মুসলিমদের গুনাহের জন্য মালাউন বলে ডাকা
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ حَاتِمٍ الْمُكْتِبُ، حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ ثَابِتٍ، حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ ثَابِتِ بْنِ ثَوْبَانَ، قَالَ سَمِعْتُ عَطَاءَ بْنَ قُرَّةَ، قَالَ سَمِعْتُ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ ضَمْرَةَ، قَالَ سَمِعْتُ أَبَا هُرَيْرَةَ، يَقُولُ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ " أَلاَ إِنَّ الدُّنْيَا مَلْعُونَةٌ مَلْعُونٌ مَا فِيهَا إِلاَّ ذِكْرَ اللَّهِ وَمَا وَالاَهُ وَعَالِمًا أَوْ مُتَعَلِّمًا " . قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ غَرِيبٌ
অনেকে যত্র তত্র খারেজিদের মতো মুসলিমদের ভুলছুখের জন্য মালাউন বলে বেড়ান, এবং এই হাদিসকে দলিল হিসেবে দেখান যে দুনিয়ার সবকিছুই তো মালাউন।
এই হাদিসটায় "মালাউন" শব্দটা ব্যাবহার করা হয়েছে।
আমার প্রশ্ন হলো এখানে অভিসম্পাতটা কি কোনো মানবসত্তাকে ইঙ্গিত করে করা হয়েছে?
নাকি দুনিয়া, ও এর মধ্যকার ভোগবিলাশ ও মোহের বস্তুসমূহকে অভিসম্পাত করা হয়েছে? কেননা এগুলো আল্লাহর যিকির থেকে আমাদের সরিয়ে নেয়?
আল্লাহ্ আপনাদের মেহনতকে কবুল করুন
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নটির জন্য ধন্যবাদ। আপনি হাদীস শরীফের বক্তব্য ও তার সঠিক প্রয়োগ নিয়ে জানতে চেয়েছেন। নিচে ইসলামী শিক্ষা ও হানাফী ফিকহের আলোকে বিস্তারিত উত্তর প্রদান করা হলো।
১. হাদীসটির সনদ ও অর্থ
আপনি উল্লেখিত হাদীসটি (সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৩২২) ইমাম তিরমিযী "হাসান গারীব" বলেছেন। হাদীসটির অর্থ হলো—
"জেনে রাখো, দুনিয়া অভিশপ্ত এবং দুনিয়ার মধ্যে যা কিছু আছে তাও অভিশপ্ত; তবে আল্লাহর যিকির, যিকিরের সাথে সম্পর্কিত বিষয় এবং আলিম বা শিক্ষার্থী (এই অভিশাপ থেকে মুক্ত)।"
এখানে 'মালঊন' (অভিশপ্ত) শব্দটি দ্বারা দুনিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে, কোনো নির্দিষ্ট মানুষকে নয়।
২. 'মালঊন' শব্দের প্রয়োগের সঠিক স্থান
হাদীসে 'মালঊন' বলতে বোঝানো হয়েছে দুনিয়ার সেই দিক যা মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল করে, যেমন—
- দুনিয়ার মোহ, ভোগবিলাস, অহংকার, ধন-সম্পদের প্রতি আসক্তি।
- হারাম উপার্জন ও অপচয়।
- আখিরাতকে ভুলিয়ে দেওয়া পার্থিব চাকচিক্য।
কিন্তু দুনিয়ার হালাল বস্তু, বৈধ ব্যবসা, পরিবার-পরিজন, খাদ্য-বস্ত্র ইত্যাদি 'মালঊন' নয়; বরং এগুলো আল্লাহর নেয়ামত।
(রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৮৪; ফাতাওয়া উসমানী, ১/৩২১)
৩. কোনো মুসলিমকে 'মালঊন' বলা জায়েজ নয়
ইসলামে স্পষ্ট নির্দেশ—
- মুসলিমকে গালি দেওয়া বা লানত করা হারাম। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"মুসলিমকে লানত করা তাকে হত্যা করার মতো।" (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬১০৫) - গুনাহগার মুসলিমের জন্যও লানত করা বৈধ নয়; বরং তার জন্য দোয়া করা উচিত, যেমন— 'আল্লাহ তাকে হেদায়েত দিন' বা 'তওবার তাওফীক দিন'।
(ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৫৮; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৫০)
৪. খারেজীদের ভুল আকীদা
খারেজীরা বড় গুনাহকারীকে 'কাফির' বা 'মালঊন' বলত। তাদের এই মতবাদ সর্বসম্মতভাবে ভুল ও বিদ‘আত। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের আকীদা হলো—
- গুনাহগার মুসলিম মালঊন নয়; বরং ফাসিক।
- তার জন্য শাস্তির ভয় আছে, তবে শেষ পর্যন্ত জান্নাত পাবে যদি ঈমান নিয়ে মৃত্যুবরণ করে।
(শরহু মাআনিল আসার, ১/৪২; আল-হিদায়া, ২/১৬৭)
৫. 'মালঊন' বলার উদ্দেশ্য কী?
হাদীসের 'মালঊন' দ্বারা উদ্দেশ্য—
- দুনিয়ার সেইসব বস্তু ও কাজ যা আল্লাহর যিকির ও আনুগত্য থেকে দূরে সরিয়ে নেয়।
- যেমন: হারাম ধন, মিথ্যা, প্রতারণা, অহংকার, বেহুদা সময় নষ্ট করা ইত্যাদি।
এখানে কোনো মানুষকে অভিশাপ দেওয়া হয়নি; বরং দুনিয়ার অমঙ্গলকর দিকগুলোকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
৬. করণীয়
- কাউকে 'মালঊন' বলে ডাকা থেকে বিরত থাকতে হবে।
- গুনাহগার মুসলিমদের জন্য দোয়া ও নাসীহাত করা কর্তব্য।
- হাদীসের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করা থেকে সাবধান।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন।
(آمين)