অমুসলিম দেশে বসবাস নিয়ে একাধিক মাসআলা জানতে চাই?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
২।অমুসলিম দেশে গিয়ে ইচ্ছাকৃত ওয়াজিব, সুন্নাত, নফল পালন না করলে কি মাকরুহে তানজিহি হবে?
৩।ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাত বাদে সকল ইবাদাত কি নফল হিসেবে গন্য হবে?
৪।একজনের সাথে আগে অবৈধ সম্পর্ক ছিলো, বন্ধুও ছিলো। তার ছবি চাইছি সে বলছে স্বামীর নিষেধ আছে আমি বলছি স্বামী জানবে কিভাবে সে বলছে আল্লাহ সব দেখেন সে আল্লাহ বানান ভুল লিখছে। কিন্তু সে ফোনে মেসেজ এবং কথা অডিও ভিডিও কলে বলতে চায়। এখন আমার প্রশ্ন হচ্ছে সে বা অন্য কেউ আল্লাহ পাক এর কথা বলার পরও গোনাহ করলে তার ইমান চলে যাবে কি?
Answer
উত্তর:
প্রশ্নের চারটি বিষয়ের উত্তর নিম্নে ক্রমান্বয়ে পেশ করা হলো। উত্তরগুলো হানাফী ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাব (রদ্দুল মুহতার, ফাতাওয়া শামী, ফাতাওয়া উসমানী, বাহিশতী জেওর) থেকে প্রদত্ত।
১. অমুসলিম বা ধর্মনিরপেক্ষ দেশে বসবাস করা কি মাকরুহ?
হানাফী মাযহাবে অমুসলিম দেশে (দারুল হারব) বসবাস করা মূলত মাকরুহ তাহরীমি (নিষিদ্ধের কাছাকাছি) যদি সেখানে ফরজ ইবাদাত (যেমন নামায, রোযা) পালন করা সম্ভব না হয় বা দ্বীন পালনে বাধা থাকে। তবে যদি প্রয়োজন (চাকরি, শিক্ষা, চিকিৎসা) এবং দ্বীন রক্ষার দৃঢ় সংকল্প থাকে, তাহলে জায়েয, তবে মাকরুহ তানযিহি থেকে যেতে পারে। ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, দারুল হারবে বসবাস করা মাকরুহ, কারণ সেখানে ফরজ ইবাদাত বিনা ওজরে ছুটে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। কিন্তু গোনাহ না করে তওবা করা ফরজ; আর গোনাহ করলে তা কবীরা বা সগীরা হতে পারে, যা মৌলিকভাবে স্বতন্ত্র গোনাহ।
সারসংক্ষেপ:
- যদি ফরজ ইবাদাত পালন সম্ভব না হয় বা দ্বীনী পরিবেশ না থাকে, তাহলে অমুসলিম দেশে যাওয়া বা বসবাস করা মাকরুহ তাহরীমি।
- প্রয়োজন ও দ্বীন রক্ষার শর্তে জায়েয, কিন্তু মাকরুহ তানযিহি থেকে যেতে পারে।
দলিল:
(রদ্দুল মুহতার, ৪/২৬২; ফাতাওয়া শামী, ৪/২৬২; ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪২৮)
২. অমুসলিম দেশে ইচ্ছাকৃত ওয়াজিব, সুন্নাত, নফল না করলে কি মাকরুহে তানযিহি হবে?
হ্যাঁ, ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়াজিব না করলে গোনাহ (মাকরুহ তাহরীমি বা নিকটবর্তী হারাম) হবে। আর সুন্নাতে মুআক্কাদা বা সুন্নাত ইচ্ছাকৃত ত্যাগ করলে মাকরুহে তানযিহি (অপসন্দনীয়) হবে, তবে গোনাহ হবে না যদি নিয়মিত ত্যাগ না করা হয়। নফল না করলে কোনো দোষ নেই, তবে সওয়াব কমে যাবে। অমুসলিম দেশে এগুলোর গুরুত্ব আরও বেশি, কারণ দ্বীন রক্ষা কঠিন।
সারসংক্ষেপ:
- ওয়াজিব ত্যাগ: গোনাহ (মাকরুহ তাহরীমি)।
- সুন্নাত ত্যাগ: মাকরুহে তানযিহি (গোনাহ নয়, তবে অপছন্দনীয়)।
- নফল ত্যাগ: জায়েয, তবে বিনা কারণে ত্যাগ করা অনুচিত।
দলিল:
(আল-হিদায়া, ১/১১৩; বেহেশতী জেওর, ২/১৪; ফাতাওয়া শামী, ১/১২৪)
৩. ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাত বাদে সকল ইবাদাত কি নফল হিসেবে গণ্য হবে?
