ঝগড়ার সময় স্ত্রীকে স্বামী যদি বলে আমি চলে যাচ্ছি বিদেশ তুমাকে ছেড়ে, তাহলে কি তালাক হবে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
এটা তালাকের উদ্দেশ্য ছাড়া মানে তালাক দিয়ে বিদেশে যাচ্ছে না বুঝালে কি তালাক হয়?
২.স্বামী যদি বলে ওই কাজ করলে আমি তুমাকে ছেড়ে দূরে চলে যাব।এটা তালাকের উদ্দেশ্য ছাড়া বললে কি তালাক হয়?
৩। উপরের কথা কোন স্বামী যদি বলে থাকে কিন্তু স্বামী যদি এমনিতে বলে এ কথার জন্য না এমনিতে তালাকের নিয়তে কোনদিন কিছু বলে নি,তহ স্ত্রীর ও যদি মনে হয় এমন কিছু বলেছে কিনা আর বললেও হয়ত তালাকের উদ্দেশ্য বা ওইভাবে বুঝায় নি।তাহলে কি ওই বিষয়ে আর জিজ্ঞেস না করে সংসার করতে পারে?যদি ওল্টা পাল্টা বলার মত সম্ভাবনা থাকে?
Answer
উত্তর প্রদানে হানাফি মাযহাবের মূলনীতি:
তালাকের ক্ষেত্রে হানাফি মাযহাবের নীতিমালা অনুযায়ী, শুধুমাত্র স্পষ্ট (সরীহ) তালাকের শব্দ উচ্চারণ করলেই নিয়তের প্রয়োজন নেই; কিন্তু কিনায়া (ইঙ্গিতমূলক) শব্দের ক্ষেত্রে তালাকের নিয়ত অপরিহার্য। প্রশ্নে উল্লেখিত বাক্যগুলো কিনায়া শব্দের অন্তর্ভুক্ত। নিচে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর কুরআন, হাদিস ও হানাফি ফিকহের কিতাবের আলোকে দেওয়া হলো।
প্রথম প্রশ্ন:
"আমি চলে যাচ্ছি বিদেশ, তোমাকে ছেড়ে" – এই বাক্যটি যদি শুধুমাত্র দেশত্যাগের অর্থে বলা হয় এবং তালাকের কোনো নিয়ত না থাকে, তাহলে তালাক হবে না।
দলিল:
- হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার (৩/২৫২)-এ উল্লেখ আছে, “কিনায়া শব্দের মাধ্যমে তালাক কার্যকর হতে হলে তালাকের নিয়ত অপরিহার্য; অন্যথায় তা তালাক নয়।”
- ফতোয়া হিন্দিয়া (১/৩৭১)-এ বলা হয়েছে, “যদি স্বামী ‘তোমাকে ছেড়ে যাচ্ছি’ বলে, কিন্তু তালাকের নিয়ত না থাকে, তাহলে তা তালাক গণ্য হবে না।”
অতএব, স্বামী যদি শুধু রাগের বশে বা ঝগড়ার সময় দেশত্যাগের কথা বলে থাকে, তবে তা তালাক নয়।
দ্বিতীয় প্রশ্ন:
"ওই কাজ করলে আমি তোমাকে ছেড়ে দূরে চলে যাব" – এটি একটি শর্তসাপেক্ষ বাক্য। শর্ত পূরণ হলেও, যদি স্বামীর তালাকের নিয়ত না থাকে, তাহলে তালাক হবে না।
দলিল:
- ফতোয়া উসমানি (২/৪৫৩)-এ বলা হয়েছে, “শর্তসাপেক্ষ তালাকের ক্ষেত্রে শর্ত পূরণের সময় স্বামীর নিয়ত বিবেচ্য নয়; বরং শর্তসাপেক্ষ বাক্যটি যদি তালাকের নিয়তে বলা হয়, তাহলে তালাক হবে। আর যদি তা হুমকি, শপথ বা ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে হয়, তাহলে তালাক হবে না।”
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/২১৪)-এ এসেছে, “যে বাক্যে ‘ছেড়ে চলে যাওয়া’ বলা হয়, তা যদি তালাক না বুঝায় এবং স্বামী তালাকের নিয়ত না করে, তবে কেবল শব্দের কারণে তালাক হয় না।”
অতএব, স্বামী যদি এ কথা শুধু হুমকি বা নিষেধ করার জন্য বলে থাকে, তাহলে তা তালাক নয়।
তৃতীয় প্রশ্ন:
যদি স্বামী উপরোক্ত কথাগুলো বলে থাকে, কিন্তু তাঁর তালাকের কোনো নিয়ত নেই এবং স্ত্রীও বিষয়টি সম্পর্কে নিশ্চিত নন (যেমন, মনে করেন যে হয়তো স্বামী তালাকের উদ্দেশ্যে বলেননি), তাহলে তারা বিষয়টি খোঁজ-খবর না করেই সংসার চালিয়ে যেতে পারেন।
দলিল:
- বাহিশতি জেওর (৬/১২৬)-এ উল্লেখ আছে, “তালাকের বিষয়ে সন্দেহ থাকলে বা স্বামী যদি তালাকের নিয়ত অস্বীকার করে, তবে মূলনীতি হলো তালাক না হওয়া। যতক্ষণ পর্যন্ত তালাকের ঘটনা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত না হবে, ততক্ষণ বিবাহ বহাল থাকবে।”
- আল-হিদায়া (২/৩৮৪)-তে বলা হয়েছে, “তালাকের শব্দ সন্দেহজনক হলে এবং স্বামী তালাকের নিয়ত অস্বীকার করলে, তাঁর কথাকে প্রাধান্য দেওয়া হবে, কারণ আসল হলো বিবাহের অস্তিত্ব।”
- ফতোয়া উসমানি (৩/৫২)-এ এসেছে, “স্বামী যদি বলে ‘আমি তালাকের নিয়তে এ কথা বলিনি’, তাহলে তা গ্রহণযোগ্য, এবং স্ত্রীর জন্য প্রশ্ন করা জরুরি নয়।”
তবে, যদি স্ত্রীর মনে উল্টাপাল্টা বলার মতো বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় বা সম্পর্কের মধ্যে অস্থিরতা দেখা দেয়, তবে উভয়ের উচিত একজন বিশ্বস্ত আলেমের কাছে বিষয়টি পরিষ্কার করে নেওয়া। কিন্তু শরিয়তের দৃষ্টিতে কেবল সন্দেহের ভিত্তিতে তালাক সাব্যস্ত হয় না।
সারসংক্ষেপ:
১. “তোমাকে ছেড়ে বিদেশ চলে যাচ্ছি” – তালাকের নিয়ত না থাকলে তালাক নয়।
২. “ওই কাজ করলে তোমাকে ছেড়ে দূরে চলে যাব” – হুমকি বা নিষেধের জন্য বললে তালাক নয়।
৩. স্বামী যদি তালাকের নিয়ত অস্বীকার করে এবং স্ত্রী নিশ্চিত না হন, তাহলে সংসার চালিয়ে যাওয়া জায়েজ।
শেষ পরামর্শ: বিষয়টি যদি বারবার ঘটে বা সম্পর্কে জটিলতা সৃষ্টি করে, তবে নির্দিষ্ট প্রসঙ্গ ও নিয়ত স্পষ্ট করার জন্য একজন অভিজ্ঞ মুফতি বা আলেমের শরণাপন্ন হওয়া উত্তম।
الله أعلم بالصواب