তালাক কি স্ত্রীর শর্ত অনুযায়ী পতিত হয়? স্ত্রী যদি তালাকের শর্ত দেয়, তাহলে কি তা পতিত হবে?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 2890
Questioner: Tasnim
Question Asked: 19 Jul 2026, 11:34 PM
Reviewed & Published: 19 Jul 2026, 11:43 PM
Views: 127
Tokens: 10,299
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম হুজুর।
১. একদিন আমার স্বামীর সাথে আমার প্রচন্ড ঝগড়া হয়। তখন উনি আমাকে মানানোর জন্য আমার আপুর সাথে কথা বলতে চান। কিন্ত আমার আপুর ফোন নম্বর উনার কাছে ছিল না। তাই উনি আমাকে বার বার ফোন নাম্বার দিতে বলেন। আমি দিতে রাজি হয়নি। তাই উনি আমাকে নাম্বার দেওয়ার জন্য অনেক অনুরোধ করেন। উনার ধারণা, আমার মেন্টাল প্রবলেম দেখা দিছে, তাই ঝগড়া করতেছি আর তালাক চাচ্ছি উনার কাছে।
তারপর আমাকে আবার অনুরোধ করলে, আমি আমার স্বামীকে একটি শর্ত দেই যে, আপুর সাথে কথা বলার পর আমাকে তালাক দিতে হবে। বা ফোন নাম্বার দেওয়ার পর আমাদের তালাক হয়ে যাবে। নাইলে ফোন নম্বর দিব না আমি। উনি রাজি হন এতে।।বলেন যে, আগে আমি আপুর সাথে কথা বলি। তোমার অবস্থা উনাকে জানানো দরকার।
এর কিছুক্ষণ পর, আমার মাথায় আসে, যদি এখন আপুর সাথে কথা বলে বা আমি আপুর ফোন নম্বর দেই তাহলে তালাক হয়ে যাবে। আমি সাথে সাথে অনেক অনুতপ্ত হয়। আল্লাহর কাছে মাফ চাই। আমার স্বামীর সাথে সব ঠিক হয়ে যায়। এর কয়েক ঘণ্টা পর স্বামী আমার আপুর সাথে কথা বলতে চায়, তাই উনাকে ফোন নাম্বার না দিয়ে আমার আপুকে বলি, উনাকে মেসেজ দিতে। আমার আপুর সাথে এর পরদিন মেসেজে কথা হয় উনার কিন্তু কথা বলার পর উনি আমাকে তালাক দেননি। এর কয়েক মাস পর, আমার স্বামীর সাথে ফোনে কথা বলার সময় আপু সামনে ছিল। তখন আপুর সাথে উনার কথা হয় আমাকে নিয়ে।।কিন্তু তালাক নিয়ে উনি কিছু বলেননি।
হুজুর, আমি ভেবেছিলাম, ওইদিনই আমার স্বামীর সাথে আমার তালাক হয়ে যাবে। তাই এই শর্ত দিয়েছিলাম। কিন্তু পরবর্তিতে আমাদের মধ্যে সব ঠিক হয়ে যায়। তারপর আমার আপুর সাথে উনার কথা হয়।। হুজুর,, আমি যে বললাম,, আপুর সাথে কথা বলার পর আমাদের তালাক হয়ে যাবে আর এতে আমার স্বামী আমাকে মানানোর জন্য রাজি হন।এই কথা বলার জন্য কি তালাক হবে?
২. হুজুর, একদিন ইউটিউবে তালাক নিয়ে একটি ভিডিও দেখে আমার স্বামীকে ওই ভিডিও পাঠিয়ে বললাম আমাদের তালাক হয়ে গেছে। এর উত্তরে উনি কি বলছেন আমার মনে নেই। উনি আমাকে ব্লক করে দিছেন। আর রেগে বলেছেন, আমার সাথে আর কথা বলবা না। তারপর, আমি উনাকে কল দেই, উনি তখন বলেন, তুমি না বললা, তালাক হয়ে গেছে। এখন আবার কেন কল দিছো? কি চাও তুমি?
তখন আমি বললাম,, এভাবে তো তালাক হয় না। আমি ভুল ভেবেছিলাম। এরপর উনি বলেন,, হুম, আমি জানতাম তালাক হয়নি।
এতে কি তালাক হবে?

Answer

উত্তর প্রদানে:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রশ্নকারী বোন তাসনিমের প্রশ্নের উত্তর নিম্নরূপ:

প্রথম পরিস্থিতি:

আপনি আপনার স্বামীকে শর্ত দিয়েছিলেন যে, “আপুর সাথে কথা বলার পর আমাকে তালাক দিতে হবে” বা “ফোন নাম্বার দেওয়ার পর আমাদের তালাক হয়ে যাবে”। স্বামী এতে রাজি হন। কিন্তু পরে সব ঠিক হয়ে যায় এবং স্বামী আপুর সাথে কথা বললেও আপনাকে তালাক দেননি। সুতরাং এতে কোনো তালাক হয়নি।

কারণ:

