দাদার মৃত্যু পরবর্তী ফারায়েজ প্রসঙ্গে

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 2505
Questioner: MD AL IMRAN
Question Asked: 10 Jul 2026, 01:16 AM
Reviewed & Published: 10 Jul 2026, 06:10 AM
Views: 43
Tokens: 17,525
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওরাহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহ শ্রদ্ধেয় মুক্তি সাহেবগণ।

আমার দাদা ১৯৭২ সালে ইন্তেকাল করেন এবং আজ অবধি তিনার সম্পদের কোন ফারায়েজ বন্টন হয়নি তার উত্তরাধিকারীদের মধ্যে যেটা খুবই দুঃখজনক।

আমি ধারাবাহিকভাবে আমার দাদার উত্তরাধিকারীগণ যারা জীবিত আছেন এবং যারা ইন্তেকাল করেছেন তাদের বর্ণনা দিচ্ছি দয়া করে আমাকে যদি সহজে কিভাবে ফারায়েজ বন্টন করতে পারি এবং এখানে তাসহীহ, মুনাসাখাত, রদ বা আউল করতে হবে কি না আমাকে সহজ ভাবে অংক করে বুঝিয়ে দেন তাহলে এটা আমি আমার পরিবারের কাছে তুলে ধরতে পারবো যাতে তারা এই ফরজ টা আদায় করতে পারে ইনশাআল্লাহ।

আমার দাদা ইন্তেকালের সময় জীবিত ছিলেন আমার দাদী, ও তিন ছেলে (আমার বড়ো চাচা, আব্বা ও ছোট চাচ্চু) সন্তান এবং দুইজন কন্যা (আমার দুই ফুপু)
দাদার ইন্তেকালের পর এই পাঁচ সন্তান নাবালক ছিলেন। তখনকার যুগে অনেক অভাব অনটন থাকায় এই নাবালক সন্তানগুলি নিয়ে দাদি অনেক কষ্টে দিনানিপাত করেন এবং কিছু জমি জায়গা বিক্রি করে সংসার পরিচালনা করেন।

পরবর্তীতে আমার চাচারা এবং বাবা প্রাপ্তবয়স্ক হলে তারা দাদার (তাদের বাবার) সম্পদ থেকে মোট ১৬ শতক জমি পান। এটা তারা ইলমে ফারায়েজের আলোকে বন্টনও করেননি এবং তাদের দুই বোনকে (আমার দুই ফুপুকে) তিনারা অংশও দেন নি। আমরা এখানে দাদার 16 শতাংশ জমিকেই যদি তার রেখে যাওয়া সম্পত্তি হিসেবে ধরি তাহলে সম্পুর্ণ বন্টনের হিসেব কিভাবে করতে পারি?

এখন আমি দাদা মৃত্যুর পরবর্তীতে তিনার ওয়ারিসগণের মধ্যে কে কে মৃত্যুবরণ করেছেন তার ক্রম সাজিয়ে দিচ্ছি।

দাদা মারা যান ১৯৭২ সালে। পরবর্তীতে ২০১৭ সালে মারা যান আমার বড় ফুপু। ২০২৪ সালে মারা যান আমার বড় চাচা এবং ২০২৫ সালে মারা যান আমার দাদি।

দাদা ইন্তেকালের সময়ে তার জীবিত উত্তরাধিকারীগণ হলেন আমার দাদী, তিন ছেলে এবং দুই মেয়ে।

আমার ফুপু ইন্তেকালের সময় তার পরিবারে তার উত্তরাধিকারীগণ ছিলেন, দুই ছেলে এবং এক মেয়ে। ফুপুর ইন্তেকালের আগেই ফুপা মানে তার স্বামী ইন্তেকাল করেছিলেন।

বড় চাচা ইন্তেকালের সময় তার পরিবারের তার উত্তরাধিকারীগণ ছিলেন, তার দুই ছেলে এবং দুই মেয়ে এবং তার স্ত্রী ও তার মা। মানে আমার দাদি।

এবং দাদি ইন্তেকালের সময়ে তার উত্তরাধিকারীগণ বেঁচে ছিলেন আমার আব্বা এবং আমার ছোট চাচ্চু এবং আমার ছোট ফুফু।

উপরিউক্ত বর্ণনায় সবার মৃত্যুর ক্রম অনুসারে তাদের উত্তরাধিকারীগণের বর্ণনা দিলাম এমতাবস্থায় আমরা পুরো বন্টন যদি করি সবার মাঝে তাহলে কোন পদ্ধতিতে করতে পারি এবং কিভাবে সহজে করতে পারি? যাতে করে আমার পরিবারের সামনে (মানে আমার বাবা ও ছোট চাচ্চু এবং ছোট ফুপুর সামনে) তুলে ধরতে পারি এবং আমরা এই ফরজটি সুন্দরভাবে আদায় করতে পারি এই পদ্ধতিটি জানালে খুবই উপকৃত হব ইনশাআল্লাহ।

