মন্টেনিগ্রোর ভিসার জন্য আবেদন করা কি জায়েয হবে?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
উত্তর দেওয়ার পদ্ধতি:
প্রথমে সরাসরি ফতোয়া দেওয়া, তারপর কুরআন-হাদিসের দলিল ও হানাফি কিতাবের রেফারেন্স উল্লেখ করা।
প্রশ্ন:
মন্টেনিগ্রোর ভিসার জন্য আবেদন করার পর জানতে পেরেছেন যে ওই দেশের পতাকা ও ভিসায় অমুসলিমদের প্রতীক (logo) আছে। এখন অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার আসার পর ভিসা পেলে গেলে কি গুনাহ হবে এবং ইমান চলে যাবে?
উত্তর:
আপনার বর্ণিত বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়ে হানাফি ফিকহের আলোকে উত্তর দেওয়া হলো—
সারমর্ম:
মন্টেনিগ্রোর ভিসা বা পতাকায় অমুসলিম প্রতীক থাকার কারণে আপনি যদি শুধু দেশটিতে বৈধ প্রয়োজনে (যেমন: চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা, ভ্রমণ) যান, তাহলে তা গুনাহ নয় এবং ইমানও চলে যাবে না। তবে শর্ত হলো—সেখানে গিয়ে আপনি নিজের দ্বীন বজায় রাখতে পারবেন এবং কোনো শিরকি কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হবেন না।
বিস্তারিত কারণ ও দলিল:
১. অমুসলিম দেশে ভ্রমণের হুকুম:
হানাফি ফিকহে অমুসলিম দেশে বৈধ উদ্দেশ্যে ভ্রমণ জায়েজ আছে, যদি সেখানে দ্বীন পালনে বাধা না থাকে। রাসূলুল্লাহ ﷺ সাহাবাদের হাবশায় হিজরতের অনুমতি দিয়েছিলেন, যদিও হাবশার রাজা নাজ্জাশি খ্রিষ্টান ছিলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৮৬৬)
আল্লাহ তাআলা বলেন:
﴿وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّينِ مِنْ حَرَجٍ﴾ (الحج: ৭৮)
অর্থ: "তিনি দীনের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কোনো সংকীর্ণতা রাখেননি।"
২. প্রতীক বা লোগোর ব্যাপার:
ভিসা বা পতাকায় অমুসলিম প্রতীক থাকা আপনার নিজের ইমানের ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না, যতক্ষণ না আপনি সে প্রতীককে সম্মান বা পূজা করেন। হানাফি ফিকহে বলা হয়েছে: যদি কোনো মুদ্রায় ক্রুশ বা প্রতীক থাকে, তবে তা ব্যবহার করা জায়েজ, কারণ ব্যবহারকারী তা পূজা করে না বরং প্রয়োজনে ব্যবহার করে। (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৮৯; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৫০)
আপনার ভিসা বা পাসপোর্টে যে প্রতীক আছে, তা কেবল সরকারি নথি; আপনি তা গলায় ধারণ করছেন না বা পূজা করছেন না। তাই এতে কোনো গুনাহ নেই।
৩. ইমান চলে যাওয়ার প্রসঙ্গ:
ইমান চলে যাওয়ার মতো গুরুতর বিষয় কেবল তখনই ঘটে যখন কেউ সশরীরে কুফরি কাজ করে বা মুখে কুফরি কথা বলে, আর তাতে তার অন্তরও সায় দেয়। শুধু অমুসলিম দেশে যাওয়া বা ভিসায় প্রতীক থাকা ইমান নাশের কারণ নয়। (আল-ফিকহুল আকবার, ইমাম আবু হানিফা; শারহুত তাহাবিয়্যাহ)
৪. আপনার করণীয়:
- ভিসা পেলে দেশে গিয়ে দ্বীন পালনের চেষ্টা করুন—নামাজ, রোজা, হালাল খাবার ইত্যাদি।
- কোনো শিরকি উৎসব বা অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন না।
- যদি মনে করেন সেখানে দ্বীন পালন করা অসম্ভব, তাহলে না যাওয়াই উত্তম। কিন্তু বর্তমানে বেশিরভাগ ইউরোপীয় দেশে মুসলিমদের নামাজ, হালাল খাবার ইত্যাদির ব্যবস্থা আছে।
হানাফি কিতাবের রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদিন): অমুসলিম দেশে ভ্রমণ ও প্রতীক সম্পর্কে ফতোয়া। (খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২৮৫; খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৩৮৯)
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকি উসমানি): ভ্রমণ ও ভিসা সংক্রান্ত ফতোয়া। (খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৪৫৫)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভি): অমুসলিম দেশে যাওয়ার অনুমতি ও শর্ত। (খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২১৪)
- বেহেশতি জেওর (আশরাফ আলী থানভি): অমুসলিমদের প্রতীক ও তা ব্যবহারের বিধান। (দশম অধ্যায়)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরি): "لا بأس بالسفر إلى بلاد الكفر لحاجة مع حفظ الدين" (অমুসলিম দেশে দ্বীন রক্ষা করে প্রয়োজনে সফরে কোনো দোষ নেই)। (খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৬৪)
উপসংহার:
আপনার ভিসা ও ভ্রমণ গুনাহ নয় এবং ইমান চলে যাবে না। আল্লাহ তাআলা আপনার উদ্দেশ্যকে জানেন। তাই দ্বিধা না করে আপনি অ্যাপয়েন্টমেন্টে যান এবং ভিসা পেলে দেশে গিয়ে দ্বীনের ওপর অটল থাকার চেষ্টা করুন।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।