পছন্দের জায়গায় চাকরির দোয়া করার পর অপছন্দের জায়গায় চাকরি করতে গিয়ে হতাশায় ভুগছি, করণীয় কি?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 2520
Questioner: nerob shaheen
Question Asked: 10 Jul 2026, 01:01 PM
Reviewed & Published: 10 Jul 2026, 01:38 PM
Views: 91
Tokens: 3,554
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমি অনেক আশা নিয়ে একটা ভাল জায়গায় কাজের দোয়া করেছিলাম। কিন্তু এখন অন্য যে জায়গায় যেতে চাইনি সেখানে কাজা করতে হবে। এটা নিয়ে খুব হতাশায় ভুগছি আমি

Answer

প্রশ্ন: আমি অনেক আশা নিয়ে একটি ভালো জায়গায় চাকরির জন্য দুআ করেছিলাম। কিন্তু এখন আমাকে অন্য একটি জায়গায় কাজ করতে হচ্ছে, যেখানে আমি যেতে চাইনি। এতে আমি খুব হতাশায় ভুগছি। ইসলামের দৃষ্টিতে এ বিষয়ে কী বলা হয়েছে?


উত্তর

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ

প্রিয় প্রশ্নকারী, আপনার দুঃখ ও হতাশা আমি অনুভব করছি। তবে জেনে রাখুন, মুমিনের জীবনে দুআ শুধু চাওয়ার মাধ্যম নয়, বরং এটি আল্লাহর প্রতি আস্থা ও তার ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকার একটি প্রশিক্ষণ। আপনি যে দুআ করেছিলেন, তা নিশ্চয়ই আল্লাহর দরবারে কবুল হয়েছে। কিন্তু কবুলের অর্থ সবসময় তা-ই পাওয়া নয় যা আমরা চেয়েছি; বরং কবুলের তিনটি রূপ রয়েছে, যেমন হাদীসে এসেছে—

رَسُولَ اللَّهِ ﷺ قَالَ: «مَا مِنْ مُسْلِمٍ يَدْعُو بِدَعْوَةٍ لَيْسَ فِيهَا إِثْمٌ وَلَا قَطِيعَةُ رَحِمٍ إِلَّا أَعْطَاهُ اللَّهُ بِهَا إِحْدَى ثَلَاثٍ: إِمَّا أَنْ يُعَجِّلَ لَهُ دَعْوَتَهُ، وَإِمَّا أَنْ يَدَّخِرَهَا لَهُ فِي الْآخِرَةِ، وَإِمَّا أَنْ يَصْرِفَ عَنْهُ مِنَ السُّوءِ مِثْلَهَا»

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “যে কোনো মুসলিম এমন দুআ করে যাতে গুনাহ ও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয় না থাকে, তবে আল্লাহ তাকে তিনটির একটি দেন: হয় দুনিয়ায়ই তার দুআ পূরণ করেন, না হয় তা আখিরাতের জন্য জমা রাখেন, অথবা এর বিনিময়ে তার থেকে সমপরিমাণ অনিষ্ট দূর করেন।” (সুনানুত তিরমিযী, হাদীস: ৩৫৭৩; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস: ১১১৩৩)

আপনার ক্ষেত্রে দুআ কবুলের এই তৃতীয় রূপটি কার্যকর হয়েছে — হয়তো আপনি যে জায়গায় চেয়েছিলেন সেখানে গেলে কোনো অজানা ক্ষতি হতো, তাই আল্লাহ আপনাকে অন্য একটি জায়গায় দিয়ে সেই ক্ষতি থেকে রক্ষা করেছেন। অথবা এটি আপনার জন্য দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের জন্যই নির্ধারিত হয়েছে।


কুরআন ও হাদীসে ধৈর্যতাকদীরের নির্দেশনা

আল্লাহ তাআলা বলেন—

﴿وَعَسَىٰ أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ ۖ وَعَسَىٰ أَن تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَّكُمْ ۗ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ﴾

“আর এমন হতে পারে যে, তোমরা যা অপছন্দ করো তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর; আর এমনও হতে পারে যে, তোমরা যা পছন্দ করো তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। আর আল্লাহ জানেন, তোমরা জান না।” (সূরা বাকারা, ২:২১৬)

এই আয়াতটি আমাদের শেখায়, মানুষের সীমিত জ্ঞান দিয়ে ভালো-মন্দ বিচার করা উচিত নয়। আল্লাহ যা করেন তার মধ্যে পূর্ণ কল্যাণ নিহিত।

