বিবাহের আগে "বিবাহের ফর্দ" নামের ফর্দ পূরণ পূূর্বক সাইন করা কি জায়েয?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 2538
Questioner: Fatema Nur Sawda
Question Asked: 10 Jul 2026, 10:28 PM
Reviewed & Published: 10 Jul 2026, 10:31 PM
Views: 87
Tokens: 4,401
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লহ।
কিছু অঞ্চলে বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার আগে "বিবাহের ফর্দ" নামে একটি ফর্ম পূরণ করার কালচার রয়েছে। যেখানে পাত্র-পাত্রীর নাম, তাদের বাবা-মায়ের নাম, বিয়ের দেনমহরসহ কিছু বিষয় উল্লেখ করা হয় এবং তাতে গার্ডিয়ানরা সাইন করে বিয়ের কথা ফাইনাল করে রাখেন। পরবর্তীতে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী বিয়ে সম্পন্ন হয়। আমার প্রশ্ন হচ্ছে এরকম ফর্দনামা সাইন করা কী জায়েজ আছে? বিষয়টা কীভাবে দেখা উচিত?

Answer

উত্তর

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

আপনার প্রশ্নের সারমর্ম হলো, বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার আগে পাত্র-পাত্রী ও তাদের অভিভাবকরা একটি ফরম/ফর্দনামায় স্বাক্ষর করেন, যাতে বিবাহের শর্তাবলি (মহর, নাম ইত্যাদি) উল্লেখ থাকে এবং পরবর্তীতে নির্ধারিত সময়ে বিয়ে সম্পন্ন হয়—এ কাজটি ইসলামী দৃষ্টিতে জায়েজ কি না?

উত্তর: হ্যাঁ, এভাবে বিবাহের পূর্বে একটি ফরদ পূরণ করে স্বাক্ষর করা জায়েজ। তবে এটি মূল বিবাহ (নিকাহ) নয়; বরং এটি একটি প্রতিশ্রুতি বা বাগ্দান (খৎবা)-এর ন্যায়। ইসলামী শরিয়তে বিবাহের জন্য মৌখিক ইজাব-কবুল (প্রস্তাব ও গ্রহণ) এবং স্বাক্ষীদের উপস্থিতি আবশ্যক। ফরদে স্বাক্ষর করলে বিবাহ সম্পন্ন হয় না; বাস্তবিক নিকাহ অনুষ্ঠিত হওয়া পর্যন্ত তা একটি লিখিত দলিল মাত্র।

কোরআন-হাদিস ও হানাফি ফিকহের আলোকে বিশ্লেষণ

১. বিবাহের মূল ভিত্তি: মহান আল্লাহ বলেন,

“তারপর যদি তোমরা স্ত্রীদেরকে ছেড়ে দেওয়ার সংকল্প কর, তবে তোমাদের মধ্যে থেকে একজনকে সাক্ষী রেখে বিবাহ-চুক্তি সম্পন্ন কর।” (সূরা তালাক: ২)
এই আয়াতে সাক্ষীসহ বিবাহের প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে। তবে চুক্তিপত্র লেখা ফরজ বা ওয়াজিব নয়; এটি নিছক একটি প্রমাণিকা মাত্র।

২. হাদিসে বিবাহের রুকন: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন,

“সাক্ষী ছাড়া কোনো বিবাহ হয় না।” (তিরমিজি, ইবনে মাজাহ)
ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর মতে, বিবাহের জন্য ইজাব-কবুল ও সাক্ষী—এই দুটি রুকন যথেষ্ট। লিখিত দলিল অতিরিক্ত ব্যবস্থা।

৩. হানাফি কিতাবের বক্তব্য:

  • রদ্দুল মুহতার (كتاب النكاح) এ উল্লেখ আছে যে, বিবাহের চুক্তি মৌখিকভাবে সম্পন্ন হলে তা সহিহ। তবে লিখিত দলিল শুধু নিশ্চিতকরণের জন্য। (ইবনে আবিদীন, রদ্দুল মুহতার, ৩/১১)
  • ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি) তে বর্ণিত আছে, বিয়ের পূর্বে লিখিত চুক্তিপত্র করা জায়েজ, তবে তা নিজেই বিবাহ নয়; বরং ভবিষ্যত বিবাহের প্রতিশ্রুতি। (ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২, পৃ. ৩৪৫)
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী) তে বলা হয়েছে, বিবাহের ফর্দ বা চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করলে তাতে কোনো অসুবিধা নেই, তবে শর্ত রাখা উচিত নয় যে, “এই ফর্দই বিবাহের চূড়ান্ত চুক্তি”। প্রকৃত বিবাহ নিকাহ অনুষ্ঠানের মাধ্যমেই সম্পন্ন হবে। (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/৩২১)

৪. প্রাসঙ্গিক মাসআলা:
“বিবাহের ফর্দ” সাধারণত বিয়ের তারিখ, মহর, অভিভাবকদের সম্মতি ইত্যাদি উল্লেখ করে রাখা হয়। এটি মূলত খৎবা (বাগ্দান)-এর মতো, যা জায়েজ এবং উত্তম। তবে কেউ যদি মনে করে যে, ফর্দে স্বাক্ষর করলেই বিবাহ হয়ে গেছে, এবং পরে নিকাহ না করে, তবে তা সহিহ হবে না। নিকাহ অনুষ্ঠান না হওয়া পর্যন্ত স্বাক্ষর কোনো বিবাহ সৃষ্টি করে না।

সতর্কতা ও নির্দেশনা

  • ফর্দনামায় এমন কোনো শর্ত রাখা যাবে না যা ইসলামবিরোধী, যেমন: নির্দিষ্ট সময় পর বিবাহ ভঙ্গের শর্ত, অতিরিক্ত মহর নির্ধারণে জোরাজুরি ইত্যাদি।
  • ফর্দনামায় স্বাক্ষরের পরও যদি কোনো পক্ষ বিয়ে থেকে সরে আসে, তবে তা গুনাহের কাজ হবে না, তবে শরিয়তের দৃষ্টিতে তা অপছন্দনীয়। হাদিসে এসেছে, “মুসলমানদের মধ্যে প্রতিশ্রুতি পূরণ করা ওয়াজিব” (বুখারি), তবে বিয়ের বাগ্দান ভঙ্গ করলে কোনো কাফফারা নেই।
  • ফর্দনামাটি বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পর নিকাহnamah (কাবিননামা) হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে নিকাহ অনুষ্ঠানে সাক্ষীসহ ইজাব-কবুল পুনরায় করতে হবে।

সারকথা

আপনার বর্ণিত পদ্ধতি—বিবাহের পূর্বে ফর্দনামায় স্বাক্ষর করা—জায়েজ ও প্রচলিত। তবে এটি মূল বিবাহ নয়; বাস্তবিক নিকাহ সাক্ষীসহ মৌখিক ইজাব-কবুলের মাধ্যমেই সম্পন্ন করতে হবে। ফর্দনামাটি একটি তথ্য সংগ্রহ ও প্রতিশ্রুতিপত্র মাত্র। আলেমরা এটাকে বৈধ বলেছেন, যতক্ষণ পর্যন্ত তাতে কোনো হারাম বা শর্ত-সংশ্লিষ্ট গোলযোগ না থাকে।

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.