Answer

উত্তর:
وَعَلَيْكُمُ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ

প্রশ্নে বর্ণিত পরিস্থিতি অনুযায়ী, আপনার দাদা ১৯৭২ সালে ইন্তেকাল করেন। তার রেখে যাওয়া সম্পত্তি (১৬ শতক জমি) তখন থেকেই বণ্টন না হওয়ায় এখন তা মুনাসাখাত (একাধিক মৃত্যুর কারণে উত্তরাধিকারের স্তরভিত্তিক বণ্টন) নিয়মে বণ্টন করতে হবে। নিচে ধাপে ধাপে সম্পূর্ণ গণনা দেওয়া হলো।


প্রথম স্তর: দাদার ইন্তেকাল (১৯৭২)

ওয়ারিশগণ: দাদী (স্ত্রী), ৩ ছেলে, ২ মেয়ে।
শরীয়াহ অংশ:

  • দাদী (স্ত্রী): ১/৮ (সন্তান থাকায়)
  • অবশিষ্ট ৭/৮ সন্তানদের মাঝে ছেলে : মেয়ে = ২ : ১ অনুপাতে বণ্টিত হবে।

গণনা (মোট ১৬ শতক):

  • দাদী পান: ১৬ × ১/৮ = ২ শতক
  • প্রতিটি ছেলে পান: ১৬ × ৭/৩২ = ৩.৫ শতক (৩ ছেলে = ১০.৫ শতক)
  • প্রতিটি মেয়ে পান: ১৬ × ৭/৬৪ = ১.৭৫ শতক (২ মেয়ে = ৩.৫ শতক)
    মোট = ২ + ১০.৫ + ৩.৫ = ১৬ শতক (ঠিক আছে)

দ্বিতীয় স্তর: বড় ফুপুর ইন্তেকাল (২০১৭)

বড় ফুপুর প্রাপ্য অংশ (১.৭৫ শতক) তার ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টন হবে।
তার ওয়ারিশ: ২ ছেলে, ১ মেয়ে (স্বামী আগেই মৃত) ও তার মা (দাদী)।
শরীয়াহ অংশ:

  • মা (দাদী): ১/৬ (সন্তান থাকায়)
  • অবশিষ্ট ৫/৬ সন্তানদের মাঝে ছেলে : মেয়ে = ২ : ১ অনুপাতে।

গণনা (বড় ফুপুর অংশ = ৭/৪ শতক):

  • দাদী পান: (৭/৪) × (১/৬) = ৭/২৪ ≈ ০.২৯১৭ শতক
  • বড় ফুপুর প্রতিটি ছেলে পান: (৭/৪) × (৫/৬) × (২/৫) = ৭/১২ ≈ ০.৫৮৩৩ শতক
  • বড় ফুপুর মেয়ে পান: (৭/৪) × (৫/৬) × (১/৫) = ৭/২৪ ≈ ০.২৯১৭ শতক

এখন দাদীর মোট অংশ দাঁড়ায়: ২ (প্রথম স্তর) + ০.২৯১৭ = ২.২৯১৭ শতক


তৃতীয় স্তর: বড় চাচার ইন্তেকাল (২০২৪)

বড় চাচার প্রাপ্য অংশ (৩.৫ শতক) তার ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টন হবে।
তার ওয়ারিশ: স্ত্রী, মা (দাদী), ২ ছেলে, ২ মেয়ে।
শরীয়াহ অংশ:

  • স্ত্রী: ১/৮ (সন্তান থাকায়)
  • মা (দাদী): ১/৬ (সন্তান থাকায়)
  • অবশিষ্ট ১৭/২৪ সন্তানদের মাঝে ছেলে : মেয়ে = ২ : ১ অনুপাতে।

গণনা (বড় চাচার অংশ = ৭/২ শতক):

  • স্ত্রী পান: (৭/২) × (১/৮) = ৭/১৬ = ০.৪৩৭৫ শতক
  • দাদী পান: (৭/২) × (১/৬) = ৭/১২ ≈ ০.৫৮৩৩ শতক
  • প্রতিটি ছেলে পান: (৭/২) × (১৭/২৪) × (২/৬) = ১১৯/১৪৪ ≈ ০.৮২৬৪ শতক
  • প্রতিটি মেয়ে পান: (৭/২) × (১৭/২৪) × (১/৬) = ১১৯/২৮৮ ≈ ০.৪১৩২ শতক

এখন দাদীর মোট অংশ দাঁড়ায়: ২.২৯১৭ + ০.৫৮৩৩ = ২.৮৭৫ শতক


চতুর্থ স্তর: দাদীর ইন্তেকাল (২০২৫)

দাদীর প্রাপ্য অংশ (২.৮৭৫ শতক) তার জীবিত সন্তানদের মধ্যে বণ্টন হবে।
তার ওয়ারিশ: আব্বা, ছোট চাচা, ছোট ফুপু (বড় চাচা ও বড় ফুপু পূর্বেই মৃত, তাদের সন্তানরা জীবিত সন্তানের উপস্থিতিতে বাদ পড়বে)।
শরীয়াহ অংশ: ছেলে : মেয়ে = ২ : ১ (তিনজনের জন্য মোট ৫ অংশ)।

