জ্বীনের আছর ও নামাজে ওয়াসওয়াসা থেকে মুক্তির উপায়।

Faith and Belief · Hanbali

Question No: 2765
Questioner: Sadia Arfin
Question Asked: 16 Jul 2026, 07:53 AM
Reviewed & Published: 16 Jul 2026, 07:57 AM
Views: 46
Tokens: 4,419
This answer is according to the 'Hanbali' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম। কিছু বছর আগে একটা খারাপ জ্বীন আমাকে আছর করেছে। সে আমার নামাজে আসে। সারাদিন খুব জুলুম করে।

আমাকে কিছু নাসীহাহ দিন।

Answer

উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রশ্নের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আপনার সমস্যা শুনে আমি খুবই দুঃখিত। জ্বীনের আছর বা ওয়াসওয়াসা একটি বাস্তব পরীক্ষা, তবে আল্লাহর রহমত ও সাহায্যে এ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। নিচে কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে কিছু নাসীহাহ (উপদেশ) দেওয়া হলো, যা হানবালী ফিকহ ও ইমাম ইবনে তাইমিয়া, ইবনুল কাইয়্যেম, শাইখ ইবনে বায, শাইখ আলবানী, শাইখ উসাইমীন ও শাইখ সালেহ আল-ফাওযানের মতামতের ওপর ভিত্তি করে তৈরি।


১. ওয়াসওয়াসা কী এবং কেন হয়?

ওয়াসওয়াসা হলো শয়তান বা খারাপ জ্বীনের পক্ষ থেকে মনের মধ্যে খারাপ চিন্তা, সন্দেহ ও ভীতি সৃষ্টি করা। এটি ইবাদত, বিশেষ করে নামাজে বেশি আসে। শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন:
"ওয়াসওয়াসার চিকিৎসা হলো সেটাকে গুরুত্ব না দেওয়া এবং উপেক্ষা করা। শয়তান যখন দেখে যে তুমি ওয়াসওয়াসার দিকে মনোযোগ দিচ্ছ না, তখন সে দুর্বল হয়ে যায় এবং চলে যায়।"
(মাজমু‘ ফাতাওয়া, ২২/৬০৮)


২. নামাজে ওয়াসওয়াসা এলে করণীয়

  • শয়তান থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করুন:
    নামাজে যখন খারাপ চিন্তা বা ওয়াসওয়াসা আসে, তখন সহীহ হাদীস অনুযায়ী বলুন:
    "أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ"
    (উচ্চারণ: আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম)
    এরপর আপনার বাম দিকে তিনবার থুতু ফেলার মতো করুন (আসল থুতু নয়, শুধু মুখে হালকা ফু দিলেই হবে)।
    (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২২০৩)

  • সালাতের মধ্যে শান্তি ও ধীরস্থিরতা বজায় রাখুন:
    শাইখ ইবনে উসাইমীন (রহ.) বলেন: "ওয়াসওয়াসা এলে আপনি নামাজের মধ্যে স্থির থাকুন, দ্রুত শেষ করার চেষ্টা করবেন না। বরং প্রতিটি রুকন (রুকু, সিজদা ইত্যাদি) পূর্ণ করুন। শয়তান তাড়াহুড়ো করতে উৎসাহ দেয়।"
    (শরহুল মুমতি‘, ৩/৪৫)


৩. দৈনন্দিন জিকির ও রুকইয়া (প্রতিরোধ ও প্রতিকার)

নিম্নলিখিত আমলগুলো নিয়মিত করুন, বিশেষ করে ফজর ও মাগরিবের সময়:

  • আয়াতুল কুরসি (সূরা বাকারা, ২:২৫৫):
    প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর এবং ঘুমানোর আগে পড়ুন।
    রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: "যে ব্যক্তি রাতে আয়াতুল কুরসি পড়ে, তার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন রক্ষক থাকে এবং শয়তান সকাল পর্যন্ত তার কাছে আসতে পারে না।"
    (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৫০১০)

  • সূরা আল-ফাতিহা, সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস:
    সকাল-সন্ধ্যায় তিনবার করে পড়ে দেহে ফুঁক দিন (দু‘আ কবুলের নিয়তে হাতে ফুঁ দিয়ে শরীরের যেখানে পারেন মালিশ করুন)।
    রাসূল (ﷺ) অসুস্থ হলে এই সূরা পড়ে ফুঁক দিতেন।
    (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৫৪১৬)

  • শেষ দুই আয়াত সূরা বাকারা (২৮৫-২৮৬):
    রাতে পড়লে রক্ষাকবচ হয়।
    রাসূল (ﷺ) বলেছেন: "যে ব্যক্তি রাতে সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত পড়ে, তা তার জন্য যথেষ্ট।"
    (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৫০০৯)

