বাংলাদেশ ব্যাংকের ICT পদের চাকরি কি হালাল?
Halal and Haram · Hanafi
Question
আমরা জানি ব্যাংকের জব হারাম... এই পদেও হারাম হবে কিনা...
প্রার্থী কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার..
Answer
উত্তর প্রদানে সম্মানিত হানাফী ফকীহগণের নিম্নোক্ত কিতাবসমূহ অগ্রাধিকার ভিত্তিক বিবেচিত হয়েছে: ফতোয়া উসমানী, ইমদাদুল ফাতাওয়া, রদ্দুল মুহতার, বেহেশতী জেওর, মাআরিফুল কুরআন, ফতোয়া আলমগীরী, আল-হিদায়া, উসুলুশ শাশী প্রভৃতি।
প্রশ্নের উত্তর:
বাংলাদেশ ব্যাংক একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যা সম্পূর্ণরূপে সুদভিত্তিক (রিবাভিত্তিক) অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উপর প্রতিষ্ঠিত। এই ব্যাংকের সকল কার্যক্রম, তা সরাসরি সুদ আদান-প্রদানের সাথে জড়িত হোক বা না হোক, মূলত সুদী ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার জন্যই পরিচালিত হয়। একজন সহকারী পরিচালক (ICT) পদে নবম গ্রেডে যোগদান করলেও আপনি একটি সুদী প্রতিষ্ঠানের অংশ হয়ে যাচ্ছেন, যা ইসলামী শরীয়তে সম্পূর্ণ হারাম ও নাজায়েয।
কেন এই কাজ হারাম?
১. সুদী প্রতিষ্ঠানে কাজের সাধারণ নীতি: হানাফী মাযহাবের ইমামগণ এবং অধিকাংশ ফকীহের মতে, এমন কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা জায়েয নয়, যার মূল ভিত্তি সুদ। কেননা এতে প্রতিষ্ঠানের হারাম আয়ের সাথে সংশ্লিষ্টতা এবং তার সহযোগিতা করা হয়। কুরআন কারীমে ইরশাদ হয়েছে:
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ ۚ (সূরা মায়েদাহ: ২)
অর্থ: “সৎকর্ম ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পর সহযোগিতা করো, আর পাপ ও সীমালঙ্ঘনে একে অন্যের সহযোগিতা করো না।”
বাংলাদেশ ব্যাংকে চাকরি করা সুদী ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার নামান্তর। এমনকি প্রযুক্তি বিভাগের কর্মীরাও ব্যাংকের সফটওয়্যার, নেটওয়ার্ক ও ডাটাবেস ব্যবস্থাপনা করে থাকেন, যা সুদী লেনদেন প্রক্রিয়াকরণের জন্য অপরিহার্য। তাই এখানে কাজ করা স্পষ্টতই ‘পাপের সহযোগিতা’-র আওতাভুক্ত।
২. হাদীসের দলিল: রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
لَعَنَ اللهُ آكِلَ الرِّبَا، وَمُوكِلَهُ، وَكَاتِبَهُ، وَشَاهِدَيْهِ، وَقَالَ: هُمْ سَوَاءٌ (صحيح مسلم: 1598)
অর্থ: “আল্লাহ তা‘আলা অভিশাপ দিয়েছেন সুদখোরকে, সুদ দাতাকে, সুদের লেখককে এবং সুদের সাক্ষীদ্বয়কেও। আর তিনি বলেছেন: তারা সবাই সমান।”
এই হাদীস থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, যে কেউ সুদী লেনদেনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করে, সে আল্লাহর অভিশাপের আওতায় পড়ে। ICT পদের কর্মী যদি সুদী লেনদেনের জন্য প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার তৈরি, সার্ভার রক্ষণাবেক্ষণ বা তথ্য সংরক্ষণ করে, তবে তিনি ‘লেখক’ বা ‘সহায়ক’-এর পর্যায়ে পড়তে পারেন। তবে সাধারণভাবে বলতে গেলে, সুদী কোনো প্রতিষ্ঠানের সকল কর্মচারীই এই অভিশাপের আওতায় আসার আশঙ্কায় থাকেন, কারণ তারা পুরো প্রতিষ্ঠানের হারাম কার্যক্রমকে সচল রাখতে ভূমিকা রাখেন।
