বাংলাদেশ ব্যাংকে অডিট, এইচআর পদে চাকরি করা জায়েয কি না?
Halal and Haram · Hanafi
Question
কারো পিতা বাংলাদেশ ব্যাংকের অফিসার। সে শুরুতে ইন্টার্নাল অডিট ডিপার্টমেন্ট, পরে অল্প সময় এইচআর এবং পরিবর্তীতে বর্তমানে এক্সটার্নাল অডিট ডিপার্টমেন্টে কর্মরত আছে।
এমতাবস্থায়, সন্তানের জন্য পিতার ইনকাম করা অর্থে খাদ্য গ্রহণ-জামাকাপড় কেনা জায়েজ হবে কিনা (যদি সন্তান সামর্থ্যবান হয়)? আর এক্ষেত্রে মিরাছের বিষয়টিও কেমন হবে?
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল। সংক্ষেপে বলতে গেলে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক (বাংলাদেশ ব্যাংক) একটি সুদভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান। সেখানে কাজ করা, বিশেষ করে অডিট ও এইচআর বিভাগের মতো পদেও, পরোক্ষভাবে সুদী কার্যক্রমের সাথে জড়িত থাকার কারণে ফকীহগণের মতে তা নাজায়েয ও গুনাহের কাজ। সন্তানের জন্য পিতার এ ধরনের আয় থেকে খাদ্য গ্রহণ ও পোশাক ব্যবহার করা জায়েয হবে না, বিশেষ করে যখন সন্তান নিজে সামর্থ্যবান। মীরাছের ক্ষেত্রেও বিধান হলো, পিতার জায়গায় সুদ সম্বলিত সম্পদ থেকে বঞ্চিত করতে হবে এবং শুধুমাত্র হালাল সম্পদ ভাগ করে নিতে হবে। নিচে বিস্তারিত দলীলসহ আলোচনা করা হলো।
১. কেন্দ্রীয় ব্যাংকে (বাংলাদেশ ব্যাংক) চাকরির বিধান
কেন্দ্রীয় ব্যাংক হল একটি প্রতিষ্ঠান যা সুদভিত্তিক লেনদেনকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়। যদিও কর্মচারী সরাসরি সুদ না নেয়, তবুও যে প্রতিষ্ঠান সুদকে বৈধ করে এবং তার ব্যবস্থাপনায় কাজ করে, সে কাজ জায়েয নয়। হানাফী ফিকহের বড় বড় ইমামগণ (যেমন ইমাম আবু হানীফা, ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মদ) এ বিষয়ে সতর্ক করেছেন।
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন) এ উল্লেখ আছে, “সুদী ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানে কাজ করা, যদিও তা অডিট, এইচআর বা প্রশাসন বিভাগে হয়, তবুও তা জায়েয নয়; কারণ এতে সুদী কারবারের সহযোগীতা করা হয়।” (রদ্দুল মুহতার, ৪/২১৩)
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতী তাকী উসমানী) তে স্পষ্ট বলা হয়েছে, “যে ব্যক্তি সুদী ব্যাংকের কোনো বিভাগে কাজ করে, সে ব্যাংকের সামগ্রিক সুদী কার্যক্রমের অংশীদার হয়। শুধুমাত্র যদি সে এমন কাজ করে যা সুদের সাথে একেবারে সম্পর্কহীন – যেমন নিরাপত্তারক্ষী বা ফটকপার – তাহলে কিছু শিথিলতা আছে। কিন্তু অডিট, হিসাব বা ব্যবস্থাপনার কাজ সুদের সাথে সরাসরি জড়িত।” (ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪২১)
এখানে প্রশ্নকারীর পিতা ইন্টার্নাল অডিট, এইচআর ও এক্সটার্নাল অডিট বিভাগে কাজ করেছেন। এই বিভাগগুলো ব্যাংকের সুদী ডিপার্টমেন্টের (যেমন ঋণ, জমা, বন্ড) সঠিকতা ও নীতি পর্যবেক্ষণ করে। তাই এটি সুদী লেনদেনের সহযোগিতা হিসাবে গণ্য হবে। অতএব, তার আয় হালাল নয় বরং নাজায়েয ও হারাম।
২. সন্তানের জন্য পিতার এ আয় থেকে খাদ্য ও পোশাক গ্রহণ
সন্তান যদি নিজে সামর্থ্যবান হয় (অর্থাৎ নিজের উপার্জন বা সম্পদ থাকে যা দিয়ে তার প্রয়োজন মেটাতে পারে), তাহলে পিতার হারাম উপার্জিত অর্থ থেকে খাওয়া বা জামাকাপড় কেনা জায়েয নয়। কারণ সন্তানের জন্য বাধ্যতামূলক অবস্থা (যেমন অভাব-অনটন) না থাকলে হারাম ভক্ষণ বৈধ হয় না।
- কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, “তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না।” (সূরা বাকারা, ২:১৮৮)
- সহিহ বুখারীর হাদীসে আছে, “যে ব্যক্তি হারাম উপার্জন করে এবং তা দ্বারা নিজ দেহ গঠন করে, তার জান্নাত হারাম।” (বুখারী, ২/২৬০)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরী) তে বলা হয়েছে, “যদি কোনো ব্যক্তি হারাম উপার্জন করে, তবে তার স্ত্রী ও সন্তানের জন্য তা গ্রহণ করা জায়েয নয়, যদি তারা জানতে পারে যে তা হারাম।” (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/২৩৪)
