পা ভেঙে গেলে জুম্মার নামাজের বিধান
Salah-Prayer · Hanafi
Question
মুফতি সাহেব, আমি একজন ২৪ বছর বয়সী যুবক। গত ১ মাস আগে একটি দুর্ঘটনার কারণে আমার বাম পায়ের হাঁটুর নিচের দুটি প্রধান হাড় (Tibia & Fibula) ভেঙে যায় (Closed Fracture)। ভাঙার পর কোনো সার্জারি বা অপারেশন করা হয়নি। হাড় দুটো প্রাকৃতিকভাবে জোড়া লাগার প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে।
সম্প্রতি বিশেষজ্ঞ অর্থোপেডিক ডাক্তার আমার পায়ের এক্স-রে রিপোর্ট দেখে আমাকে পরবর্তী ৪ সপ্তাহের জন্য সম্পূর্ণ বেড রেস্টে (Strict Bed Rest) থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। ডাক্তার সাহেব কঠোরভাবে সাবধান করেছেন যে, বাম পা কোনোভাবেই মাটিতে ছোঁয়ানো বা এর ওপর সামান্যতম ভর দেওয়া যাবে না (Zero Weight-bearing)। সামান্য ভর লাগলে হাড়ের পজিশন নড়ে গিয়ে বড় ক্ষতির ঝুঁকি রয়েছে। বর্তমানে আমি পায়ে একটি বিশেষ বেল্ট (AFO Brace) পরি এবং চলাচলের জন্য বগলের লাঠি (Crutch) ব্যবহার করি।
আমার বর্তমান আবাসন ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি নিম্নরূপ:
১. আমি একটি ভবনের ২য় তলায় বসবাস করি (যাতায়াতের জন্য সিঁড়ি ব্যবহার করতে হয়, কোনো লিফট নেই)।
২. আমার বাসা থেকে নিকটবর্তী মসজিদে যেতে পায়ে হেঁটে (ক্রাচে ভর দিয়ে) প্রায় ৫ মিনিট সময় লাগে।
বর্তমান অবস্থায় সিঁড়ি দিয়ে ক্রাচে ভর করে নিচে নামা, ৫ মিনিট হেঁটে মসজিদে যাওয়া এবং সেখানে ভারসাম্য বজায় রাখা আমার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং ডাক্তারের নির্দেশ অনুযায়ী সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
এই পরিস্থিতিতে শরীয়তের আলোকে আমার জানার বিষয়গুলো হলো:
১. এই অবস্থায় আমার জন্য আগামীকাল এবং পরবর্তী ৪ সপ্তাহ জুম্মার নামাজে মসজিদে না গিয়ে ঘরে বসে যোহরের সালাত আদায় করার অনুমতি আছে কি?
২. একইভাবে, দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাত মসজিদে গিয়ে জামাতে আদায় করার বাধ্যবাধকতা থেকে আমি ছাড় পাব কি না?
৩. আমি যদি ঘরে সালাত আদায় করি, তবে মাটিতে পা না ছোঁয়াতে পারার কারণে চেয়ারে বসে সামনে পা বাড়িয়ে ইশারায় রুকু-সেজদা করার নিয়মটি কি সঠিক হবে?
দয়া করে বিস্তারিত জানিয়ে উপকৃত করবেন। জাজাকুমুল্লাহু খাইরান।
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
প্রশ্নের বিবরণ অনুযায়ী আপনি বাম পায়ের টিবিয়া ও ফাইবুলা ভেঙে বর্তমানে কঠোর বিছানা বিশ্রামে আছেন। ডাক্তার নির্দেশ দিয়েছেন যে, পায়ে কোনো প্রকার ভর দেওয়া যাবে না (Zero Weight-bearing) এবং আগামী ৪ সপ্তাহ সম্পূর্ণ বেড রেস্টে থাকতে হবে। আপনি দ্বিতীয় তলায় বসবাস করেন, লিফ্ট নেই, সিঁড়ি দিয়ে ক্রাচের সাহায্যে নামা এবং ৫ মিনিট হেঁটে মসজিদে যাওয়া চিকিৎসার দৃষ্টিতে ঝুঁকিপূর্ণ ও নিষিদ্ধ। এই অবস্থায় শরী‘আতের বিধান নিম্নরূপ:
১. জুম্মার নামাজের বিধান
