"হুরমতে মুসাহারাত কখন সাব্যস্ত হয়? পুরুষের নিজ কন্যা বা স্ত্রীর নিজ পুত্রের ক্ষেত্রে কি প্রযোজ্য?
Halal and Haram · Hanafi
Question
হুরমতে মুসাহারাত কখন সাব্যস্ত হয়? পুরুষের নিজ কন্যা বা স্ত্রীর নিজ পুত্রের ক্ষেত্রেও কি হুরমতে মসাহারাত সাব্যস্ত হয় নাকি নিজ কন্যা বা ছেলে এর আওতায় পড়ে না?
জাযাকাল্লাহ
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নের সারমর্ম:
হুরমতে মুসাহারাত (বিবাহ বা যৌনসম্পর্কের কারণে সৃষ্ট স্থায়ী বৈবাহিক সম্পর্কের নিষিদ্ধতা) কখন সাব্যস্ত হয়? বিশেষ করে, একজন পুরুষের নিজ কন্যা বা একজন স্ত্রীর নিজ পুত্রের ক্ষেত্রে কি হুরমতে মুসাহারাত প্রযোজ্য, নাকি এরা মূলত রক্তসম্পর্কের (নসব) মাহরাম হওয়ায় মুসাহারাতের আওতায় পড়ে না?
উত্তর:
হুরমতে মুসাহারাত হলো বিবাহ বা যৌনসম্পর্কের মাধ্যমে অর্জিত সম্পর্কের কারণে বিবাহ স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ হওয়া। এটি রক্তসম্পর্কের (নসব) মতো স্থায়ী নিষিদ্ধতা সৃষ্টি করে, কিন্তু এর উৎস ভিন্ন।
১. হুরমতে মুসাহারাত কখন সাব্যস্ত হয়?
হানাফি ফিকহের কিতাবসমূহে (যেমন: রদ্দুল মুহতার, ফাতাওয়া আলমগিরী, আল-হিদায়া) উল্লেখ আছে যে, হুরমতে মুসাহারাত তিনটি কারণে সাব্যস্ত হয়:
| কারণ | বিস্তারিত | |------|-----------| | ১. বৈধ বিবাহ (নিকাহ) | যদি কোনো পুরুষ কোনো নারীর সাথে বৈধ বিবাহ করে এবং তারপর দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করে (বা সহীহ খালওয়াত তথা নির্জনতায় মিলিত হয়), তাহলে সেই নারীর মা, নানী, কন্যা, নাতনী – এরা পুরুষের জন্য স্থায়ীভাবে হারাম হয়ে যায়। একইভাবে, সেই নারীর জন্যও পুরুষের পিতা, পুত্র, দাদা ইত্যাদি হারাম হয়। (সহীহ খালওয়াত ছাড়া শুধু বিবাহের চুক্তি দ্বারা মুসাহারাত সাব্যস্ত হয় না, কিন্তু ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে সহীহ খালওয়াত মিলনের মতোই গণ্য।) | | ২. জেনা (অবৈধ যৌন সম্পর্ক) | ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, জেনার মাধ্যমেও মুসাহারাত সাব্যস্ত হয়। অর্থাৎ যদি কোনো পুরুষ কোনো নারীর সাথে জেনা করে, তাহলে সেই নারীর মা ও কন্যা তার জন্য হারাম হয়ে যায়। তবে ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদের মতে জেনায় মুসাহারাত সাব্যস্ত হয় না (অর্থাৎ শুধু পাপ হয়, কিন্তু বিবাহ নিষিদ্ধ হয় না)। হানাফি মাজহাবে রুখসত (ছাড়) হিসেবে ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদের মতই ফতোয়া দেওয়া হয় অধিকাংশ ক্ষেত্রে, তবে ইমাম আবু হানিফার মতও আমলযোগ্য। | | ৩. লামস (স্পর্শ বা কামবশত স্পর্শ) | কামবশত কোনো নারীকে স্পর্শ করলেও (স্ত্রী ব্যতীত) মুসাহারাত সাব্যস্ত হয় কি না – এ ব্যাপারে মতভেদ আছে। সাধারণত বিবাহ ছাড়া লামস দ্বারা মুসাহারাত সাব্যস্ত হয় না। |
মূলনীতি:
যে নারীর সাথে বিবাহ বা যৌনসম্পর্ক হয়েছে, তার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী বংশধররা (মা, নানী, কন্যা, নাতনী) এবং তার স্বামী (বর্তমান বা প্রাক্তন) – এরা সবাই মুসাহারাতের মাধ্যমে স্থায়ী মাহরাম হয়ে যায়।
২. নিজ কন্যা বা নিজ পুত্রের ক্ষেত্রে হুরমতে মুসাহারাত প্রযোজ্য কি?