  • তালাক শুধুমাত্র স্বামীর ইচ্ছা ও উচ্চারণের মাধ্যমে কার্যকর হয়। স্ত্রী তালাক দিতে পারে না। আপনি যে শর্ত দিয়েছিলেন, তা কেবল একটি অনুরোধ বা শর্ত ছিল; এটি তালাকের স্বয়ংক্রিয় ঘোষণা নয়।
  • স্বামী আপনার শর্ত মেনে নিলেও তিনি স্পষ্টভাবে বলেননি, “যদি আমি আপুকে ফোন করি তাহলে তুমি তালাক” – বরং তিনি শুধু ‘রাজি’ হয়েছিলেন, যা তালাকের জন্য যথেষ্ট নয়। হানাফী ফিকহ অনুসারে, তালাক শুধু স্বামীর স্পষ্ট বাক্য বা ইঙ্গিত দ্বারাই হয়, স্ত্রীর শর্ত বা স্বামীর নীরব সম্মতি দ্বারা হয় না। (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৬৪; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৫০)
  • পরবর্তীতে স্বামী আপুর সাথে কথা বললেও তিনি তালাক দেননি, বরং আপনাদের সম্পর্ক আগের মতোই ছিল। এতে প্রমাণিত হয় যে তিনি তালাকের নিয়ত করেননি এবং সেই শর্তকে কার্যকর করেননি।
  • কাজেই আপনার উক্ত শর্ত এবং পরবর্তী ঘটনার কারণে কোনো তালাক হয়নি। আপনারা এখনও স্বামী-স্ত্রী রয়েছেন।

দ্বিতীয় পরিস্থিতি:

আপনি ইউটিউবের একটি ভিডিও দেখে স্বামীকে বলেন, “আমাদের তালাক হয়ে গেছে”। স্বামী রেগে গিয়ে ব্লক করেন এবং পরে বলেন, “তুমি না বললা, তালাক হয়ে গেছে”। কিন্তু আপনি যখন বলেন, “এভাবে তালাক হয় না, আমি ভুল ভেবেছিলাম”, তখন তিনি বলেন, “হুম, আমি জানতাম তালাক হয়নি”। এতেও কোনো তালাক হয়নি।

কারণ:

  • আপনি স্ত্রী হয়ে তালাকের ঘোষণা দিতে পারেন না; তালাক কেবল স্বামীর পক্ষ থেকে কার্যকর হয়। আপনার কথা “আমাদের তালাক হয়ে গেছে” কোনো তালাক নয়। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৫০)
  • স্বামীও কোনো তালাকের বাক্য বলেননি। তিনি শুধু আপনার কথার পুনরাবৃত্তি করেছেন এবং পরে স্বীকার করেছেন যে তালাক হয়নি।
  • সুতরাং এ ঘটনায়ও তালাক সংঘটিত হয়নি।

সারসংক্ষেপ:

উভয় ঘটনায় আপনার বিবাহ অটুট আছে। তালাক হয়নি। তবে ভবিষ্যতে তালাকের বিষয়ে হাসি-ঠাট্টা বা ভুল ধারণা থেকে কোনো কথা বলবেন না। কোনো সন্দেহ হলে একজন আলিমের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করুন। আল্লাহ তাআলা আপনাদের সম্পর্ক মজবুত করুন।

উল্লেখ্য:

  • “তালাক দেওয়া বা নেওয়া” গুরুতর বিষয়। এটি শুধুমাত্র সুস্পষ্ট ও ইচ্ছাকৃতভাবে স্বামী কর্তৃক উচ্চারিত হলে কার্যকর হয়।
  • স্ত্রীর পক্ষ থেকে শর্ত বা আবেদন তালাক সাব্যস্ত করে না, যতক্ষণ না স্বামী নিজে তালাকের শব্দ বলেন। (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৬৪)
  • কুরআনে নির্দেশ: “তালাক দুইবার। তারপর হয় সংরক্ষণ করবে ন্যায়সংগতভাবে, না হয় মুক্ত করবে সদয়ভাবে।” (সূরা বাকারাহ, ২:২২৯)

দলিল:

  • ফাতাওয়া হিন্দিয়া: “الطلاق لا يقع بقول الزوجة: طلقت نفسي أو طلقت زوجي إلا إذا كان الزوج قد فوض إليها” (অর্থ: স্ত্রীর ‘আমি তালাক দিলাম’ বা ‘আমার স্বামী তালাক দিলেন’ কথায় তালাক হয় না, যদি না স্বামী তাকে তালাকের অধিকার দেয়) (১/৩৫০)
  • রদ্দুল মুহতার: “ولو علق الطلاق بشرط ثم لم يوجد الشرط لا يقع” (অর্থ: শর্তযুক্ত তালাকের ক্ষেত্রে শর্ত পূর্ণ না হলে তালাক হয় না) (৩/২৬৪)

পরামর্শ:
আপনারা স্বামী-স্ত্রী হিসেবে সুন্দরভাবে বসবাস করুন। ভবিষ্যতে রাগের সময় তালাকের কথা বলা থেকে বিরত থাকুন।

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.