মাঝেমধ্যে অফিস বা অলসতার দরুণ জামাত ত্যাগ করা কি কবিরা গোনাহ হবে?
Salah-Prayer · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
প্রশ্নে উল্লেখিত ব্যক্তি যদি কোনো ওজর ছাড়া (যেমন অলসতা বা অফিসের কাজ) জামাতে শরিক না হয়, তাহলে তা গুনাহ হবে। তবে তিনি যদি জীবনের ৫০-৬০% নামাজ জামাতে পড়েন এবং বাকিগুলো একাকী পড়েন, তাহলে তিনি সম্পূর্ণরূপে জামাত ত্যাগ করছেন না; বরং মাঝে মাঝে জামাত ছাড়ছেন। এটি কবিরা (বড়) গুনাহের পর্যায়ে পড়বে কি না, সে সম্পর্কে হানাফি ফিকহের বিস্তারিত আলোচনা নিচে দেওয়া হলো।
১. জামাতে নামাজের বিধান (হানাফি মতে)
হানাফি মাজহাবের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী, পুরুষদের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ জামাতে আদায় করা ওয়াজিব (অবশ্য কর্তব্য)। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে এটি ওয়াজিব। দলিল:
- হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি আযান শুনেও (ওজর ছাড়া) জামাতে না আসে, তার নামাজ নেই, তবে যে ওজর আছে তার জন্য।" (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৭৯৩; সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস: ২০৬৪)
- সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেছেন, "আমরা জামাত ত্যাগ করাকে মুনাফিকি মনে করতাম। আর নিশ্চয়ই আমরা জানতাম, যে ব্যক্তি জামাতে আসে না, তার শরীরে মুনাফিকির নিদর্শন আছে।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৬৫৪)
হানাফি ফকিহদের কিতাবে এসেছে, "পুরুষের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতে পড়া ওয়াজিব। কোনো ওজর ছাড়া তা ছেড়ে দেওয়া গুনাহ।" (রদ্দুল মুহতার, ১/৫৪৩; ফতোয়ায়ে আলমগিরি, ১/৮৯; বেহেশতি জেওর, ২য় খণ্ড, নামাজ অধ্যায়)
২. জামাত ছাড়া কি কবিরা গুনাহ?
কবিরা গুনাহের সংজ্ঞা হলো, যে গুনাহের জন্য কোরআন-হাদিসে বিশেষ শাস্তি বা লানতের কথা বলা হয়েছে বা যা ইসলামের মৌলিক বিধানের পরিপন্থী। জামাত ত্যাগের ব্যাপারে হাদিসে কঠিন হুঁশিয়ারি এসেছে। যেমন:
- রাসূল (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি আযান শুনলো, অথচ ওজর ছাড়া জামাতে এলো না, তার নামাজ কবুল হবে না।" (সুনানে দারা কুতনি, হাদিস: ১/৪২০)
- আরেক হাদিসে এসেছে, "আমার মনে ইচ্ছা হয়, লোকদের জামাতে আসতে আদেশ করি, তারপর যারা জামাতে আসে না, তাদের ঘর জ্বালিয়ে দিই।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৪)
এ কারণে অধিকাংশ হানাফি আলিমের মতে, ওজর ছাড়া জামাত ছেড়ে দেওয়া গুনাহে কবিরা (বড় গুনাহ)-এর অন্তর্ভুক্ত। তবে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর নিকট কুফর নয়, বরং ফিসক (গুনাহগারি)। (রদ্দুল মুহতার, ১/৫৪৩; ফতোয়ায়ে উসমানি, ২/২১৫)
৩. ৫০-৬০% জামাত পড়লে কী হবে?
এক্ষেত্রে ব্যক্তি মোটামুটি জামাতে অভ্যস্ত, কিন্তু অলসতা বা অফিসের কাজের কারণে মাঝে মাঝে জামাত ছাড়ছে। এটি পরিপূর্ণ জামাত ত্যাগ নয়, তবে প্রতিটি ওয়াক্তের জন্য পৃথকভাবে বিচার হবে।
- যে নামাজগুলো জামাতে পড়েনি, সেগুলোর জন্য প্রত্যেকটি ওয়াক্তের গুনাহ হবে যদি কোনো শারি’য়ি ওজর না থাকে।
- তবে তিনি যেহেতু জামাতের প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন নন, তাই তাকে ধারাবাহিকভাবে জামাত ত্যাগকারী (তর্কে জামাত) হিসেবে গণ্য করা হবে না। তবুও তার ওপর জামাতের ওয়াজিব আদায় করেনি বলে গুনাহ হবে, যা কবিরা গুনাহের মতো গুরুতর না হলেও ছোট গুনাহ নয়।
বিখ্যাত হানাফি ফকিহ ইবনে আবেদিন (রহ.) বলেন, "জামাত ত্যাগকারী ব্যক্তি ফাসিক (গুনাহগার) হবে, তবে মুমিন থাকবে।" (রদ্দুল মুহতার, ১/৫৪৩)
৪. তওবা করার আবশ্যকতা
প্রশ্নে উল্লেখ আছে, কবিরা গুনাহ তওবা ছাড়া মাফ হয় না। সুতরাং এই ব্যক্তির জন্য আবশ্যক হলো:
- অতীতে ওজর ছাড়া জামাত ছেড়ে দেওয়ার জন্য তওবা ও ইস্তিগফার করা।
