কালো যাদু নষ্ট করার ইসলামি উপায় সম্পর্কে।
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
এক পরিচিত আপু কিছুদিন আগে প্রায় এক বছর হবে,উনার বাসার কাজের লোক উনাকে হাসের গোশত খাওয়াই দিছিলো। সেই গোশত খাওয়ার পর থেকে আপুর অনেক পা যন্ত্রণা হয়।
তারপর একদিন উনি বাসায় একা থাকলে হঠাৎ করে কে যেন ওয়াশরুমের পানির ট্যাপ ছেড়ে দেই। ওইখান থেকে আপু অনেক ভয় পাই। মানসিক সমস্যা হয় উনার অনেক। উনি শুধু নিজের মৃত্যু চিন্তা করেন, বলেন যে আমার মনে হয় আমি মারা যাব।
তারপর একদিন উনি বাসায় একটা তাবিজ পাই। সেই তাবিজের মধ্যে ( সুই,বরশী, কি একটা লেখা,, সিঁদুর) ছিলো।
এখন তারপর থেকে আপুর অস্বাভাবিক পা যন্ত্রণা হয়। ডাক্তার দেখাইছে শুধু ওষুধ খেলে সাময়িক যন্ত্রণা কম হয়। কিন্তু না খেলে আবার যা তাই। অনেক হুজুর, কবিরাজ দেখাইছে তাও কমে নি। এই নয় মাস ধরে অনেক কষ্ট পাচ্ছে।
১. এখন কালো যাদু নষ্ট করবো কি ভাবে ?
2. আর কীভাবে আমল করে রুকিয়াহ করে চিকিৎসা করতে পারি ?
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নের বিবরণ অনুযায়ী, আপনার পরিচিত আপু সম্ভবত কালো যাদু (সিহর) বা জাদু-টোনার শিকারে পরিণত হয়েছেন। ইসলামি শরিয়তে জাদু নিষিদ্ধ এবং এটি কুফুরির অন্তর্ভুক্ত। তবে জাদুর প্রভাব থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য কুরআন-সুন্নাহ সম্মত পদ্ধতি অনুসরণ করা wajib (অবশ্য কর্তব্য)।
১. কালো যাদু নষ্ট করার ইসলামি পদ্ধতি:
কালো যাদু নষ্ট করতে নিম্নোক্ত কুরআন-সুন্নাহ সম্মত আমল করুন:
ক. সুরা ফালাক ও সুরা নাস পড়া:
প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর এবং ঘুমানোর আগে ৩ বার করে সুরা ফালাক (১১৩) ও সুরা নাস (১১৪) পড়ে নিজের শরীরে ফুঁক দিন। এটি জাদু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকরী পদ্ধতি।
(হাদিস: সহিহ বুখারি, ৫০১৬)
খ. আয়াতুল কুরসি ও শেষ দুই আয়াত পড়া:
সুরা বাকারার আয়াত ২৫৫-২৫৭ (বিশেষ করে আয়াতুল কুরসি, ২৫৫ ও ২৮৫-২৮৬) পড়ে পানিতে ফুঁক দিয়ে সেই পানি পান করান এবং গোসল করান।
(হাদিস: মুসলিম, ৮১০; তিরমিজি, ২৮৭৮)
গ. মিশকাতুল মাসাবিহের রুকিয়াহ পদ্ধতি:
রাসুলুল্লাহ (সা.) জাদুগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য নিম্নোক্ত দোয়া পড়তেন:
"বিসমিল্লাহি আরক্বীক্বা, মিন কুল্লি শাইয়িন ইউ'যিক্বা, ওয়া মিন শাররি কুল্লি নাফসিন আউ ইয়াইন হাসিদিন, আল্লাহু ইয়াশফিক্বা, বিসমিল্লাহি আরক্বীক্বা।"
(সুনান ইবনে মাজাহ, ৩৫২৩)
ঘ. তাবিজ নষ্ট করা:
