কাজিনের সাথে বিয়ের হবে। বিয়ের আগে কি মেসেজে কথা বলা কি জায়েয হবে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আমার কাজিনের সাথে আমার বিয়ের কথা চলছে,পারিবারিক ভাবে সব দিকই ওকে।এমনকি একসময় ওকে আমার পছন্দ ছিলো না,হুট করেই ৮/৯ মাস আগে ওর প্রতি আমার ভালো লাগা শুরু হয়
জানি না কিভাবে,কেনো!!
আমার পরিবার প্র্যাকটিসিং না,আমি প্র্যাকটিসিং।আমি পর্দা করি তবে মাহরাম এখনো মেইনটেইন শুরু করি নি।তবে নিয়ত হচ্ছে পূর্ণ ভাবে সব করার
আমার কাজিন এত প্র্যাকটিসিং না,ট্রাই করছে
আমার উনার সাথে মেসেজে কথা হয়,কারণ বাসায় গেলেই দেখা হয়।জানি গুনাহ বাট অফ করার ওয়ে পাচ্ছিনা
উনার কোনো গুনাহর কাজে আমি বুঝাই,এটা এভাবে চেইন্জ করতে হবে।উনি বলেচেন করবো,একটু টাইম লাগবে
আজকে উনি খেলা দেখতে যাবেন, তাও উনার ফ্র্যান্ড,ফ্র্যান্ডের ভাই + ভাবির সাথে
আমার এটা শোনার পর থেকেই মন টা ভালো লাগছেনা।
মনে হচ্ছে আল্লাহ কেনো এদিকে মন টানলো।আমি অনেক নামাজ,দুয়া,ইস্তিখারা করেছি যেনো ভাঙার থাকলে ভেঙে যায়।ভাঙেনি, আরো ডিপ হয়েছে পারিবারিক ভাবে সব
আমি বুঝতে পারছিনা কি করবো?
উনাকে কি বলবো?
আল্লাহর কাছে কত কত দুয়া করেছি একজন দ্বীনদার হাসব্যান্ডের!
টু টাফ!!
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রথমেই জেনে রাখা জরুরি যে, ইসলাম বিবাহপূর্ব নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, গোপন কথা বলা, দেখা-সাক্ষাৎ ইত্যাদি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَا ۖ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا
“আর ব্যভিচারের কাছেও যেও না; নিশ্চয় তা অশ্লীল কাজ এবং খুবই নিকৃষ্ট পথ।” (সূরা বনী ইসরাঈল, ১৭:৩২)
এই আয়াতে শুধু জেনা নয়, বরং জেনার পথ ও উপকরণও নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যেমন: কামভাব সহকারে তাকানো, কথোপকথন, একান্তে সাক্ষাৎ (খালওয়াত), ইশারা-ইঙ্গিত ইত্যাদি।
আপনার প্রশ্নের প্রেক্ষিতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক:
১. বর্তমান সম্পর্কের শরয়ী বিধান
আপনি লিখেছেন, “আমার উনার সাথে মেসেজে কথা হয়, কারণ বাসায় গেলেই দেখা হয়। জানি গুনাহ, কিন্তু বাট অফ করার ওয়ে পাচ্ছিনা।”
এটি স্পষ্ট হারাম। কারণ:
- ইসলাম বিবাহের পূর্বে পাত্র-পাত্রীর মধ্যে শুধুমাত্র প্রস্তাব ও প্রয়োজনীয় কথাবার্তার অনুমতি দেয়, তাও পরিবারের তত্ত্বাবধানে এবং শরয়ী পর্দা রক্ষা করে। (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৫২৪০)
- মেসেজ, ফোন, বা সামনাসামনি গোপন কথা বলা জেনার পথ (মুকাদ্দিমাত-যিনা) যা কঠোরভাবে হারাম। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩২৮)
সমাধান:
- অবিলম্বে সব ধরনের মেসেজ, ফোন ও একান্ত সাক্ষাৎ বন্ধ করুন। তওবা করুন এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন।
- বিয়ের প্রক্রিয়াটি পরিবারের মাধ্যমে এগিয়ে নিন। পরিবার সম্মত হলে বিয়ে সম্পন্ন করুন; অসম্মত হলে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান বের করার চেষ্টা করুন। যদি পরিবার পথ না দেয়, তবে একজন অভিভাবক (ওয়ালী) বা ইসলামী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও বিয়ে বৈধভাবে সম্পন্ন করা যায়। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৬১)
২. ইস্তিখারা ও দোয়া সম্পর্কে আপনার ধারণা
আপনি লিখেছেন, “আমি অনেক নামাজ, দোয়া, ইস্তিখারা করেছি যেন ভাঙার থাকলে ভেঙে যায়। ভাঙেনি, আরো ডিপ হয়েছে পারিবারিক ভাবে সব।”
ইস্তিখারা হলো: ভালো-মন্দ বোঝার জন্য আল্লাহর কাছে দিকনির্দেশনা চাওয়া, জ্যোতিষ বা মানসিক অনুভূতি দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া নয়। ইস্তিখারার পর কোনো কাজের প্রতি মন বসে গেলে বা কাজটি সহজ হয়ে গেলে সেটাই কল্যাণকর মনে করতে হবে। কিন্তু আপনার বর্তমান পরিস্থিতিতে আপনি জেনে শুনে হারাম কাজে লিপ্ত (মেসেজ/দেখা) – এরূপ অবস্থায় ইস্তিখারা ফলপ্রসূ হয় না। প্রথমে গুনাহ থেকে বেরিয়ে আসুন, তারপর ইস্তিখারা করুন। (আল-ইস্তিখারাহ, ইবনু তাইমিয়্যাহ)