হ্যাঁ, ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাতে মুআক্কাদা ও সুন্নাতে গায়রে মুআক্কাদা বাদে বাকি সব ইবাদাত নফল (অতিরিক্ত) হিসেবে গণ্য। তবে নফলের মধ্যে আবার কিছু মুস্তাহাব বা মন্দুব (পছন্দনীয়) এবং কিছু আবশ্যক নয় এমন ইবাদাত পড়ে।
সারসংক্ষেপ:
- ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাত – এগুলো ভিন্ন ভিন্ন স্তর।
- এ ছাড়া সব ইবাদাত (যেমন তাহাজ্জুদ, ইশরাক, চাশত, তিলাওয়াত, যিকির ইত্যাদি) নফল।
দলিল:
(উসুলুশ শাশী, পৃষ্ঠা ৫০; ফাতাওয়া শামী, ১/৭০; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ১/২৫০)
৪. আল্লাহর কথা বলার পরও গোনাহ করলে ঈমান চলে যাবে কি?
না, শুধু গোনাহ করার কারণে ঈমান চলে যায় না, যদি না সেই গোনাহটি কুফরী (যেমন আল্লাহকে মিথ্যা বলা, ইসলামকে অপমান করা) হয়। ‘আল্লাহ সব দেখেন’ বলা সঠিক; তবে সে বলে ‘আল্লাহ বানান ভুল লিখছে’ – এটি যদি আল্লাহর নামের বানান নিয়ে ঠাট্টা বা অবজ্ঞা হয়, তাহলে তা কুফরী হতে পারে। কিন্তু এখানে বক্তা সম্ভবত ‘আল্লাহ বানান’ শব্দটি অজ্ঞতাবশত ভুল লিখেছে, যা কুফরী নয়। বরং সে জেনেশুনে গোনাহ (অবৈধ সম্পর্ক ও যোগাযোগ) করতে চায়, যা কবীরা গোনাহ, কিন্তু ঈমান নষ্ট করে না। তওবা করলে আল্লাহ মাফ করবেন।
সারসংক্ষেপ:
- গোনাহ করলে ঈমান চলে যায় না, যতক্ষণ না সেই কাজ কুফরী হয়।
- ‘আল্লাহ বানান’ ভুল লেখা কুফরী নয়, বরং ভুল বা অজ্ঞতা।
- তবে অবৈধ সম্পর্ক ও ফোনে যোগাযোগ করা কবীরা গোনাহ এবং তাৎক্ষণিকভাবে তওবা ও বর্জন করা ফরজ।
দলিল:
(ফাতাওয়া শামী, ৩/৪৪২; ফাতাওয়া উসমানী, ১/২৬০; বাহিশতী জেওর, ২/২৪; রদ্দুল মুহতার, ৩/৪৮০)
পরামর্শ:
- অমুসলিম দেশে থাকলেও ফরজ ইবাদাত কখনো ছাড়বেন না।
- মনে রাখবেন, দ্বীন রক্ষা করাই সবচেয়ে বড় জিহাদ। প্রয়োজন শেষে দেশে ফিরে আসার চেষ্টা করুন।
- অবৈধ সম্পর্ক থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকুন এবং ফোনে কথা বলাও গোনাহের মাধ্যম – তা বর্জন করুন।
- ঈমানের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন; গোনাহ করলেই ঈমান যায় না, কিন্তু কুফরী কালাম থেকে বেঁচে থাকুন।
আল্লাহ তাওফিক দান করুন।