  • সকাল-সন্ধ্যার জিকির:
    যেমন:
    "بِسْمِ اللَّهِ الَّذِي لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ" (সকাল-সন্ধ্যা তিনবার)
    আরো জিকিরের জন্য ইসলামকিউএ বা শাইখ আলবানীর কিতাব দেখুন।


৪. জ্বীনের আছর থেকে মুক্তির বিশেষ ব্যবস্থা

  • রুকইয়া করুন:
    নিজে কুরআন পড়ে নিজের ওপর ফুঁক দিন। বিশেষ করে সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস। প্রয়োজনে একজন বিশ্বস্ত ও আলেম রাকী (যিনি শুধু কুরআন-সুন্নাহ ব্যবহার করেন) এর শরণাপন্ন হোন।
    শাইখ সালেহ আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন: "রুকইয়ার জন্য শুধু কুরআন ও সহীহ হাদীসের দু‘আ ব্যবহার করতে হবে। তাবিজ-কবজ, জ্যোতিষী বা গণকদের কাছে যাওয়া হারাম এবং শিরক।"
    (আল-মুনতাকা মিন ফাতাওয়া, ১/২৬৫)

  • গুনাহ থেকে বেঁচে থাকুন:
    জ্বীনের আছর অনেক সময় গুনাহের কারণে শক্তিশালী হয়। তাই তওবা করুন, নামাজের ব্যাপারে সতর্ক হোন এবং পাঁচ ওয়াক্ত জামাআতে আদায়ের চেষ্টা করুন।

  • সুরক্ষার দু‘আ:
    রাসূল (ﷺ) বলেছেন:
    "إذا كان جنح الليل - أو أمسيتم - فكفوا صبيانكم، فإن الشياطين تنتشر حينئذ..."
    (সন্ধ্যার সময় বাচ্চাদের ঘরে রাখুন, শয়তান তখন বিচরণ করে)
    (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৫৬২৪)
    তাই রাতে ঘরের দরজা বন্ধ করে বিসমিল্লাহ পড়ুন, বাসনপাত্র ঢেকে রাখুন।


৫. ওয়াসওয়াসার প্রতি উদাসীন থাকুন

ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম (রহ.) বলেন:
"ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচার সর্বোত্তম উপায় হলো সেটাকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা, মন থেকে বের করে দেওয়া এবং আল্লাহর কাছে আশ্রয় নেওয়া। শয়তান তখনই জয়ী হয় যখন আপনি তার ফিসফিসানির দিকে মনোযোগ দেন।"
(মাদারিজুস সালিকীন, ২/৫০৮)


৬. ধৈর্য ধারণ করুন

এটি একটি পরীক্ষা। রাসূল (ﷺ) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি ধৈর্য ধারণ করে, আল্লাহ তাকে ধৈর্য দান করেন। আর কেউ ধৈর্যের চেয়ে উত্তম ও প্রশস্ত কিছু পায়নি।"
(সহীহ বুখারী, হাদীস: ১৪৬৯)

আল্লাহ বলেন:
"إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ"
(নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে।)
(সূরা বাকারা, ২:১৫৩)


সংক্ষিপ্ত পরামর্শ

  • প্রতিদিন ফরজ নামাজের পর আয়াতুল কুরসি পড়ুন।
  • সকাল-সন্ধ্যা সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস তিনবার করে পড়ে ফুঁক দিন।
  • সূরা বাকারা পুরোটা পড়ার চেষ্টা করুন (বিশেষ করে শেষ দুই আয়াত)।
  • নামাজে ওয়াসওয়াসা এলে أعوذ بالله বলুন এবং উপেক্ষা করুন।
  • হারাম কাজ থেকে দূরে থাকুন এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাআতে পড়ুন।
  • রুকইয়াকারী (যিনি কুরআন-সুন্নাহ মেনে চলেন) এর মাধ্যমে চিকিৎসা নিন।

আল্লাহ আপনার থেকে জ্বীনের অনিষ্ট দূর করুন, আপনার নামাজকে প্রশান্তিময় করুন এবং আপনাকে শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে হেফাজত করুন। আত্মবিশ্বাস রাখুন, আল্লাহর ওপর ভরসা করুন—তিনিই সর্বোত্তম রক্ষক।

(ইসলামকিউএ তথা শাইখ ইবনে বায, শাইখ আলবানী ও শাইখ সালেহ আল-ফাওযানের ফতোয়া অনুসারে)


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.