জুম্মার নামাজ ওয়াজিব এবং তা মসজিদে জামা‘আতের সাথে আদায় করা ফরয। কিন্তু শরী‘আতে ওযরের কারণে জুম্মা মাফ হয় এবং জায়েয আছে যে, বাড়িতে যোহরের চার রাকাত ফরয পড়বেন। আপনার বর্তমান অবস্থা (ডাক্তারের কঠোর নির্দেশ, পায়ে ভর দেওয়ার অক্ষমতা, সিঁড়ি বেয়ে নামা ও হাঁটার ঝুঁকি) শরী‘আহ স্বীকৃত ওযর। তাই আগামী ৪ সপ্তাহ আপনি জুম্মার নামাজের পরিবর্তে বাড়িতে যোহরের নামাজ আদায় করবেন।
(রদ্দুল মুহতার: ২/১৬৪; ফাতাওয়া উসমানী: ১/৪২৭; ইমদাদুল ফাতাওয়া: ১/৫৭৫)
সারসংক্ষেপ: জুম্মায় মসজিদে যাওয়া আপনার জন্য আবশ্যক নয়; আপনি বাড়িতে যোহরের নামাজ পড়বেন।
২. দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত জামা‘আতে যাওয়ার বিধান
দিনে পাঁচ ওয়াক্ত ফরয নামাজ মসজিদে জামা‘আতে পড়া সুন্নাতে মুওয়াক্কাদা (পুরুষদের জন্য)। কিন্তু শরী‘আতে ওযরের কারণে জামা‘আত ছেড়ে বাড়িতে পড়ার অনুমতি আছে। আপনার বর্তমান অসুস্থতা (সিঁড়ি ব্যবহার, ৫ মিনিট হাঁটা, পায়ে ভর না দিয়ে ক্রাচ ব্যবহার করা, হাড় সঠিকভাবে জোড়া লাগার ঝুঁকি) একটি বৈধ শারীরিক ওযর। তাই ৪ সপ্তাহ (এবং প্রয়োজন হলে আরও) আপনি বাড়িতে একা নামাজ পড়তে পারবেন, জামা‘আতে যাওয়া বাধ্যতামূলক নয়।
(রদ্দুল মুহতার: ২/৪৯০; ফাতাওয়া আলমগীরী: ১/১২৩; বেহিশতী জেওর: ৩/৩৫০)
সারসংক্ষেপ: আপনার জন্য মসজিদে জামা‘আতে যাওয়া আবশ্যক নয়; আপনি বাড়িতে নামাজ পড়তে পারেন।
৩. চেয়ারে বসে ইশারায় রুকু-সিজদা করার পদ্ধতি
আপনি যদি বাড়িতে নামাজ আদায় করেন, কিন্তু মাটিতে পা রাখতে না পারেন এবং দাঁড়াতে না পারেন, তাহলে চেয়ারে বসে ইশারায় নামাজ পড়া জায়েয।
পদ্ধতি:
- নিয়ত ও কিরাআত: চেয়ারে বসে (পা সামনে বা নিচে রেখে) বসে বসে সূরা পড়বেন।
- রুকু: রুকুর জন্য সামান্য ঝুঁকবেন, যাতে কপাল হাঁটু বরাবর না হয় (বসে থাকায় স্বাভাবিক রুকু সম্ভব হলেও মাটিতে পা না থাকায় সমস্যা নেই)।
- সিজদা: সিজদার জন্য রুকুর চেয়ে বেশি ঝুঁকবেন। আদর্শ হলো মাথা টেবিল বা উঁচু কিছুতে না রেখে বরং বাতাসেই ইশারা করা। (রদ্দুল মুহতার: ১/৬১৫; ফাতাওয়া উসমানী: ১/৪৩১; বাহিশতী জেওর: ৩/৩৫২)
মনে রাখবেন: যদি আপনি দাঁড়াতে সক্ষম না হন, তাহলে আপনি বসে নামাজ পড়বেন এবং রুকু-সিজদা ইশারায় করবেন। আর যদি দাঁড়াতে পারেন কিন্তু পা মাটিতে ছোঁয়াতে না পারেন, তাহলে দাঁড়িয়ে রুকু-সিজদা ইশারায় করা যায় না; বরং বসেই পড়তে হবে।
সংক্ষিপ্ত নির্দেশনা
- জুম্মা: বাড়িতে যোহরের চার রাকাত ফরয পড়ুন।
- পাঁচ ওয়াক্ত: বাড়িতে একা নামাজ পড়ুন; জামা‘আতে যাওয়া জরুরী নয়।
- নামাজের পদ্ধতি: মাটিতে বসে ইশারায় নামাজ পড়তে পারলে মাটিতেই বসে নামাজ পড়বেন। আর এটা সম্ভব না হলে চেয়ারে বসে পা সামনে বা নিচে রেখে বসুন। রুকু ও সিজদা যথাক্রমে সামান্য ও মধ্যম মাত্রায় ঝুঁকে ইশারা করুন (সিজদা রুকু থেকে বেশি ঝুঁকতে হবে)।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে দ্রুত আরোগ্য দান করুন এবং আপনার ইবাদত কবুল করুন। জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।