কুরবানিতে যাকাতের টাকা ব্যবহার করা যাবে কি?
Qurbani-Slaughtering · Hanafi
Question
আর, নফল কুরবানি কোথাও হলে সেখানে যাকাতের টাকা দেয়া যাবে কিনা
Answer
কুরবানিতে যাকাতের টাকা দেওয়া: বিস্তারিত ফতোয়া
প্রশ্ন:
১. নওমুসলিমদের জন্য কুরবানির গোশত বিতরণের একটি প্রকল্পে যদি আমি নিজের কুরবানি না দিয়ে শুধু যাকাতের টাকা দিতে চাই, তাহলে কি তা জায়েজ হবে?
২. নফল (অতিরিক্ত) কুরবানির জন্যও কি যাকাতের টাকা দেওয়া যাবে?
উত্তর:
হানাফি ফিকহের সুস্পষ্ট নীতিমালা অনুযায়ী, যাকাতের টাকা সরাসরি বা কোনো প্রকল্পের মাধ্যমে কুরবানির জন্য দেওয়া জায়েজ নয়। নিচে যুক্তি ও দলিলসহ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১. যাকাতের মূল উদ্দেশ্য ও শর্ত
যাকাত ফরজ ইবাদত। এটি অবশ্যই কোরআনে বর্ণিত ৮ প্রকার খাতে ব্যয় করতে হবে (সুরা তাওবা: ৬০)। এর মধ্যে প্রধান হলো ফকির-মিসকিনকে মালিকানা করে দেওয়া। অর্থাৎ, যাকাতের টাকা সরাসরি একজন যোগ্য গ্রহীতার হাতে পৌঁছাতে হবে এবং সে নিজ ইচ্ছামতো তা খরচ করতে পারবে।
হানাফি ফিকহের কিতাবসমূহে উল্লেখ আছে:
"যাকাতের টাকা দ্বারা কোনো ইবাদত (যেমন: কুরবানি, আকিকা, মসজিদ নির্মাণ) আদায় করা জায়েজ নয়। কারণ যাকাত হলো সম্পদের হক, আর ইবাদত হলো দেহের হক।"
(রদ্দুল মুহতার, ২/২৬৪; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/১৮৮)
২. কুরবানি প্রকল্পে যাকাত দেওয়া
প্রথম প্রশ্ন: নওমুসলিমদের জন্য গোশত বিতরণের প্রকল্পে যাকাত দেওয়া প্রসঙ্গে—
- উক্ত প্রকল্প যদি এমন হয় যে, সংগৃহীত টাকায় কুরবানির পশু ক্রয় করে পশু জবাই করা হয় এবং গোশত ফকির-মিসকিনদের বিতরণ করা হয়, তাহলে এটা যাকাতের টাকা দ্বারা করা জায়েজ নয়। কারণ, এখানে টাকাটি কুরবানি নামক একটি ইবাদতের মাধ্যম হয়ে যাচ্ছে, যা যাকাতের নিয়ম বহির্ভূত।
- হ্যাঁ, যদি প্রকল্পটি শুধু গোশত ক্রয় করে সরাসরি ফকিরদের মাঝে বিতরণ করে (অর্থাৎ কুরবানি না করে শুধু মাংস কিনে দেয়), তাহলে সেখানে যাকাতের টাকা দেওয়া জায়েজ হবে। তবে শর্ত হলো, টাকাটি সরাসরি তাদের মালিকানায় পৌঁছাতে হবে। প্রকল্পটি এজেন্ট হিসেবে কাজ করলেও গ্রহীতার পক্ষ থেকে দান করার নিয়ত করতে হবে।
ফাতাওয়া উসমানি (২/৪২৮) তে এসেছে:
"যাকাতের টাকা দিয়ে পশু কিনে কুরবানি করা এবং তার গোশত গরিবদের দেওয়া জায়েজ নয়। বরং গরিবদের টাকা নিজ হাতে দিয়ে দিন, তারা নিজেরা কুরবানি করলে পৃথক ব্যাপার।"
৩. নফল কুরবানিতে যাকাত দেওয়া
দ্বিতীয় প্রশ্ন: নফল কুরবানির ক্ষেত্রেও একই হুকুম। যাকাতের টাকা দ্বারা নফল কুরবানি করা জায়েজ নয়। কারণ, নফল কুরবানি একটি ইবাদত, যা নিজের অর্থ থেকে করতে হয়। যাকাতের টাকা দিয়ে ইবাদত আদায় করলে যাকাতের হক আদায় হয় না বরং তা মালিকানা সৃষ্টির বিপরীত।
ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/১৯৮) তে উল্লেখ আছে:
"যাকাতের টাকা দিয়ে কুরবানি করলে যাকাত আদায় হবে না, বরং কুরবানিও সহীহ হবে না যদি কুরবানি ওয়াজিব হয় (মাসআলা: নিজের ওপর কুরবানি ওয়াজিব না থাকলেও নফল কুরবানি হিসেবেও যাকাতের টাকা দেওয়া জায়েজ নয়)।"
৪. ব্যতিক্রম: ফকিরকে মালিকানা করে দেওয়া
যদি কোনো ফকির ব্যক্তি নিজের পক্ষ থেকে কুরবানি করতে চায়, তাহলে তাকে যাকাতের টাকা দিয়ে সাহায্য করা জায়েজ। এক্ষেত্রে টাকাটি তার মালিকানায় দেওয়া হবে, তারপর সে নিজ ইচ্ছায় তা কুরবানিতে ব্যবহার করবে। কিন্তু সরাসরি কোনো সংস্থাকে কুরবানির জন্য টাকা দেওয়া যাকাতের উদ্দেশ্য পূরণ করে না।
ফাতাওয়া হিন্দিয়া (১/১৮৮):
"যাকাতের টাকা যদি কাউকে দিয়ে দেওয়া হয় এবং সে তা দিয়ে কুরবানি করে, তাহলে যাকাত আদায় হবে। কিন্তু নিজে টাকাটি নিয়ে কুরবানি করলে যাকাত আদায় হবে না।"
সারসংক্ষেপ:
- কুরবানি প্রকল্পে যাকাত দেওয়া জায়েজ নয়—যদি প্রকল্পটি কুরবানি হিসেবে পশু জবাই করে।
- নফল কুরবানিতেও যাকাত দেওয়া জায়েজ নয়।
- শুধু গোশত বিতরণের জন্য যাকাত দেওয়া যাবে—যদি তা সরাসরি ফকিরদের মালিকানায় দেওয়া হয়।
উত্তম পদ্ধতি: আপনার যাকাত সরাসরি কোনো ফকির-মিসকিনকে দিন। সে চাইলে তা দিয়ে নিজের বা পরিবারের জন্য কুরবানি করতে পারে। তবে সংস্থার মাধ্যমে কুরবানি করানোর জন্য যাকাত না দিয়ে বরং নফল সাদাকা দিন।
مَثَلُ الَّذِينَ يُنۢفِقُونَ أَمْوَٰلَهُمْ فِى سَبِيلِ ٱللَّهِ كَمَثَلِ حَبَّةٍ أَنۢبَتَتْ سَبْعَ سَنَابِلَ فِى كُلِّ سُنۢبُلَةٍۢ مِّا۟ئَةُ حَبَّةٍۢ ۗ وَٱللَّهُ يُضَـٰعِفُ لِمَن يَشَآءُ ۗ وَٱللَّهُ وَٰسِعٌ عَلِيمٌ
(সুরা বাকারা: ২৬১)
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।