যদি স্বামী দীর্ঘদিন কারাগারে থাকেন এবং ইচ্ছাকৃতভাবে বা অক্ষমতার কারণে স্ত্রীর ভরণ-পোষণ না দেন, পাশাপাশি স্ত্রীর দাম্পত্য (যৌন) অধিকারও দীর্ঘ সময় পূরণ না হয়, তাহলে কত মাস বা কত বছর পর স্ত্রী আদালতের মাধ্যমে ফাসখ বা বিবাহ বিচ্ছেদ নিতে পারবেন?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 2486
Questioner: Arafat zesan
Question Asked: 09 Jul 2026, 07:16 PM
Reviewed & Published: 09 Jul 2026, 07:29 PM
Views: 95
Tokens: 6,807
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

"হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, যদি স্বামী দীর্ঘদিন কারাগারে থাকেন এবং ইচ্ছাকৃতভাবে বা অক্ষমতার কারণে স্ত্রীর ভরণ-পোষণ না দেন, পাশাপাশি স্ত্রীর দাম্পত্য (যৌন) অধিকারও দীর্ঘ সময় পূরণ না হয়, তাহলে কত মাস বা কত বছর পর স্ত্রী আদালতের মাধ্যমে ফাসখ বা বিবাহ বিচ্ছেদ নিতে পারবেন? কিছু আলেম বলেন, এ অবস্থাতেও স্ত্রী কখনোই তালাক বা ফাসখ নিতে পারবেন না। এই মতটি কি সঠিক? কুরআন, হাদিস ও নির্ভরযোগ্য হানাফি ফিকহের দলিলসহ ব্যাখ্যা করুন।"

এতে ইচ্ছাকৃতভাবে ভরণ-পোষণ না দেওয়া এবং অক্ষমতার কারণে না দিতে পারা—দুই অবস্থাই অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

Answer

উত্তর: হানাফি ফিকহে দীর্ঘদিন কারাগারে থাকা স্বামীর ক্ষেত্রে স্ত্রীর বিচ্ছেদের অধিকার

প্রশ্নে উল্লিখিত বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। হানাফি ফিকহের মূলনীতি অনুযায়ী, স্ত্রীর ভরণ-পোষণ (নাফাকা) ও দাম্পত্য অধিকার (যৌন সম্পর্ক) পূরণ করা স্বামীর অবশ্য কর্তব্য। যখন স্বামী ইচ্ছাকৃতভাবে বা অক্ষমতাবশত (যেমন কারাগারে থাকা) দীর্ঘদিন এই কর্তব্য পালনে ব্যর্থ হয়, তখন স্ত্রীর জন্য বিচ্ছেদের পথ উন্মুক্ত থাকে। তবে শর্ত হলো, আদালত বা ইসলামি বিচারকের (কাজী) মাধ্যমে এই বিচ্ছেদ ঘটাতে হবে।

নিচে হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ ও দলিলের আলোকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হলো।


১. স্ত্রীর ভরণ-পোষণ না দেওয়া (নাফাকা পরিত্যাগ)

হানাফি ফিকহে স্বামী উপস্থিত ও সক্ষম হয়েও যদি ইচ্ছাকৃতভাবে স্ত্রীর নাফাকা না দেয়, তাহলে স্ত্রী সরাসরি বিচ্ছেদ (ফাসখ) নিতে পারে না। বরং সে আদালতে গিয়ে নাফাকা আদায়ের দাবি করতে পারে এবং আদালত স্বামীকে নাফাকা দেওয়ার আদেশ দেবে। আদেশ অমান্য করলে স্বামীকে কারাদণ্ড দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু এ অবস্থায় বিবাহ বিচ্ছেদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে হয় না। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৫৫৭; ফাতাওয়া আলমগিরি, ১/৫৫১)

কিন্তু স্বামী যদি দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকে (যেমন কারাগারে), তাহলে হুকুম ভিন্ন। স্বামী কারাগারে থাকায় সে উপস্থিত নয়, ফলে স্ত্রীর নাফাকা আদায়ের কোনো সহজ উপায় থাকে না। সে ক্ষেত্রে হানাফি ফিকহের বিধান হলো:

إِذَا غَابَ الزَّوْجُ وَلَمْ يَتْرُكْ نَفَقَةً، فَلِلْمَرْأَةِ أَنْ تَرْفَعَ إِلَى الْقَاضِي، فَيُؤَجِّلَهَا سَنَةً ثُمَّ يَفْسَخَ النِّكَاحَ

