রাফউল ইয়াদাইন (রুকুতে ও ওঠার সময় হাত তোলা) করার হুকুম কি?
Salah-Prayer · Hanafi
Question
শ্রদ্ধেয় মুহতারাম, আল্লাহ তাআলা দ্বীনের খাতিরে আপনাদের সুস্থ রাখুন এবং ইলমে বরকত দান করুন।
আমি একজন সাধারণ মুসলিম এবং ফিকহি মাসআলা-মাসায়েলের ক্ষেত্রে হানাফি মাজহাব অনুসরণ করার চেষ্টা করি। ইদানীং সুন্নাহর প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকে একটি বিষয়ে শরয়ী সমাধান জানার খুব আগ্রহ জেগেছে। আমি যদি হানাফি মাজহাব মেনে সালাত আদায়ের পাশাপাশি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিসের অনুসরণে সালাতে ‘রাফউল ইয়াদাইন’ (রুকুতে যাওয়া ও ওঠার সময় হাত তোলা) করি, তবে কি আমার সালাত নিয়মসম্মত হবে? আর হানাফি ফিকহের আলোকে যদি এটি করার অবকাশ না থাকে, তবে একজন সাধারণ তালিবুল ইলম হিসেবে সেটার পেছনে মূল উসূল বা দলিলগুলো জানতে পারলে অত্যন্ত উপকৃত হতাম।
আপনার মূল্যবান সময় ও দিকনির্দেশনার জন্য অগ্রিম জাজাকাল্লাহু খাইরান।"
Answer
উত্তর দেওয়ার সময় উল্লেখিত কিতাব ও ইমামদের মতামত অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
প্রশ্ন:
আমি হানাফি মাজহাব অনুসরণ করি, কিন্তু সালাতে রুকুতে যাওয়ার সময় ও রুকু থেকে উঠার সময় রাফউল ইয়াদাইন (হাত তোলা) করলে কি আমার সালাত শুদ্ধ হবে? আর হানাফি মাজহাবে এর অনুমতি না থাকলে দলিল-প্রমাণ কী?
উত্তর
রাফউল ইয়াদাইনের হুকুম (হানাফি মাজহাব)
হানাফি মাজহাবের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী, শুধুমাত্র প্রথম তাকবির (তাকবিরে তাহরিমা) দেওয়ার সময় হাত তোলা সুন্নাত। রুকুতে যাওয়ার সময়, রুকু থেকে ওঠার সময় এবং অন্যান্য স্থানে হাত তোলা মাকরুহে তানজিহি (অপছন্দনীয়, তবে গুনাহ নয়) বলে গণ্য। এটি সুন্নাতের খিলাফ, কিন্তু সালাতের বৈধতা নষ্ট করে না। (রদ্দুল মুহতার, ১/২৯২; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ১/১৯৫)
হানাফিদের দলিল
হানাফি ফুকাহারা নিম্নোক্ত হাদিস ও আসারের ভিত্তিতে রাফউল ইয়াদাইনকে শুধু প্রথম তাকবিরে সীমিত রাখেন:
-
হাদিসে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.):
তিনি বলেন,"আমি কি তোমাদের সাথে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সালাত আদায় করি? অতঃপর তিনি সালাত আদায় করলেন এবং প্রথমবার ছাড়া আর হাত উঠালেন না।"
(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৭৪৮; তিরমিজি, হাদিস: ২৫৭; ইমাম তিরমিজি একে 'হাসান' বলেছেন) -
আমলের ধারাবাহিকতা:
হযরত উমর (রা.), হযরত আলী (রা.), হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) প্রমুখ সাহাবা থেকে বর্ণিত যে, তাঁরা শুধু প্রথম তাকবিরে হাত তুলতেন। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, ১/২৩৬–২৩৮) -
জাবির ইবনে সামুরা (রা.)-এর হাদিস:
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন,"কেন আমি তোমাদের হাত দেখছি যেন তা বন্য ঘোড়ার লেজের মতো? তোমরা সালাতে ধৈর্য ধারণ করো।"
(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৩০)
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, এ হাদিসটি রুকু-সিজদায় হাত তোলার নিষেধাজ্ঞার দিকে ইঙ্গিত করে। -
নাসখ (রহিতকরণ):
ইমাম তাহাবি (রহ.)-এর মত অনুসারে, রাফউল ইয়াদাইনের প্রাথমিক হাদিসগুলো (যেমন ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত) পরে রহিত হয়ে গেছে। শেষের আমল ছিল সাহাবায়ে কেরামের (ইবনে মাসউদ ও অন্যান্যদের) আমল। (শারহু মাআনিল আসার, ১/২২৬–২২৭)
হানাফি মাজহাব অনুযায়ী রাফউল ইয়াদাইন করলে সালাত কি শুদ্ধ হবে?
