওয়া উসমানী, ১/২২১; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ১/১২৩)
ছোট কাটা ও দীর্ঘ সময়:
- ছোট কাটা থেকে যদি এত কম রক্ত বের হয় যে তা গড়িয়ে পড়ে না, তাহলে ওজু ভঙ্গ হবে না। আর কাপড়ে লাগলে তা দিরহাম পরিমাণের কম হলে ক্ষমাযোগ্য। (রদ্দুল মুহতার, ১/৩১২)
(৩) বাচ্চার দু’বছর পর মায়ের দুধ পান করানো
মাসআলা:
পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, মায়েরা তাদের সন্তানদের পূর্ণ দু’বছর দুধ পান করাবে (সূরা বাকারা, ২:২৩৩)। দু’বছর পার হওয়ার পর যদি সন্তান দুধ পান করে, তাহলে তা হারাম নয়। তবে এটি আর রাদা‘আতের (মাহরাম সৃষ্টির) জন্য গণ্য হবে না। হানাফি মতে, দুধ মাতৃত্বের সম্পর্ক কেবল দু’বছরের মধ্যে পান করানোর মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত হয়। (আল-হিদায়া, ১/৪৮; বাদায়িউস সানায়ি’, ৪/১৪)
- গুনাহ হবে কিনা: যদি বাচ্চার বয়স দু’বছর পার হয় এবং মায়ের বুকে দুধ না থাকে (শুকিয়ে গেছে), তাহলে শুধু চোষার কোনো প্রভাব নেই এবং তাতে গুনাহ নেই। যদি দুধ থাকে তবে পান করানো জায়েজ, কিন্তু উত্তম হলো বাচ্চাকে দু’বছরের মধ্যে দুধ ছাড়ানো। সওয়াবের দিক থেকে কম হলেও গুনাহ নয়। (ফাতাওয়া আলমগীরী, ১/২৩৩; ফাতাওয়া শামী, ৪/১৪৩)
(৪) হালাল প্রাণির বুকের উঁচু অংশ খাওয়া
মাসআলা:
"যেকোন হালাল প্রাণির বুকের উঁচু অংশ" বলতে সাধারণত স্তন/ওলান (udder) বোঝায়, যা কেবল দুধপায়ী প্রাণির (গরু, ছাগল, ভেড়া) ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। মুরগি, কবুতর ইত্যাদির ক্ষেত্রে "বুকের উঁচু অংশ" বলতে বুকের মাংস (breast meat) বোঝায়।
- স্তন (ওলান/উদার) খাওয়া: হানাফি ফিকহে স্তনের গোশত মাকরূহ তানযিহী (খারাপ না হলেও উচিত নয়) – কারণ এতে দুধ ও রক্তের মিশ্রণ থাকে এবং এটি খাওয়া নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নতের বিপরীত বলে বিবেচিত। তবে হারাম নয়। (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৩৪; ফাতাওয়া শামী, ৯/৪৮০)
- মুরগি, কবুতর ইত্যাদির বুকের মাংস: এটি সম্পূর্ণ হালাল ও জায়েজ। এর কোনো অংশই হারাম নয়। অনেক জায়গায় মুরগির "বুক" বা "সিনা" বলা অংশটি খাওয়ার ব্যাপারে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। (ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪৫০)
চেনার উপায়:
- চার পায়ের প্রাণির ক্ষেত্রে স্তন (উদার) দেখে চেনা যায় – এটি পেটের নিচে স্তনবৃন্তযুক্ত অংশ।
- মুরগির ক্ষেত্রে "উঁচু অংশ" বলতে ঘাড়ের নিচের দিকের মাংসল অংশ বোঝানো হলে তা খেতে কোনো অসুবিধা নেই। তবে যদি কেউ মাকরূহ তানযিহী অনুসারে স্তন এড়িয়ে চলতে চান, তবে তা ইচ্ছাধীন।
উপসংহার: হালাল প্রাণির সব গোশত হালাল, তবে স্তন (উদার) খাওয়া থেকে বিরত থাকা উত্তম। মুরগির বুকের মাংস হালাল এবং তা চেনার জন্য কোনো জটিল নিয়ম নেই।
📌 তথ্যসূত্র
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন) – ১/৩০৭; ২/৪৩; ৬/৩৩৪
- আল-হিদায়া – ১/৪২, ১/৪৮
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরী) – ১/৪৫, ১/২৩৩
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তকী উসমানী) – ১/৩০৬, ২/৪৫০
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতি আশরাফ আলী থানবী) – ১/১২৩
- বাদায়িউস সানায়ি’ – ৪/১৪
আল্লাহ তাআলা সবাইকে সহীহ আমল করার তাওফীক দিন।
والله أعلم بالصواب