মে'রাজের রাত্রে নবী সাঃ যে সব জাহান্নামিদেরকে দেখেছিলেন, তাদের বিচার কি ইতিপূর্বে হয়ে গিয়েছিলো?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
প্রশ্ন: নবী করীম (صلى الله عليه وسلم) মি’রাজের রাতে জাহান্নামীদের দেখেছিলেন—এ বিষয়ে আমাদের আকীদা কী? তাদের কি ইতিমধ্যে বিচার হয়ে গিয়েছিল, তারপর তারা জাহান্নামে গেছে?
উত্তর:
মি’রাজের ঘটনা ইসলামী আকীদার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ রাতে রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) শুধু আসমান ও বরকতময় স্থানসমূহই ভ্রমণ করেননি, বরং জান্নাত ও জাহান্নামও প্রত্যক্ষ করেছেন এবং সেখানকার অধিবাসীদের অবস্থা দেখেছেন। এটি সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। যেমন সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত, তিনি জাহান্নামের বিভিন্ন শাস্তির দৃশ্য দেখেছেন—যারা সুদ খায়, যারা মিথ্যা কথা বলে, যারা পিতা-মাতার অবাধ্য হয়, ইত্যাদি। (সহীহ বুখারী: ৭০৪; সহীহ মুসলিম: ২৭৫)
জাহান্নামীদের বিচার প্রসঙ্গে
যাদেরকে নবী করীম (صلى الله عليه وسلم) জাহান্নামে দেখেছেন, তারা সকলেই পূর্বে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। ইসলামী বিশ্বাস মতে, প্রত্যেক মানুষ মৃত্যুর পর কবর বা বারযাখ জীবন শুরু করে। সেখানে তার আমল অনুযায়ী সুখ-শাস্তি ভোগ করে। এ শাস্তি কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। তারপর কিয়ামতে পুনরুত্থিত হয়ে চূড়ান্ত বিচারের পর স্থায়ী জান্নাত বা জাহান্নামে যাবে।
অতএব, মি’রাজের রাতে নবী করীম (صلى الله عليه وسلم) যাদের দেখেছেন, তারা ইতিমধ্যে মৃত্যুবরণ করেছিলেন এবং তাদের আমল অনুযায়ী বারযাখের শাস্তি ভোগ করছিলেন। অর্থাৎ তাদের পার্থিব জীবনের বিচার মৃত্যুর মাধ্যমেই শেষ হয়ে গিয়েছিল; কিন্তু কিয়ামতের চূড়ান্ত বিচার এখনো বাকি। আল্লাহ তাআলা নবীকে তাদের বর্তমান অবস্থা দেখিয়ে দিয়েছেন।
আকীদা কী হবে? ১. আমাদেরকে ঈমান রাখতে হবে যে, নবী করীম (صلى الله عليه وسلم) সত্যিই মি’রাজের রাতে জাহান্নাম ও তার অধিবাসীদের দেখেছেন—এটা কোনো রূপক বা কল্পনা নয়। এটি শারী‘আতের নিশ্চিত সত্য।
২. জাহান্নামীদের মধ্যে কিছু ছিল কাফির, কিছু ছিল পাপী মুসলিম। যারা কুফরী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছিল, তাদের শাস্তি স্থায়ী—যা বারযাখেও শুরু হয়েছে এবং কিয়ামতের পর আরও ভয়াবহ হবে। আর যারা মুসলিম ছিল কিন্তু পাপে লিপ্ত অবস্থায় তওবা না করেই মৃত্যুবরণ করেছিল, তাদের বারযাখে কিছু শাস্তি হয়; তবে শেষ পর্যন্ত আল্লাহর ইচ্ছায় জান্নাতে যেতে পারে—যদি না শিরকে মৃত্যু হয়।
৩. আমরা বিস্তারিত জিজ্ঞাসা করি না “কেন তাদের এত আগে বিচার হলো?” বরং আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ যা দেখিয়েছেন তা সত্য। আর বারযাখের জীবন কিয়ামতের পূর্বাবস্থা, তাই সেখানে শাস্তি-শিথিলতা উভয়ই হতে পারে। মি’রাজে দেখা দৃশ্যগুলো ছিল বারযাখেরই অংশ।
৪. কুরআন ও হাদীসের বর্ণনার অতিরিক্ত কোনো ব্যাখ্যা গ্রহণ করা জায়েয নয়। আমাদের নিজস্ব বুদ্ধি দিয়ে এর জটিলতা নিরসনের চেষ্টা না করে যেভাবে বর্ণিত হয়েছে, সেভাবেই ঈমান রাখতে হবে। ইমাম আবূ হানীফা (রহ.) বলেন:
"আমরা মি’রাজের হাদীসগুলোকে বিশ্বাস করি এবং যেভাবে বর্ণিত হয়েছে, সেভাবেই মান্য করি।" (আল-ফিকহুল আকবার)
হানাফী কিতাবের রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): মি’রাজের ঘটনা ও বারযাখের শাস্তি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা আছে।
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতী তাকী উসমানী): মি’রাজ সম্পর্কিত আকীদার ব্যাখ্যায় লেখা হয়েছে: "রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) সত্যিই জাহান্নাম ও জান্নাত দেখেছেন। সেখানে তিনি কিছু পাপীকে শাস্তি পেতে দেখেছেন—এটা তাদের বর্তমান অবস্থা, চূড়ান্ত নয়।"
- মা‘আরিফুল কুরআন (মুফতী শাফী‘ উসমানী): সূরা বনী ইসরাঈলের তাফসীরে উল্লেখ করেছেন যে, মি’রাজের রাতে নবী (صلى الله عليه وسلم)-কে জাহান্নাম দেখানো হয়েছিল এবং সেখানে তিনি বিভিন্ন পাপীদের শাস্তির দৃশ্য অবলোকন করেন। এটি ছিল ভবিষ্যতের পূর্বাভাস ও চিহ্ন।
উপসংহার: আমাদের আকীদা হবে—নবী করীম (صلى الله عليه وسلم) মি’রাজের রাতে জাহান্নাম ও তার অধিবাসীদের বাস্তবভাবে দেখেছেন। তারা মৃত্যুবরণ করেছিল এবং তাদের আমল অনুযায়ী বারযাখে শাস্তি ভোগ করছিল। কিয়ামতের পর চূড়ান্ত ফায়সালা হবে। এই বিষয়ে আমরা কুরআন-হাদীসের বাইরে কোনো তর্ক বা যুক্তি না করে “আমান্না বিল্লাহি ওয়া বি-মা জাআ মিন ইন্দিল্লাহ” (আমি আল্লাহর প্রতি এবং তাঁর পক্ষ থেকে যা এসেছে তার প্রতি ঈমান আনলাম) বলব।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সঠিক আকীদার উপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন। (আমীন)
বিঃ দ্রঃ আরো বিস্তারিত জানতে ইমদাদুল ফাতাওয়া, ফাতাওয়া আলমগীরী এবং উসুলুশ শাশী’র মতো হানাফী কিতাব দেখা যেতে পারে।