হ্যাঁ, সালাত শুদ্ধ হবে। কারণ রুকু ও রুকু থেকে ওঠার সময় হাত তোলা সালাতের ফরজ বা ওয়াজিবের মধ্যে পড়ে না। এটি একটি অতিরিক্ত কাজ যা সালাতের বৈধতা নষ্ট করে না। তবে এটি মাকরুহে তানজিহি হওয়ায় ইচ্ছাকৃতভাবে বারবার করলে সালাত মাকরুহ হবে, তবে পুনরায় পড়া আবশ্যক নয়। (ফাতাওয়া আলমগিরি, ১/১০০; ফাতাওয়া উসমানি, ১/২৫৬)
সাধারণ মুমিনের জন্য নির্দেশনা
- আপনি যদি হানাফি মাজহাবের অনুসারী হয়ে থাকেন, তাহলে উচিত হবে মাজহাবের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী শুধু প্রথম তাকবিরে হাত তোলা। কেননা ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও তার প্রধান শিষ্যরা (ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মদ) এ মত দিয়েছেন এবং তাঁদের দলিল প্রমাণ অত্যন্ত শক্তিশালী।
- যদি সুন্নাহর প্রতি ভালোবাসা থেকে আপনি রাফউল ইয়াদাইন করতে চান, তাহলে জেনে রাখুন যে হানাফি মাজহাবে এটিকে সুন্নাত মনে করা হয় না, বরং একে ইচ্ছাকৃতভাবে করা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। কারণ এতে করে সালাতের পদ্ধতিতে বিভ্রান্তি ও মাজহাবের বাইরে যায়।
- তবে আপনি যদি শুধুমাত্র একান্ত ব্যক্তিগতভাবে এবং নিয়মিত না করে মাঝে মাঝে কোনো হাদিসের উপর আমল করতে চান, তাহলে ওই সালাতটি শুদ্ধ হবে, কিন্তু তা মাজহাবের দৃষ্টিতে উত্তম নয়। তাই উত্তম হলো মাজহাবের আমল অনুসরণ করা।
সংক্ষিপ্ত দলিল (কিতাবের উদ্ধৃতি)
-
রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন):
"وَلَا يَرْفَعُ يَدَيْهِ فِي الرُّكُوعِ وَالرَّفْعِ مِنْهُ، وَيَرْفَعُ فِي الْاِفْتِتَاحِ فَقَطْ، فَإِنْ فَعَلَ كُرِهَ تَنْزِيهًا."
(১/২৯২) -
ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভি):
"রাফউল ইয়াদাইন শুধু তাকবিরে তাহরিমায় সুন্নাত, অন্যত্র মাকরুহ।" (১/১৯৫) -
ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি):
"হানাফি মাজহাবে রুকু ও সিজদায় হাত তোলা মাকরুহে তানজিহি। তবে সালাত ফাসিদ হয় না।" (১/২৫৬)
সতর্কতা
যেহেতু আপনি হানাফি মাজহাব অনুসরণ করেন, তাই আপনার প্রতি রফউল ইয়াদাইন না করারই পরামর্শ থাকবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে দ্বীনের সঠিক জ্ঞান দান করুন এবং সুন্নাহর প্রকৃত অনুসরণ তাওফিক দিন।