যারা নেক আমল করে গোনাহও করে তওবা না করে মারা গেলে কি শয়তানের সাথে হাশর হবে?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 2419
Questioner: Mohammad Saiful Islam
Question Asked: 07 Jul 2026, 08:20 PM
Reviewed & Published: 07 Jul 2026, 08:27 PM
Views: 63
Tokens: 5,231
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

১।সিগারেট পান করলে যে অবচয় হয় সয়তানের অনুসারী হবে এটা কি কোরআন হাদিসের আছে নাকি আলেমদের মত আর কোনো আলেম কি মত দিছেন যে গোনাহ হবে কিন্তু সয়তানের অনুসারী বা ভাই হবে না?

২।যারা নেক আমল করে গোনাহও করে তওবা না করে মারা গেলে কি সয়তানের সাথে হাসর হবে?

Answer

উত্তর

প্রশ্নটি দুটি অংশে বিভক্ত। নিচে প্রতিটি অংশের জবাব দেওয়া হলো কুরআন, হাদিস এবং হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাবের আলোকে।


১. সিগারেট পান ও শয়তানের অনুসারী হওয়া

প্রশ্নের সারমর্ম: সিগারেট পান করলে কি শয়তানের অনুসারী (অথবা ভাই) হওয়া যাবে? এটি কি কুরআন-হাদিসের নির্দেশ, নাকি শুধু আলেমদের অভিমত? কোনো আলেম কি বলেছেন যে এটি গুনাহ হবে, কিন্তু শয়তানের অনুসারী বা ভাই হবে না?

উত্তর:

ক. সিগারেট পান করা : শরয়ি বিধান

হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থসমূহে সিগারেট (তামাক) পান করাকে হারাম বা মাকরুহে তাহরিমি (অত্যন্ত নিকৃষ্ট ও নিষিদ্ধ) বলা হয়েছে। কারণ এটি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, সম্পদ নষ্ট করে এবং নেশার দিকে ধাবিত করে। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর নীতি অনুযায়ী, যে কোনো জিনিস যা অপকারী ও ধ্বংসাত্মক, তা নাজায়েয। (রদ্দুল মুহতার, ৬/৪৫৬; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৫৪; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২১৫)

মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) ও মুফতি তকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) স্পষ্টভাবে সিগারেট পান করাকে গুনাহ ও নাজায়েয বলেছেন। (আহকামুল কুরআন, ৩/৩১২; ফাতাওয়া উসমানি, ২/১৮০)

খ. শয়তানের অনুসারী বা ভাই হওয়া

(১) কুরআন ও হাদিসের দৃষ্টিকোণ:

কুরআনে বলা হয়েছে:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ وَمَن يَتَّبِعْ خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ فَإِنَّهُ يَأْمُرُ بِالْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। যে শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে, নিশ্চয় সে অশ্লীল ও মন্দ কাজের নির্দেশ দেয়।" (সূরা নূর, ২১)

এখানে শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ অর্থ তার প্ররোচনায় কোনো পাপ কাজ করা। সুতরাং সিগারেট পান করা একটি পাপ কাজ, তাই এটি শয়তানের অনুসরণ-এর অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু কুরআন বা সহিহ হাদিসে কোথাও বলা হয়নি যে সিগারেট পানকারী শয়তানের ভাই হয়ে যাবে। বরং শয়তানের ভাই বলতে বোঝানো হয় যারা শয়তানের আনুগত্যে লিপ্ত, যেমন আল্লাহর অবাধ্য ও কাফিরদের সম্পর্কে বলা হয়েছে: إِنَّ الشَّيْطَانَ كَانَ لِلْإِنسَانِ عَدُوًّا مُّبِينًا (শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু)। (সূরা ইউসুফ, ৫)

**(২) আলেমদের মত:

কতিপয় আলেম সিগারেটের ক্ষতি ও পাপাচার বোঝাতে বলেছেন: "সিগারেট পানকারী শয়তানের ভাই" - এটি একটি রূপক (মাজাজি) ভাষা, যা কুরআন ও হাদিসের আভিধানিক ব্যবহারের অনুকরণে বলা হয়। তবে এটি সহিহ হাদিস-এর কোনো বক্তব্য নয়। বরং এটি কোনো কোনো ফকিহ বা ওয়ায়েজের প্রচলিত কথা হতে পারে।