৩. আপনার কাজিনের দ্বীনদারি ও চরিত্র
আপনি লিখেছেন, “উনি এত প্র্যাকটিসিং না, ট্রাই করছে।” এবং “আজকে উনি খেলা দেখতে যাবেন, ফ্রেন্ড, ফ্রেন্ডের ভাই + ভাবির সাথে।”
এটি স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে তিনি এখনও দ্বীনি পরিবেশ ও ইসলামী মূল্যবোধে প্রতিষ্ঠিত নন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِذَا جَاءَكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ خُلُقَهُ وَدِينَهُ فَزَوِّجُوهُ
“যখন তোমাদের কাছে এমন ব্যক্তি বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসে যার চরিত্র ও দ্বীন তোমরা পছন্দ কর, তাহলে তাকে বিয়ে দাও।” (তিরমিযী, হাদীস: ১০৮৫)
সুতরাং:
- আপনি যদি তাকে বিয়ে করতেই চান, তবে তাকে দ্বীনের প্রতি দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে বলুন। তার আচরণ (খেলা দেখা, বেপর্দা পরিবেশে যাওয়া) এখনই পরিবর্তন না করলে ভবিষ্যতে সমস্যা হবে।
- স্বামী নির্বাচনে দ্বীনদারি প্রথম শর্ত। ইচ্ছা থাকলেই হয় না, বাস্তব আমল ও চরিত্র দেখা জরুরি।
৪. আপনার করণীয়
ক. তওবা করুন:
وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
“হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও।” (সূরা নূর, ২৪:৩১)
খ. এখনই উনার সাথে ব্যক্তিগত যোগাযোগ বন্ধ করুন।
পরিবারের মাধ্যমে বা কোনো মাহরামের উপস্থিতিতে প্রয়োজনীয় আলোচনা করুন।
গ. উনাকে দ্বীনের দাওয়াত দিন:
তাকে স্পষ্টভাবে বলুন, “বিয়ের পূর্বে আমাদের এভাবে কথা বলা, দেখা করা হারাম। তাই আমি এখন থেকে সরাসরি যোগাযোগ বন্ধ করছি। আপনি যদি দ্বীনদার হন এবং বিয়ে করতে চান, তাহলে পরিবারের কাছে প্রস্তাব পাঠান।”
ঘ. নিজের দ্বীনি আমল শক্তিশালী করুন:
আপনি নিজে পর্দা শুরু করেছেন, মাহরাম মেইনটেইন করার নিয়ত করেছেন—এটি খুব ভালো উদ্যোগ। তবে একে বাস্তবায়ন করুন। এখনই পুরোপুরি ইসলামী পর্দা ও লাইফস্টাইলে আসুন।
ঙ. ধৈর্য ও দোয়া চালিয়ে যান:
আল্লাহর কাছে ভালো স্বামীর জন্য দোয়া করুন। কিন্তু মনে রাখবেন, বিয়ের আগে কাউকে ‘স্বামী’ ভেবে আবেগী হওয়া ঠিক নয়। কুরআনে এসেছে:
وَعَسَىٰ أَنْ تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَكُمْ ۖ وَعَسَىٰ أَنْ تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَكُمْ
“আর তোমরা যা অপছন্দ কর, তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর হতে পারে; আর তোমরা যা ভালোবাস, তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর হতে পারে।” (সূরা বাকারা, ২:২১৬)
৫. বিশেষ দ্রষ্টব্য
- আপনি “উনার গুনাহ বুঝাই” – মনে রাখবেন, আপনি যদি তার সাথে গুনাহের মাধ্যমেই (মেসেজ/দেখা) তাকে সংশোধন করতে চান, তাহলে এটি সঠিক পদ্ধতি নয়, বরং শয়তানের ধোঁকা। বরং তাকে দ্বীনের পথে আহ্বান করুন বিচ্ছিন্ন ও শরয়ি পদ্ধতিতে।
- বিয়ে সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত কোনো দৈহিক আকর্ষণ বা গভীর সম্পর্কে জড়াবেন না। ইসলামী শরিয়ত বিয়ের আগে পাত্র-পাত্রীর জন্য নির্ধারিত সীমারেখা লঙ্ঘন করতে দেয় না।
উপসংহার:
আপনার এখন প্রধান কাজ হলো গুনাহ থেকে বেরিয়ে আসা, তওবা করা, এবং বিয়ে শরয়ি পদ্ধতিতে সম্পন্ন করার চেষ্টা করা। যদি উনি দ্বীনদার না হন, তাহলে তাঁর জন্য অপেক্ষা করা বা তাকে বিয়ে করতে বাধ্য না হওয়াই উত্তম। আল্লাহ তাআলা উত্তম প্রতিদান দেন ধৈর্যশীলদের।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক পথ প্রদর্শন করুন। (আমিন)
ফতোয়া বিভাগের দায়িত্বশীল মুফতির স্বাক্ষর:
[স্বাক্ষর ও তারিখ]