প্রাণীর ছবি ঘরে রাখা
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على سيد المرسلين
প্রশ্নে উল্লেখিত ডায়াপারের প্যাকেট, বাচ্চাদের বই ইত্যাদিতে বিদ্যমান প্রাণী ও মানুষের ছবি সম্পর্কে ইসলামী শরীয়তের বিধান হলো, প্রাণীর ছবি বা ছবিযুক্ত জিনিস ঘরে রাখা মাকরুহে তাহরীমি বা নাজায়েজ। কারণ, হাদীস শরীফে এসেছে, ফেরেশতারা সেই ঘরে প্রবেশ করেন না যেখানে প্রাণীর ছবি বা মূর্তি থাকে।
হাদীসে বর্ণিত হয়েছে:
"لَا تَدْخُلُ الْمَلَائِكَةُ بَيْتًا فِيهِ تَصَاوِيرُ"
অর্থ: "ফেরেশতারা সেই ঘরে প্রবেশ করেন না যেখানে ছবি থাকে।" (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৫৯৫৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২১০৬)
এ হাদীসের ভিত্তিতে হানাফী ফকীহগণ বলেছেন, দেয়ালে ঝুলানো, ঘরে রাখা বা ব্যবহারের উদ্দেশ্যে ছবি সংরক্ষণ করা নিষিদ্ধ। তবে যদি ছবিটি এমন জিনিসের উপর হয় যা অসম্মানজনক বা ব্যবহারের পর নষ্ট হয়ে যায় (যেমন: প্যাকেট, মোড়ক ইত্যাদি), তাহলে তা ঘরে রাখা মাকরুহ হলেও জোরালোভাবে নিষেধ নয়। কিন্তু যতটুকু সম্ভব ছবি মুছে ফেলা বা কেটে ফেলা উচিত।
উল্লেখিত বিষয়গুলোর বিস্তারিত হুকুম:
১. ডায়াপারের প্যাকেটে বাচ্চার ছবি:
এগুলো সাধারণত ব্যবহারের পর ফেলে দেওয়া হয়। তাই যদি ছবিটি প্যাকেটে মুদ্রিত থাকে এবং সেটি ব্যবহারের পর ফেলে দেওয়া হয়, তবে তাতে খুব বেশি সমস্যা নেই। তবে উত্তম হলো, বাড়িতে আনার পর ছবির চোখ বা মুখের অংশ কেটে দেওয়া বা ঢেকে রাখা।
২. বাচ্চাদের বইয়ে প্রাণী ও মানুষের ছবি:
শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার কারণে বইয়ে ছবি রাখা জায়েজ, বিশেষ করে ছোট বাচ্চাদের শেখানোর জন্য। কিন্তু শর্ত হলো, ছবিগুলো যেন পূর্ণাঙ্গ ও স্পষ্ট না হয়; বরং অসম্পূর্ণ বা ছোট আকারের হয়। যদি ছবিগুলো পূর্ণাঙ্গ হয়, তাহলে সেগুলো ঘরে রাখাও মাকরুহ হবে। তবে শিক্ষার প্রয়োজনে ব্যবহার করা যাবে, কিন্তু ব্যবহার শেষে বই আলমারিতে বা অন্যত্র এমনভাবে রাখা উচিত যাতে চোখে না পড়ে এবং সম্মানের স্থানে থাকে।
৩. ফেরেশতা আগমন সম্পর্কে:
যেসব ঘরে প্রাণীর পূর্ণাঙ্গ ছবি থাকে (যার মাথা ও শরীর স্পষ্ট), ফেরেশতারা সেখানে প্রবেশ করেন না। তবে যদি ছবিগুলো অসম্পূর্ণ হয় (যেমন মাথা ছাড়া শরীর বা শুধু মাথা), তাহলে সেটি শাস্ত্রীয় নিষেধের আওতায় পড়ে না।
করণীয় কী?
উত্তম পন্থা:
- বাচ্চাদের বই ও প্যাকেট থেকে ছবির চোখ বা মুখের অংশ মুছে ফেলা বা কেটে দেওয়া।
- পূর্ণাঙ্গ ছবি থাকলে তা ঘর থেকে সরিয়ে ফেলা বা ঢেকে রাখা।
- ছবিগুলোকে অসম্মানজনক স্থানে না রাখা (যেমন মেঝেতে, টয়লেটের কাছে)।
ঢেকে রাখা কি যথেষ্ট?
হ্যাঁ, যদি ছবিটি কাপড় বা অন্য কিছু দিয়ে পুরোপুরি ঢেকে দেওয়া হয়, তবে সেটি আর ছবির হুকুমের অন্তর্ভুক্ত থাকবে না। কিন্তু যদি এমনভাবে ঢাকা হয় যে চাইলে উন্মুক্ত করা সম্ভব, তাহলে তা যথেষ্ট নয়। বরং স্থায়ীভাবে ছবিটি অপসারণ বা বিকৃত করাই উত্তম।
ফাতাওয়া ও রেফারেন্স:
-
রদ্দুল মুহতার (৬/৩৭২-৩৭৪):
"প্রাণীর ছবি ঘরে রাখা নাজায়েজ, তবে ছবি যদি অসম্পূর্ণ হয় (যেমন মাথা বিহীন) তাহলে জায়েজ।" -
ফাতাওয়া উসমানী (২/৪৫৩):
"বাচ্চাদের খেলনা ও বইয়ের ছবি যদি শিক্ষার উদ্দেশ্যে হয় তবে তা জায়েজ, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ ছবি না রাখাই ভালো।" -
ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/২৯৩):
"প্রাণীর ছবি দেওয়ালে টাঙানো বা ঘরে রাখা হারাম, তবে পায়ের নিচে পড়ে এমন জিনিসে (যেমন মাদুর, গালিচা) ছবি থাকলে তা জায়েজ।"
সারসংক্ষেপ:
| বস্তু | হুকুম | করণীয় | |-------|-------|--------| | ডায়াপারের প্যাকেটে ছবি | মাকরুহ, তবে ব্যবহারের পর ফেলে দিলে সমস্যা নেই | ছবি কেটে ফেলা বা ঢেকে রাখা | | বাচ্চাদের বইয়ের ছবি | শিক্ষার প্রয়োজনীয়তায় জায়েজ, তবে পূর্ণাঙ্গ ছবি মাকরুহ | ব্যবহার শেষে বই সম্মানজনক স্থানে রাখা | | ফেরেশতা আগমন | পূর্ণাঙ্গ ছবি থাকলে ঘরে আসেন না | ছবি অপসারণ বা বিকৃত করা |
অতএব, প্রশ্নোক্ত ছবিগুলো যদি পূর্ণাঙ্গ এবং স্পষ্ট হয়, তাহলে তা ঘরে রাখা উচিত নয়। বরং ছবিগুলো কেটে ফেলা বা ঢেকে রাখা জরুরি। আর যদি সেগুলো শিক্ষার কাজে লাগে, তবে সীমিত পরিসরে ব্যবহার করা যাবে, কিন্তু একান্ত প্রয়োজন শেষে ছবি অপসারণ করা উত্তম।
والله أعلم بالصواب