হাদীসে এসেছে—

«عَجَبًا لِأَمْرِ الْمُؤْمِنِ إِنَّ أَمْرَهُ كُلَّهُ خَيْرٌ، وَلَيْسَ ذَاكَ لِأَحَدٍ إِلَّا لِلْمُؤْمِنِ: إِنْ أَصَابَتْهُ سَرَّاءُ شَكَرَ فَكَانَ خَيْرًا لَهُ، وَإِنْ أَصَابَتْهُ ضَرَّاءُ صَبَرَ فَكَانَ خَيْرًا لَهُ»

“মুমিনের ব্যাপারটি আশ্চর্যের! তার সব কাজই তার জন্য কল্যাণকর। আর এটি কেবল মুমিনের জন্যই। যদি সে সুখ পায় তবে শুকরিয়া আদায় করে, ফলে তা তার জন্য কল্যাণ হয়। আর যদি দুঃখ-কষ্ট পায় তবে ধৈর্য ধারণ করে, ফলে তাও তার জন্য কল্যাণ হয়।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৯৯৯)

আপনার বর্তমান পরিস্থিতি মুমিনের পরীক্ষার অংশ। ধৈর্য ধারণ করলে তা আপনার জন্য কল্যাণকর হবে, ইনশাআল্লাহ।


ইস্তিখারা ও দুআ সম্পর্কে হানাফী ফুকাহাদের দৃষ্টিভঙ্গি

বিখ্যাত হানাফী ফকীহ ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.) ‘রাদ্দুল মুহতার’-এ লিখেছেন— দুআ ও তাকদীরের সম্পর্ক নিয়ে তিনি বলেন, দুআ তাকদীরকে পরিবর্তন করতে পারে, কিন্তু সে পরিবর্তনও তাকদীরের অন্তর্ভুক্ত। (রাদ্দুল মুহতার, ১/৪২, কিতাবুত তাহারাহ, ফার‘উন ফিল মা’)

অর্থাৎ আপনি দুআ করেছেন, কিন্তু আল্লাহর চূড়ান্ত ফয়সালা আপনার দুআকে কবুল করার মাধ্যমেই এসেছে, যদিও তা আপনার পছন্দের সাথে মেলে না। এটি হতাশার কারণ নয়, বরং আল্লাহর রহমতেরই একটি রূপ।

হাকীমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী (রহ.) ‘ইমদাদুল ফাতাওয়া’-তে বলেন— “দুআ কবুল না হওয়া মানে আল্লাহ অবহেলা করেছেন, এমন নয়; বরং প্রায়ই তা স্থগিত রাখেন বা অন্য কোনো কল্যাণের বিনিময়ে দেন।” (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/২২৭)


আপনার করণীয়

১. শুকরিয়া আদায় করুন — এমনকি যদি চাকরিটি আপনার পছন্দের না হয়, তবুও এটি আপনার রিজিক, তাই আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করুন।

২. ইস্তিখারা করুন — ভবিষ্যতে বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সুন্নাহ সম্মত ইস্তিখারা করুন। ইস্তিখারার পর যা ঘটে, সেটাই আপনার জন্য ভালো বলে মনে করুন।

৩. দুআ চালিয়ে যান — আপনি চাইলে এখনো দুআ করতে পারেন যে, আল্লাহ যদি এটাই আপনার জন্য ভালো হন, তাহলে তাতে বরকত দিন; আর যদি অন্য জায়গা ভালো হয়, তাহলে সেখানে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করে দিন।

৪. হতাশা ত্যাগ করুন — হতাশা শয়তানের কাজ। আল্লাহ বলেন—

﴿وَلَا تَيْأَسُوا مِن رَّوْحِ اللَّهِ ۖ إِنَّهُ لَا يَيْأَسُ مِن رَّوْحِ اللَّهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْكَافِرُونَ﴾

“আর তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহর রহমত থেকে শুধু কাফির সম্প্রদায়ই নিরাশ হয়।” (সূরা ইউসুফ, ১২:৮৭)


উপসংহার

আপনার দুআ নষ্ট হয়নি; বরং আল্লাহর অফুরন্ত জ্ঞান ও রহমত অনুযায়ী তা এমনভাবে কবুল হয়েছে যা আপনার অজানা কল্যাণ বহন করে। এখন আপনার দায়িত্ব ধৈর্য ধরা, বর্তমান জায়গায় আন্তরিকভাবে কাজ করা এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখা। মনে রাখবেন, ‘শেষ পর্যন্ত যা ঘটে, ভালোর জন্যই ঘটে’ — এটাই মুমিনের বিশ্বাস।

আল্লাহ আপনাকে এই পরিস্থিতিতে ধৈর্য ও খুশির সাথে কাজ করার তাওফীক দিন এবং আপনার অপছন্দের জায়গাটিকেও আপনার জন্য কল্যাণকর করুন। আমীন।



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.