গণনা (দাদীর অংশ = ২৩/৮ শতক):

  • আব্বা পান: (২৩/৮) × (২/৫) = ২৩/২০ = ১.১৫ শতক
  • ছোট চাচা পান: একই = ২৩/২০ = ১.১৫ শতক
  • ছোট ফুপু পান: (২৩/৮) × (১/৫) = ২৩/৪০ = ০.৫৭৫ শতক

চূড়ান্ত বণ্টন (সকলের প্রাপ্য অংশ)

নিচে ১৬ শতক জমির বর্তমান অধিকারীদের নাম ও অংশ দেওয়া হলো:

| ক্রম | অধিকারী | প্রাপ্য অংশ (শতকে) | |------|----------|-------------------| | ১ | আব্বা | ৪.৬৫ (বা ৯৩/২০) | | ২ | ছোট চাচা | ৪.৬৫ (বা ৯৩/২০) | | ৩ | ছোট ফুপু | ২.৩২৫ (বা ৯৩/৪০) | | ৪ | বড় ফুপুর বড় ছেলে | ০.৫৮৩৩ (বা ৭/১২) | | ৫ | বড় ফুপুর ছোট ছেলে | ০.৫৮৩৩ (বা ৭/১২) | | ৬ | বড় ফুপুর মেয়ে | ০.২৯১৭ (বা ৭/২৪) | | ৭ | বড় চাচার স্ত্রী | ০.৪৩৭৫ (বা ৭/১৬) | | ৮ | বড় চাচার বড় ছেলে | ০.৮২৬৪ (বা ১১৯/১৪৪) | | ৯ | বড় চাচার ছোট ছেলে | ০.৮২৬৪ (বা ১১৯/১৪৪) | | ১০ | বড় চাচার বড় মেয়ে | ০.৪১৩২ (বা ১১৯/২৮৮) | | ১১ | বড় চাচার ছোট মেয়ে | ০.৪১৩২ (বা ১১৯/২৮৮) | | মোট | | ১৬.০০০০ (প্রায়) |

(দ্রষ্টব্য: উপরোক্ত অংশগুলো সঠিকভাবে যোগ করলে ১৬ শতক হয়, যা বুঝার সুবিধার্থে দশমিকে দেখানো হয়েছে।)


গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা

১. তাসহীহ (সংশোধন): অংশগুলো ভগ্নাংশে আছে, তাই বাস্তবে বণ্টনের সময় প্রতিটি অংশকে লঘিষ্ঠ সাধারণ হরে (LCM) নিয়ে পূর্ণ সংখ্যায় রূপান্তর করতে পারেন।
২. আউল না রাদ: এখানে কোনো ক্ষেত্রেই অংশের সমষ্টি ১-এর বেশি হয়নি, তাই আউল প্রয়োজন নেই। রাদও প্রযোজ্য নয়, কারণ আসাবা (ছেলে) বিদ্যমান।
৩. মুনাসাখাত: একাধিক মৃত্যুর কারণে স্তরভিত্তিক বণ্টন করা হয়েছে, যা উপরের গণনায় প্রতিফলিত।
৪. বিক্রিত জমি: দাদী যদি নাবালক সন্তানদের ভরণপোষণের জন্য কিছু জমি বিক্রি করে থাকেন, তবে তা যদি শরীয়তসম্মত হতো (যেমন প্রয়োজনে) তাহলে তা গ্রহণযোগ্য। কিন্তু তা বর্তমান বণ্টনের হিসাবের বাইরে। শুধু অবশিষ্ট ১৬ শতকই বণ্টনযোগ্য সম্পদ।
৫. পূর্বের গাফলতি: বড় চাচা, আব্বা ও ছোট চাচা পূর্বে যে ১৬ শতক জমি ভোগ করেছেন এবং বোনদের অংশ দেননি, তা গুনাহ। এখন উক্ত বণ্টন অনুসারে সকলের অংশ বুঝিয়ে দিতে হবে।


সহজ পদ্ধতি

আপনার পরিবারের সদস্যদের সামনে নিচের টেবিলটি উপস্থাপন করুন। প্রত্যেকে নিজ নিজ অংশ বুঝে নিন এবং পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে জমি ভাগ করে নিন। কোনো জটিলতা হলে স্থানীয় আলেম বা ফারায়েজ বিশেষজ্ঞের সহায়তা নিন।

উল্লেখ্য: উত্তরাধিকার আইন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এটি আদায় করা ফরজ। আল্লাহ তাআলা সহজ করে দিন।

আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

সূত্র:

  • কুরআন (সূরা নিসা ৪:১১-১২, ১৭৬)
  • রদ্দুল মুহতার (কিতাবুল ফারায়েজ)
  • ফাতাওয়া উসমানী (জিলদ ২, ফারায়েজ অধ্যায়)
  • বেহেশতী জেওর (ফারায়েজ অধ্যায়)

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.