- ভবিষ্যতে সব নামাজ জামাতে পড়ার চেষ্টা করা।
- অফিসের কাজ যদি বাধা হয়, তাহলে সম্ভব হলে সময় ব্যবস্থাপনা করে জামাতে শরিক হওয়া। যদি কোনোভাবেই সম্ভব না হয়, তাহলে ওই সময়ের নামাজ কাযা করার চেয়ে জামাতের চেষ্টা করাই উত্তম। তবে অলসতার কারণে জামাত ছাড়া সম্পূর্ণ নাজায়েজ।
হাদিসে এসেছে, "যে ব্যক্তি (ওজর ছাড়া) আজানের জবাব দেয় না, সে নামাজে কোনো কল্যাণ পায় না।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৫৫১)
তাই অলসতাকে ওজর হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না। অফিসের কাজ যদি বাস্তবিকই সময়মতো জামাতের বিরোধী হয়, তবে চাকরি পরিবর্তন বা অন্য কোনো বৈধ ব্যবস্থা করা উচিত। কিন্তু অলসতা তো কোনো ওজরই নয়।
৫. হাশরে অবস্থা
যে ব্যক্তি জামাতের ওয়াজিব আদায় করেনি, সে হাশরে জিজ্ঞাসিত হবে। হাদিসে এসেছে, কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম নামাজের হিসাব নেওয়া হবে। সে সময় জামাত ত্যাগকারীর ফরজ নামাজও যদি কোনো ত্রুটি থেকে থাকে, তবে তা পূর্ণ করার জন্য নফল দিয়ে পূরণ করা হবে (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭৫১)। তবে যেহেতু জামাত ফরজ নয়, বরং ওয়াজিব, তাই তার জন্য আলাদাভাবে শাস্তি হতে পারে। তবে কবিরা গুনাহকারী হিসেবে তাকে গণ্য করা হবে না যদি তার নামাজ নিজে সহিহ থাকে এবং সে জামাত ত্যাগের মাধ্যমে ইসলামের কোনো মৌলিক বিষয় অস্বীকার না করে। তবে গুনাহ থেকে বাঁচতে তওবা জরুরি।
৬. গুরুত্বপূর্ণ দিক
- অজুহাত ছাড়া জামাত ত্যাগ করলে নামাজের সওয়াব কমে যায়। হাদিসে জামাতের ফজিলত সম্পর্কে বলা হয়েছে, জামাতে নামাজ একাকী নামাজ থেকে ২৭ গুণ বেশি সওয়াব। (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)
- তাই সুযোগ থাকা সত্ত্বেও জামাত ছেড়ে দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
- যদি কেউ অর্ধেকের বেশি জামাত পড়ে, তবে সে জামাত ত্যাগকারী নয়, বরং জামাতে আগ্রহী; কিন্তু অলসতার কারণে বাদ পড়া নামাজগুলো তার জন্য ক্ষতির কারণ হবে।
ফতোয়া ও রেফারেন্স
- মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) লিখেছেন, "পুরুষের জন্য জামাতে নামাজ পড়া ওয়াজিব। যদি কোনো ওজর ছাড়া ছেড়ে দেয়, তবে গুনাহগার হবে। কিন্তু তা কুফর নয়।" (মাআরিফুল কোরআন, ২য় খণ্ড, সুরা বাকারা, আয়াত ৪৩-এর তাফসির)
- মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন, "জামাত ত্যাগ করা কবিরা গুনাহ। তবে যদি কেউ মাঝেমধ্যে ওজরে ছেড়ে দেয়, তাহলে ততটুকু গুনাহ হবে; কিন্তু তাকে স্থায়ী জামাত ত্যাগকারী মনে করা যাবে না। তবুও তওবা করা আবশ্যক।" (ফতোয়ায়ে উসমানি, ২/২১৫-২১৬)
উপসংহার
- প্রশ্নোক্ত ব্যক্তি যদি অলসতা বা অফিসের কারণে জামাত ছেড়ে দেন, তাহলে তিনি গুনাহগার হবেন।
- তবে যেহেতু তিনি ৫০-৬০% নামাজ জামাতে পড়েন, তাই তাকে স্থায়ী জামাত ত্যাগকারী (তরকে জামাত) হিসেবে গণ্য করা ঠিক হবে না। বরং প্রতিটি বাদ-পড়া নামাজের জন্য পৃথক গুনাহ হবে।
- এটি কবিরা গুনাহ-এর অন্তর্ভুক্ত কি না—এ ব্যাপারে মতভেদ আছে। অধিকাংশ হানাফি আলিমের মতে, ওজর ছাড়া জামাত ত্যাগ করা কবিরা গুনাহ। তবে ব্যক্তি যদি জামাতের ওয়াজিবিত্ব অস্বীকার না করে শুধু অলসতা করে, তবে তাকে ফাসিক (গুনাহগার) বলা হবে; কিন্তু কাফির বা সম্পূর্ণ কবিরা গুনাহকারীর পর্যায়ে ফেলা যাবে না।
- তওবা করা অপরিহার্য। কারণ বিনা তওবায় কবিরা গুনাহ মাফ হয় না। অতএব, তাকে উচিত:
১. আল্লাহর কাছে তওবা করা এবং ভবিষ্যতে অলসতা না করে জামাতে অংশ নেওয়ার সংকল্প করা।
২. অফিসের কাজের জন্য যদি জামাত নষ্ট হয়, তবে সময়সূচি সামঞ্জস্য করা বা যেখানে জামাতের সুযোগ আছে সেখানে কাজ করা।
আল্লাহ তাওফিক দান করুন।
সূত্র:
- রদ্দুল মুহতার (১/৫৪৩-৫৪৪)
- ফতোয়ায়ে আলমগিরি (১/৮৯)
- বেহেশতি জেওর (নামাজ অধ্যায়)
- ফতোয়ায়ে উসমানি (২/২১৫-২১৬)
- ইমদাদুল ফতোয়া (১/৩২১)
- শারহু মাআনি’ল আসার (১/২৬৪)