হাদীসে ‘সুর করে কুরআন পড়া’র অর্থ ও কণ্ঠসুন্দর নয় এমন ব্যক্তির বিধান।
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
(সহীহ : বুখারী ৭৫২৭, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ২১০৪৬.মিশকাত ২১৯৪ এই হাদিস নিয়ে ক ও খ আকারে প্রশ্ন করা হলো
ক)উপরের হাদিসে সুর বলতে কি বুঝানো হয়েছে
খ) যাদের কন্ঠ সুন্দর না তাদের কি হবে তারাতো আর ইচ্ছে করে কন্ঠ নেয়নি আল্লাহ পাক দিয়েছে ন।
Answer
উত্তর: হাদীসে ‘সুর’ অর্থ ও কণ্ঠসুন্দর নয় এমন ব্যক্তির বিধান
প্রশ্নে উল্লেখিত হাদীসটি হলো:
আবূ হুরায়রা (রাযি.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন: “যে ব্যক্তি সুর করে কুরআন পড়ে না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।”
(সহীহ বুখারী: ৭৫২৭, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী: ২১০৪৬, মিশকাত: ২১৯৪)
এই হাদীসের ব্যাখ্যা ও প্রাসঙ্গিক উত্তর নিম্নরূপ:
(ক) হাদীসে ‘সুর’ বলতে কী বুঝানো হয়েছে?
হাদীসের ‘সুর’ (صوت) শব্দটি দ্বারা উদ্দেশ্য হলো কুরআনকে সুন্দর কণ্ঠে, তারতীল ও তাজবীদের সাথে এবং অর্থ বুঝে পড়া। এটি কেবল গান বা বাদ্যযন্ত্রের মতো সুর করা নয়; বরং এমন সুরে পড়া যা কুরআনের মর্যাদা ও মাধুর্য ফুটিয়ে তোলে এবং শ্রোতার অন্তরে প্রভাব সৃষ্টি করে।
বিখ্যাত হানাফী ফকীহ ইমাম ইবনু আবিদীন (রহ.) তাঁর ফতোয়ায় উল্লেখ করেছেন:
“কুরআনকে সুন্দর সুরে পড়া মুস্তাহাব (পছন্দনীয়), তবে তা যেন তাজবীদ ও তারতীলের সীমা অতিক্রম না করে এবং গান-বাদ্যের মতো না হয়।” (রদ্দুল মুহতার: ১/৫৪৭)
এছাড়া হাদীসের ব্যাখ্যায় ইমাম নববী (রহ.) বলেন:
“সুন্দর কণ্ঠে কুরআন পড়া উদ্দেশ্য, যা কুরআনের মর্যাদা বৃদ্ধি করে এবং মনোযোগ আকর্ষণ করে।” (শারহুন নববী আলা মুসলিম: ৬/১১৩)
(খ) যাদের কণ্ঠ সুন্দর নয়, তাদের কী হবে?
যাদের কণ্ঠ স্বাভাবিকভাবে সুন্দর নয়, তারা ইচ্ছাকৃতভাবে কণ্ঠকে বিকৃত করবেন না। বরং সাধ্যমতো কুরআনকে সুন্দরভাবে পড়ার চেষ্টা করবেন। হাদীসের মূল উদ্দেশ্য হলো:
- কুরআনকে উপেক্ষা না করা: যে ব্যক্তি কুরআনকে অবহেলা করে বা খুব দ্রুত ও অর্থ না বুঝে পড়ে, তার জন্য হাদীসটি সতর্কবাণী।
- সাধ্যমতো চেষ্টা করা: রাসূল (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি কুরআন পড়তে পারে না, কিন্তু শিখতে আগ্রহী, তার জন্যও দ্বিগুণ সওয়াব আছে।” (সহীহ বুখারী: ৪৯৩৭)
ইমাম ত্বাহাবী (রহ.) বলেন:
“কুরআনকে সুন্দর সুরে পড়া হলো তারতীলের সাথে পড়া। যার কণ্ঠ সুন্দর নয়, সে যদি তারতীল ও তাজবীদ মেনে পড়ে, তবে সে এই হাদীসের আওতায় পড়বে না।” (শারহু মাআনিল আসার: ২/৬৭)
সুতরাং, আল্লাহ প্রদত্ত কণ্ঠ নিয়ে লজ্জিত না হয়ে বরং সস্নেহে ও আদর করে কুরআন পড়া জরুরি। হাদীসের বক্তব্য হলো: যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কুরআনকে সুন্দর সুরে না পড়ে তিরস্কার করে বা অবহেলা করে, তার জন্য হুঁশিয়ারি। কিন্তু যার কণ্ঠ স্বাভাবিকভাবে সুন্দর নয়, তার জন্য কোনো দোষ নেই।
সারসংক্ষেপ:
- ‘সুর’: কুরআনকে তাজবীদ ও অর্থবোধ সহকারে সুন্দর কণ্ঠে পড়া।
- কণ্ঠ সুন্দর না হলে: সাধ্যমতো চেষ্টা করবে; আল্লাহ তার নিয়ত দেখবেন। হাদীসটি ইচ্ছাকৃত অবহেলাকারীদের জন্য।
তথ্যসূত্র:
- সহীহ বুখারী: ৭৫২৭
- রদ্দুল মুহতার: ১/৫৪৭
- শারহু মাআনিল আসার: ২/৬৭
- ইমদাদুল ফাতাওয়া: ১/২৮৬
- ফাতাওয়া উসমানী: ১/৫৪
- বাহিশতী জেওর: ১/১৪২
- মাআরিফুল কুরআন: ১/২৬-২৭