আবার অনেক আলেম (যেমন মুফতি তকি উসমানি) স্পষ্টভাবে বলেছেন: সিগারেট পান করা গুনাহ ও নাজায়েয, কিন্তু একে শয়তানের ভাই বলা অত্যুক্তি। বরং এটি একটি নাফরমানি ও শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণের অন্তর্ভুক্ত। (ইসলাহি খুতুবাত, ২/১৮৫)

সুতরাং প্রশ্নে উল্লেখিত "গুনাহ হবে কিন্তু শয়তানের অনুসারী বা ভাই হবে না" - এই মতটিও বৈধ, যদি কেউ সিগারেট পান করাকে শুধু গুনাহ মনে করে, তাকে শয়তানের ভাই আখ্যা না দেয়। তবে মোট কথা: এটি পাপ ও নাজায়েয। আর যে কোনো পাপ করতে গেলে শয়তানের প্ররোচনা কাজ করে, তাই তাকে শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণকারী বলা যায়। কিন্তু "ভাই" বলতে কুরআন-হাদিসে বোঝায় কাফির-মুশরিক বা চরম অন্যায়কারী (যেমন মদপায়ীদের সম্পর্কে হাদিসে এসেছে: 'মদপায়ী শয়তানের ভাই' - তবে এটি দুর্বল বা জাল বর্ণনা)। তাই এখানে সতর্ক থাকা উচিত।

সারসংক্ষেপ:

  • সিগারেট পান করা হারাম/গুনাহ (হানাফি মতে মাকরুহে তাহরিমি বা হারাম)।
  • এটি শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণের অন্তর্ভুক্ত, কিন্তু শয়তানের ভাই হওয়ার বিষয়টি সরাসরি কুরআন-হাদিসে নেই; এটি কোনো কোনো আলেমের প্রচলিত ভাষামাত্র।
  • অনেক আলেমই শুধু গুনাহ বলেছেন এবং সতর্ক করেছেন, অতি কঠোর ভাষা ব্যবহার থেকে বিরত থেকেছেন।

প্রাসঙ্গিক হাদিস (দুর্বল):
একটি হাদিসে বর্ণিত আছে: "مَنْ تَرَكَ الصَّلَاةَ فَهُوَ أَخُو الشَّيْطَانِ" (যে সালাত ত্যাগ করে, সে শয়তানের ভাই) - এটি সনদগতভাবে দুর্বল। সিগারেট সম্পর্কে তো কোনো হাদিসই নেই।


২. নেক আমলকারী কিন্তু তওবা না করে মারা গেলে কি শয়তানের সঙ্গে হাশর হবে?

প্রশ্নের সারমর্ম: যদি কেউ নেক আমল করে, অথচ গুনাহও করে, কিন্তু তওবা না করে মারা যায়, তাহলে কি কিয়ামতে তাকে শয়তানের সঙ্গে উঠানো হবে?

উত্তর:

এ বিষয়ে ইসলামী আকিদা স্পষ্ট:

ক. সাধারণ নীতি

কুরআনে আল্লাহ বলেন:

وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَىٰ
"কেউ অপরের বোঝা বহন করবে না।" (সূরা আনআম, ১৬৪)

প্রত্যেকে নিজ নিজ আমলের জন্য দায়ী। যারা ঈমান অবস্থায় কিছু নেক আমল ও কিছু গুনাহ করে মারা যায়, তাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত আল্লাহর ইচ্ছাধীন। আল্লাহ চাইলে গুনাহ মাফ করে দেবেন অথবা শাস্তি দিয়ে পরে জান্নাতে পাঠাবেন। (সূরা নিসা, ৪৮; সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৪০৪)

খ. শয়তানের সঙ্গে হাশর হওয়া

শয়তানের সঙ্গে হাশর বলতে বোঝায়, কিয়ামতের দিন শয়তানের দলভুক্ত হয়ে উঠা, অর্থাৎ কাফির ও চিরবিদ্রোহীদের সঙ্গে গণ্য হওয়া। এটি কেবল তাদের জন্যই প্রযোজ্য যারা শয়তানের আনুগত্যে জীবন কাটিয়েছে এবং ঈমান ছাড়াই মৃত্যুবরণ করেছে (অর্থাৎ কাফির বা মুনাফিক)।

আল্লাহ বলেন:

وَمَن يَعْشُ عَن ذِكْرِ الرَّحْمَـٰنِ نُقَيِّضْ لَهُ شَيْطَانًا فَهُوَ لَهُ قَرِينٌ
"যে ব্যক্তি রহমানের স্মরণ থেকে চোখ ফিরিয়ে নেয়, আমি তার জন্য এক শয়তান নিযুক্ত করি, যে তার সঙ্গী হয়।" (সূরা যুখরুফ, ৩৬)