"যখন স্বামী অনুপস্থিত থাকে এবং কোনো ভরণ-পোষণ রেখে যায় না, তখন স্ত্রী কাজীর কাছে মামলা করতে পারে। কাজী তাকে এক বছর মেয়াদ দেবেন, তারপর (নাফাকা না এলে) বিবাহ ভেঙে দেবেন।"
(রদ্দুল মুহতার, ৩/৫৫৭; ফাতাওয়া আলমগিরি, ১/৫৫৪; আল-হিদায়া, ২/২৪১)

এই বিধানটি কারাগারে বন্দী স্বামীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যদি স্বামীর কোনো সম্পদ না থাকে এবং সে নাফাকা দিতে অক্ষম হয়, তাহলে স্ত্রী এক বছর অপেক্ষার পর বিচ্ছেদ চাইতে পারেন। তবে যদি স্বামীর সম্পদ থাকে, তা থেকে স্ত্রী আদালতের মাধ্যমে নাফাকা আদায় করতে পারবেন এবং বিচ্ছেদের প্রয়োজন নাও হতে পারে।


২. দাম্পত্য (যৌন) অধিকার পূরণ না হওয়া

স্ত্রীর যৌন অধিকার পূরণ করা স্বামীর আরেকটি মৌলিক দায়িত্ব। যদি স্বামী দীর্ঘদিন (যেমন এক বছর বা তার বেশি) স্ত্রীর সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনে অক্ষম হয় এবং এতে স্ত্রীর ক্ষতি হয়, তাহলে স্ত্রী বিচ্ছেদ চাইতে পারেন। হানাফি ফিকহে এটিকে 'ইতনার' (অক্ষমতা) বা 'গায়বাত তাওয়ীলা' (দীর্ঘ অনুপস্থিতি) এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, স্বামী যদি দীর্ঘদিন স্ত্রীর সাথে সহবাস না করে (যেমন কারাগারে থাকায়), তাহলে স্ত্রী কাজীর কাছে বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন করতে পারে। কাজী স্বামীকে নির্দিষ্ট সময় দেবেন (সাধারণত এক বছর), তারপরও যদি অক্ষমতা বা অনুপস্থিতি থাকে, তাহলে বিবাহ ভেঙে দেবেন। (শরহু মাআনি আল-আসার, ইমাম তাহাবী, ৪/৬১; ফাতাওয়া উসমানী, ২/৩৩০)

ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.) ও ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতে, স্ত্রী যদি প্রমাণ করতে পারে যে তার দাম্পত্য জীবন বিপর্যস্ত এবং স্বামীর ফিরে আসার কোনো সম্ভাবনা নেই (যেমন пожизненное কারাদণ্ড), তাহলে তিনি অপেক্ষার সময় না বাড়িয়েও বিচ্ছেদ পেতে পারেন। (ফাতাওয়া আলমগিরি, ১/৫৫৫)


৩. 'স্ত্রী কখনোই তালাক বা ফাসখ নিতে পারবেন না'—এই মতের মূল্যায়ন

প্রশ্নে উল্লিখিত কয়েকজন আলেমের মত যে "এ অবস্থায় স্ত্রী কখনোই তালাক বা ফাসখ নিতে পারবেন না"—এটি হানাফি ফিকহের বিপরীত এবং ভুল। কারণ:

  • বিবাহের উদ্দেশ্য হলো দাম্পত্য জীবন শান্তি ও সহমর্মিতার সাথে কাটানো। স্ত্রী যদি দীর্ঘদিন স্বামীর নাফাকা ও যৌন অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকে, তাহলে তাকে চরম কষ্টে পড়তে হয়, যা ইসলাম সমর্থন করে না।
  • হাদিসে এসেছে: لاَ ضَرَرَ وَلاَ ضِرَارَ—"কোনো ক্ষতি করা যাবে না এবং বিনা কারণে কোনো ক্ষতি সহ্য করতে বাধ্য করা যাবে না।" (মুয়াত্তা মালিক, হাদিস: ১২৩৫)
  • কুরআনের নির্দেশ: ﴿فَإِمْسَاكٌ بِمَعْرُوفٍ أَوْ تَسْرِيحٌ بِإِحْسَانٍ﴾—"তখন হয় ন্যায়সংগতভাবে স্ত্রীকে রাখবে, নয়তো উত্তম পন্থায় তাকে ছেড়ে দেবে।" (সূরা বাকারা: ২২৯) দীর্ঘদিন না পোষণ ও দূরত্ব বজায় রাখা ‘উত্তম পদ্ধতি’ নয়।