যে তাবিজে কুফরি বা শিরকি বস্তু (সুই, বরশি, সিঁদুর, ইত্যাদি) আছে, তা পুড়িয়ে ফেলা বা পচা পানিতে ফেলে দেওয়া আবশ্যক। তাবিজের ভেতর কুরআনের আয়াত থাকলেও তা অপবিত্র অবস্থায় রাখা জায়েজ নয়।
(ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪৫৫; রদ্দুল মুহতার, ৬/৪১৩)
ঙ. ইস্তিগফার ও দরুদ পড়া:
দিনে ১০০ বার "আস্তাগফিরুল্লাহ" এবং ১০০ বার "দরুদ শরিফ" পড়া জাদুর প্রভাব দূর করতে সহায়ক।
২. রুকিয়াহ পদ্ধতিতে চিকিৎসা:
রুকিয়াহ বলতে বোঝায় কুরআন-সুন্নাহর দোয়া ও আয়াত দ্বারা চিকিৎসা। নিচের নিয়মে রুকিয়াহ করুন:
ক. নিজে রুকিয়াহ করার পদ্ধতি:
- পবিত্র অবস্থায় কিবলামুখী হয়ে বসুন।
- সুরা ফাতিহা (১ বার), আয়াতুল কুরসি (১ বার), সুরা ইখলাস, ফালাক, নাস (প্রত্যেকটি ৩ বার) পড়ুন এবং নিজের হাতে ফুঁক দিয়ে সারা শরীরে মাসহ করুন।
- জাদুর প্রভাব সন্দেহ হলে সুরা বাকারার ১০২-১০৩ আয়াত ও সুরা ইউনুসের ৮১-৮২ আয়াত পড়ে পানিতে ফুঁক দিয়ে পান করান।
খ. পানি ও জিনিসপত্র দ্বারা রুকিয়াহ:
- একটি পাত্রে জমজম পানি বা সাধারণ বৃষ্টির পানি নিন।
- সুরা ফাতিহা (১১ বার), আয়াতুল কুরসি (৭ বার), সুরা ইখলাস, ফালাক, নাস (প্রত্যেকটি ১১ বার) পড়ে পানিতে ফুঁক দিন।
- এই পানি ৭ দিন পর্যন্ত পান করান ও গোসল করান।
(ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/৩৪৫; বাহিশতি জেওর, ২/৪৫)
গ. বিশেষ সতর্কতা:
- কবিরাজ, জ্যোতিষী, বা তান্ত্রিকের কাছে যাওয়া হারাম। তাদের কাজ শিরক ও কুফরির অন্তর্ভুক্ত।
(সহিহ বুখারি, ৫৭৬৩; মুসলিম, ২২২৮) - মাসনুন (সুন্নাহ সম্মত) তাবিজ শুধু কুরআনের আয়াত বা দোয়া দ্বারা তৈরি করা জায়েজ, কিন্তু শিরকি বস্তু (সিঁদুর, সুই, ইত্যাদি) থাকলে তা নিষিদ্ধ।
(ফাতাওয়া আলমগিরি, ৫/৪১৩)
অতিরিক্ত পরামর্শ:
- ডাক্তারি চিকিৎসা চালিয়ে যান - কারণ ইসলামে চিকিৎসা করানো ফরজের সমান।
- ধৈর্য ও তাওয়াক্কুল - জাদুর প্রভাব দূর হতে সময় লাগতে পারে। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন।
- পরিবারের সাহায্য নিন - আপুকে একা না রেখে তাঁর পাশে থাকুন, মানসিক শক্তি বাড়ান।
মহান আল্লাহ আপনার আপুকে জাদুর কষ্ট থেকে মুক্তি দিন এবং তাকে সুস্থতা দান করুন। (আমিন)
উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ:
- তাফসির মাআরিফুল কুরআন (সুরা বাকারার ১০২ আয়াতের ব্যাখ্যা)
- ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪৫০-৪৬০
- রদ্দুল মুহতার, ৬/৪১২-৪১৫
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/৩৪০-৩৫০
- বাহিশতি জেওর (আশরাফ আলী থানভি রহ.), দ্বিতীয় খণ্ড