এ আয়াত তাদের জন্য যারা আল্লাহকে অস্বীকার করে বা অবহেলা করে। তবে ঈমানদার গুনাহগার যদিও শয়তানের প্ররোচনায় পাপ করেছে, তবুও সে মুসলিম হিসেবে গণ্য হবে। কিয়ামতের দিন তাকে শয়তানের দলে নয়, বরং মুসলিমদের দলেই উঠানো হবে, যদিও তার হিসাব ভিন্ন হবে।

ইমাম তাহাবি (রহ.) তাঁর বিখ্যাত ‘আল-আকিদাতুত তাহাবিয়া’তে বলেন:
أَهْلُ الْكَبَائِرِ مِنْ أُمَّةِ مُحَمَّدٍ ﷺ لَا يُخَلَّدُونَ فِي النَّارِ
"মুহাম্মদ (সা.)-এর উম্মতের কবিরা গুনাহকারী চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে না।" (তাহাবি, ৫০)

আর যারা নেক আমল করে, তারা যদি ইমান অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, তাহলে তাদের জন্য জান্নাতের আশা আছে। তাদেরকে শয়তানের সঙ্গী করা হবে না। বরং শেষ পর্যন্ত তাদের নেক আমল তাদের রক্ষা করবে, ইনশাআল্লাহ।

গ. ফকিহদের বক্তব্য

হানাফি ফিকহের কিতাবে এসেছে: ঈমানদার ব্যক্তি যত বড় গুনাহই করুক না কেন, যদি তওবা না করে মারা যায়, তাহলে সে আল্লাহর ইচ্ছাধীন – তিনি চাইলে তাকে শাস্তি দেবেন অথবা দয়া করবেন। কিন্তু তাকে কাফির বা শয়তানের দলভুক্ত করা হবে না। (শরহুল আকাইদ, ২/২৮০; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/২৫০)

মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) ‘মাআরিফুল কুরআন’ (সূরা বাকারা, ২৮) তাফসিরে লেখেন:
ঈমানদার হয়ে গুনাহ করলে সে মুশরিক হয় না। কিয়ামতে তার হাশর মুসলিমদের সঙ্গে হবে এবং তার নেক আমল তার পক্ষে সাক্ষ্য দেবে। (মাআরিফুল কুরআন, ১/১৪৫)

ঘ. সতর্কতা

তবে গুনাহ করতে করতে মৃত্যুবরণ করা খুবই ভয়ংকর। যদি ঈমান নষ্ট না করে, তবুও পার্থিব শাস্তি ও তিরস্কারের ভয় থাকে। তাই প্রতিটি মুসলিমের উচিত তওবা করা ও গুনাহ থেকে ফিরে আসা। আল্লাহ বলেন:

إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَاءُ
"নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরিক করাকে ক্ষমা করেন না, এবং তা ছাড়া অন্যগুলো যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।" (সূরা নিসা, ৪৮)

উপসংহার:

  • যে ব্যক্তি নেক আমল ও গুনাহ উভয় করত এবং তওবা না করে মারা গেছে, সে যদি ঈমানদার হয়ে থাকে, তবে তাকে শয়তানের সঙ্গে হাশর করা হবে না। বরং তার হাশর মুসলিমদের সঙ্গে হবে এবং তার নেক আমলের কারণে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করতে পারেন অথবা (গুনাহের কারণে) সাময়িক শাস্তি দিয়ে জান্নাতে পাঠাবেন।
  • শয়তানের সঙ্গে হাশর কেবল তাদের জন্য যারা শয়তানকে অভিভাবক বানিয়ে নিয়েছে এবং ঈমান ছাড়া মৃত্যুবরণ করছে (কাফির ও মুনাফিক)।

সর্বোত্তম জ্ঞান আল্লাহর কাছেই।


প্রাসঙ্গিক তথ্য

  • হানাফি কিতাব: রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন), আল-হিদায়া, ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ফাতাওয়া উসমানি, ইমদাদুল ফাতাওয়া, মাআরিফুল কুরআন, বেহেশতি জেওর।
  • মতামত: ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মুহাম্মদ, ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম তাহাবি, ইবনে আবিদিন, আশরাফ আলী থানভি, মুফতি মুহাম্মদ শফি, মুফতি তকি উসমানি।

আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করুন এবং সঠিক পথে পরিচালিত করুন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.