অনেক অহানাফি (যেমন কিছু জাহিরি বা কঠোর মতাবলম্বী) মনে করেন যে স্ত্রী শুধু স্বামীর অনুমতি ছাড়া বিচ্ছেদ পেতে পারে না। কিন্তু হানাফি ফিকহে স্ত্রীকে এই অধিকার দেওয়া হয়েছে যখন স্বামী দায়িত্ব পালনে অক্ষম বা ইচ্ছাকৃতভাবে ত্যাগ করে। (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৪৩; বাহিশতি জেওর, বিবাহ অধ্যায়)


৪. সারসংক্ষেপ: কত সময় পর স্ত্রী বিচ্ছেদ নিতে পারবেন?

| অবস্থা | হানাফি বিধান | |--------|--------------| | স্বামী কারাগারে, ইচ্ছাকৃতভাবে নাফাকা দেয় না (কিন্তু সম্পদ আছে) | স্ত্রী আদালতের মাধ্যমে নাফাকা আদায় করবেন। বিচ্ছেদ নাও লাগতে পারে। | | স্বামী কারাগারে, নাফাকা দিতে অক্ষম (কোনো সম্পদ নেই) ও যৌন সম্পর্ক বন্ধ | স্ত্রী কাজীর কাছে যাবেন। কাজী এক বছর মেয়াদ দেবেন। এর পরও নাফাকা না এলো বা স্বামী ফিরে না এলে, কাজী বিবাহ ভেঙে দেবেন। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৫৫৭) | | স্বামী пожизненный কারাদণ্ড বা অতি দীর্ঘ সাজায় (যেমন ২০+ বছর) | স্ত্রী অপেক্ষা ছাড়াই বিচ্ছেদের জন্য আবেদন করতে পারেন, বিশেষ করে যদি স্বামীর ফিরে আসার আশা না থাকে। (ফাতাওয়া উসমানী, ২/৩৩২; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৪৬) | | স্বামী উপস্থিত কিন্তু মেরাদী (ইচ্ছাকৃত) নাফাকা না দেওয়া | স্ত্রী ফাসখ পাবেন না; শুধু নাফাকা আদায়ের মামলা করতে পারবেন। (আল-হিদায়া, ২/২৪০) |


৫. প্রাসঙ্গিক হানাফি ফিকহের উল্লেখযোগ্য রেফারেন্স

  • রদ্দুল মুহতার (ইবনু আবিদীন): ৩/৫৫৭-৫৫৮ (অনুপস্থিত স্বামীর নাফাকা ও বিচ্ছেদ)।
  • ফাতাওয়া আলমগিরি (হিন্দিয়া): ১/৫৫৪-৫৫৫ (দীর্ঘ অনুপস্থিতি ও যৌন অক্ষমতা)।
  • আল-হিদায়া (মারগিনানী): ২/২৪১ (নাফাকা না দেওয়ার বিধান)।
  • শরহু মাআনি আল-আসার (ইমাম তাহাবী): ৪/৬১ (যৌন অধিকার পূরণ না হলে বিচ্ছেদ)।
  • ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকী উসমানী): ২/৩৩০-৩৩৩ (কারাগারের অবস্থা)।
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী): ৪/২৪২-২৪৬ (সাধারণ বিচ্ছেদের নীতি)।
  • বাহিশতি জেওর: বিবাহ অধ্যায় (স্ত্রীর অধিকার ও বিচ্ছেদের শর্ত)।

৬. জবাবের শেষ কথা

প্রশ্নে উল্লিখিত মতটি (স্ত্রী কখনো বিচ্ছেদ পাবেন না) হানাফি ফিকহের দৃষ্টিতে সঠিক নয়। বরং হানাফি ইমামগণ স্বামীর দীর্ঘমেয়াদি অনুপস্থিতি (কারাগারসহ) ও নাফাকা ও যৌন অধিকার পূরণে ব্যর্থতাকে বিচ্ছেদের বৈধ কারণ বলে গণ্য করেছেন। তবে স্ত্রীকে অবশ্যই ইসলামি আদালত বা কাজীর মাধ্যমে বিচ্ছেদ সম্পন্ন করতে হবে, নিজে থেকে ফাসখ করতে পারবেন না।

আল্লাহ তাআলা সকল মুসলিম নারী-পুরুষকে ন্যায় ও ইনসাফের পথ প্রদর্শন করুন। আমীন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.