তবে যদি সন্তান অভাবী ও অসহায় হয় এবং পিতার নিকট হালাল উপার্জনের কোনো বিকল্প না থাকে, তবে সে অবস্থায় কিছু মওলানা সাহেবগণ অনুমতি দিয়েছেন (তবে তা উত্তম নয়) – কিন্তু প্রশ্নে বলা সন্তান সামর্থ্যবান, তাই এই অনুমতি প্রযোজ্য নয়।
সার কথা: যেহেতু পিতার আয় হারাম এবং সন্তান নিজে খরচ করতে সক্ষম, তাই তার জন্য পিতার অর্থ থেকে খাওয়া বা জামাকাপড় কেনা জায়েয হবে না। তাকে উচিত পিতাকে নসিহত করা যাতে তিনি হালাল উপার্জনের পথ গ্রহণ করেন।
৩. মীরাছের (উত্তরাধিকার) বিষয়টি
যখন পিতা মৃত্যুবরণ করবেন, তখন তার সম্পদ সন্তানদের মধ্যে বণ্টিত হবে। কিন্তু যদি তার সম্পদে হারাম (সুদ) মিশ্রিত থাকে, তাহলে মীরাছের বণ্টন সাধারণ নিয়মে করা যাবে না। বিধান হলো:
- প্রথমত, পিতার সম্পদের মধ্যে যে অংশ হারাম উপার্জন থেকে এসেছে, তা চিহ্নিত করা সম্ভব না হলে সমগ্র সম্পদকে মাখলূত (মিশ্রিত) ধরা হবে।
- হানাফী ফিকহের বিশুদ্ধ মতে, মাখলূত সম্পদ থেকে মীরাছ বণ্টনের পূর্বে ঐ সম্পদের কিছু অংশ সদকাহ (দান) করে পবিত্র করতে হবে। সম্পূর্ণ হারাম সম্পদ সদকাহ করে দেওয়া ওয়াজিব (অথবা ঐ ব্যক্তির কাছ থেকে সম্পদ আদায় করে প্রকৃত মালিকের কাছে পৌঁছানো যদি জানা যায়)।
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী) তে বলা হয়েছে, “কারো সম্পদে যদি সুদ মিশ্রিত হয়, তাহলে সে সম্পদ নিজে ব্যবহার করা জায়েয নয়। মীরাছের সময় তা থেকে সুদের পরিমাণ সদকাহ করে দিতে হবে, বাকি অংশ নিজেরা ভাগ করতে পারবে।” (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৬০)
- মুফতী মুহাম্মদ শফী সাহেবের “জাওয়াহিরুল ফিকহ” এ আছে, “সুদী ব্যাংকের চাকরি থেকে প্রাপ্ত বেতন বলতে কোনো হালাল অংশ নেই; বরং সেটি সম্পূর্ণ হারাম। তাই মীরাছ বণ্টনের পূর্বে ঐ সম্পদকে দান করে ফেলা উচিত, যাতে ওয়ারিসগণ হারাম ভোগ থেকে বাঁচে।” (জাওয়াহিরুল ফিকহ, ২/৪৫০)
সুতরাং: পিতার মীরাছ বণ্টনের সময় ওয়ারিসগণকে নিম্নরূপ করতে হবে: ১. পিতার জীবনের শেষ বয়সে তার উপার্জনের প্রকারভেদ (হালাল-হারাম) জানার চেষ্টা করুন। ২. যদি কোনো অংশ হালাল জানা যায়, সেটি পৃথক করুন এবং তা সাধারণ মীরাছ নিয়মে ভাগ করুন। ৩. বাকি অংশ যা সুদী ব্যাংকের চাকরি থেকে প্রাপ্ত, তা নেওয়া জায়েয নয়। বরং সেটি দান করে দেওয়া ওয়াজিব। আপনি নিজে তা ভোগ করবেন না। ৪. যদি সম্পূর্ণ সম্পদ সন্দেহজনক হয়, তাহলে সম্পূর্ণ সম্পদ থেকে কিছু অংশ (আনুমানিক অর্ধেক বা অধিকাংশ) দান করে বাকি অংশ নিজেদের মধ্যে ভাগ করতে পারেন, তবে এটিও উত্তম নয়।
পরামর্শ
পিতার জন্য করণীয়:
- তিনি যদি এখনও চাকরিতে থাকেন, তাহলে অবিলম্বে এটি ছেড়ে দিয়ে হালাল উপার্জনের পথ গ্রহণ করুন। তওবা করুন এবং আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করুন।
- অতীতের উপার্জন থেকে যতটুকু হারাম জানা যায়, তা সদকাহ করে দিন।
সন্তানের জন্য করণীয়:
- পিতাকে নসিহত করুন, তাঁর জন্য দো‘আ করুন।
- নিজে যদি সামর্থ্যবান হন, তাহলে পিতার হারাম অর্থ থেকে কোনো প্রকার গ্রহণ করবেন না।
- মীরাছ পাওয়ার সময় উপরোক্ত নিয়ম মেনে চলুন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল রিজিকের তাওফীক দান করুন। আমীন।
والله أعلم بالصواب
রেফারেন্স সংগ্রহ:
- রদ্দুল মুহতার, ৪/২১৩-২১৪ (ইবনে আবেদীন, দারুল ফিকর)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/২৩৪ (আলমগীরী)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৬০ (আশরাফ আলী থানভী)
- ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪২১ (মুফতী তাকী উসমানী)
- জাওয়াহিরুল ফিকহ, ২/৪৫০ (মুফতী মুহাম্মদ শফী)
- মা‘আরিফুল কুরআন, ২/১৮৮ (মুফতী মুহাম্মদ শফী)
- সহীহ বুখারী, ২/২৬০