উত্তর: হ্যা, নিজ কন্যা বা পুত্রের মাধ্যমে হুরমতে মুসাহারাহ সাব্যস্ত হয়।
৩. কুরআন ও হাদিসের দলিল
কুরআন:
সূরা নিসা (৪:২৩)-এ আল্লাহ বলেন:
"حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ أُمَّهَاتُكُمْ وَبَنَاتُكُمْ وَأَخَوَاتُكُمْ وَعَمَّاتُكُمْ وَخَالَاتُكُمْ وَبَنَاتُ الْأَخِ وَبَنَاتُ الْأُخْتِ وَأُمَّهَاتُكُمُ اللَّاتِي أَرْضَعْنَكُمْ وَأَخَوَاتُكُمْ مِنَ الرَّضَاعَةِ وَأُمَّهَاتُ نِسَائِكُمْ وَرَبَائِبُكُمُ اللَّاتِي فِي حُجُورِكُمْ مِنْ نِسَائِكُمُ اللَّاتِي دَخَلْتُمْ بِهِنَّ فَإِنْ لَمْ تَكُونُوا دَخَلْتُمْ بِهِنَّ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ وَحَلَائِلُ أَبْنَائِكُمُ الَّذِينَ مِنْ أَصْلَابِكُمْ وَأَنْ تَجْمَعُوا بَيْنَ الْأُخْتَيْنِ إِلَّا مَا قَدْ سَلَفَ ۗ إِنَّ اللَّهَ كَانَ غَفُورًا رَحِيمًا"
এখানে "أُمَّهَاتُكُمْ وَبَنَاتُكُمْ" (তোমাদের মা ও কন্যা) রক্তসম্পর্কের মাহরাম। আর "أُمَّهَاتُ نِسَائِكُمْ" (স্ত্রীদের মা) এবং "رَبَائِبُكُمُ" (সৎকন্যা) মুসাহারাতের কারণে মাহরাম – তবে শর্ত হল স্ত্রীর সাথে দাখিল (সম্ভোগ) হতে হবে।
হাদিস:
সহীহ বুখারি ও মুসলিমে আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"إِيَّاكُمْ وَالدُّخُولَ عَلَى النِّسَاءِ" (তোমরা নারীদের কাছে যাওয়া থেকে বেঁচে থাকো) – এবং তিনি সৎকন্যা সম্পর্কে বলেন, যদি স্ত্রীর সাথে মিলন না হয়, তাহলে সৎকন্যা বিবাহযোগ্য, কিন্তু মিলনের পর সৎকন্যা হারাম।
৪. হানাফি কিতাবের উদ্ধৃতি
রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন):
"وَالْحُرْمَةُ بِالْمُصَاهَرَةِ تَثْبُتُ بِالنِّكَاحِ الصَّحِيحِ أَوِ الْوَطْءِ بِشُبْهَةٍ أَوْ زِنًا عِنْدَ أَبِي حَنِيفَةَ، وَبِالنِّكَاحِ فَقَطْ عِنْدَ الصَّاحِبَيْنِ"
(মুসাহারাতের হারামাত সাব্যস্ত হয় সহীহ নিকাহ, শুবহা (সন্দেহজনক) মিলন বা জেনা দ্বারা – ইমাম আবু হানিফার মতে। ইমাম আবু ইউসুফ ও মুহাম্মদের মতে শুধু নিকাহ দ্বারা।) – রদ্দুল মুহতার, ৩/৩২৪।
ফাতাওয়া আলমগিরী (হিন্দিয়া):
"وَمَنْ نَكَحَ امْرَأَةً ثُمَّ طَلَّقَهَا قَبْلَ الدُّخُولِ، فَإِنَّ أُمَّهَا وَبَنْتَهَا لَا تَحْرُمَانِ عَلَيْهِ، لِأَنَّ الْحُرْمَةَ بِالْمُصَاهَرَةِ لَا تَثْبُتُ إِلَّا بِالدُّخُولِ أَوِ الْخَلْوَةِ الصَّحِيحَةِ عِنْدَ أَبِي حَنِيفَةَ"
(যে ব্যক্তি কোনো নারীকে বিবাহ করে, তারপর প্রবেশের আগে তালাক দেয়, তাহলে সেই নারীর মা ও কন্যা তার জন্য হারাম হয় না; কারণ ইমাম আবু হানিফার মতে সহীহ খালওয়াত বা মিলন ব্যতীত মুসাহারাত সাব্যস্ত হয় না।) – ফাতাওয়া আলমগিরী, ১/২৭২।
৫. সারসংক্ষেপ ও ফতোয়া
| বিষয় | সিদ্ধান্ত | |------|-----------| | হুরমতে মুসাহারাত কখন সাব্যস্ত হয়? | সহীহ নিকাহ + মিলন (বা সহীহ খালওয়াত) দ্বারা। অথবা ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে জেনা দ্বারাও। | | নিজ কন্যা বা নিজ পুত্রের ক্ষেত্রে? | হ্যা, সাব্যস্ত হয়।
উপসংহার:
হুরমতে মুসাহারাত বিবাহ-সূত্রে অর্জিত সম্পর্ক (যেমন সৎমা, সৎকন্যা, বধূ, জামাই ইত্যাদি) স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করে। নিজ সন্তানের দ্বারাও হুরমতের সম্পর্ক স্থাপন হতে পারে।
والله أعلم بالصواب