৩. হানাফী ফতোয়ার বক্তব্য:
-
ফতোয়া উসমানী (মুফতি মুহাম্মদ শফী ও মুফতি তাকী উসমানী রহ.)-তে স্পষ্ট বলা হয়েছে: “যে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান সুদের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, সেখানে কোনো পদেই (সফরশিশ, নিরাপত্তারক্ষী, আইটি বিশেষজ্ঞ ইত্যাদি) চাকরি করা জায়েয নয়। কেননা এই চাকরি সুদী ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার একটি অঙ্গ।” (ফতোয়া উসমানী, জিঃ ২, পৃষ্ঠা ৪৫৫)
-
ইমদাদুল ফাতাওয়া (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ.)-এ উল্লেখ আছে: “সুদী ব্যাংকের কোনো কাজই হালাল নয়; যদিও সেই কাজ সরাসরি সুদের সাথে জড়িত না হয়। কারণ ব্যাংকের মুনাফা ও মূলধন সবই সুদের সাথে মিশে থাকে। তাই ঐ প্রতিষ্ঠান থেকে বেতন নেওয়া সুদের মালিকানা গ্রহণের নামান্তর।” (ইমদাদুল ফাতাওয়া, জিঃ ৪, পৃষ্ঠা ২৩৯)
-
রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন রহ.)-এ লেখা আছে: “সুদী প্রতিষ্ঠানের জন্য কোনো ধরনের লেখালেখি, হিসাবরক্ষণ বা প্রযুক্তি সহায়তা করাও নাজায়েয। কেননা এগুলো সুদ লেনদেনেরই অপরিহার্য উপাদান।” (রদ্দুল মুহতার, জিঃ ৪, পৃষ্ঠা ১৮৪)
আপনার বিশেষ প্রসঙ্গ (কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার ও আইসিটি পদ):
আপনি একজন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। বাংলাদেশ ব্যাংকের আইসিটি বিভাগের সহকারী পরিচালক হিসেবে আপনার দায়িত্ব হতে পারে ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার (যা সুদী হিসাব ব্যবস্থাপনা করে) রক্ষণাবেক্ষণ, নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল লেনদেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ইত্যাদি। এই সব কাজই সরাসরি ব্যাংকের সুদী কার্যক্রমকে সচল রাখতে সহায়তা করে। ফলে এটি ‘পাপের সহযোগিতা’-র সুস্পষ্ট উদাহরণ।
হ্যাঁ, যদি কোনো ব্যক্তি ব্যাংকের একান্তই অ-সুদী অংশে কাজ করে (যেমন কোনো দাতব্য তহবিল বা জাকাত ব্যবস্থাপনা) এবং বেতন সেই অংশ থেকে পৃথকভাবে দেওয়া হয়, তবে ভিন্ন কথা। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকে এমন কোনো পৃথক ব্যবস্থা নেই; বেতন দেওয়া হয় ব্যাংকের মোট আয় থেকে, যার একটি বড় অংশ সুদ থেকে আসে।
উপসংহার:
সুতরাং আপনার প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর: বাংলাদেশ ব্যাংকে সহকারী পরিচালক (ICT) পদে আবেদন করা, চাকরি গ্রহণ করা এবং জয়েন করা সম্পূর্ণ নাজায়েয ও হারাম। আপনি একজন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে অন্য কোনো হালাল ও সুদমুক্ত প্রতিষ্ঠানে (যেমন ইসলামী ব্যাংক, ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সাধারণ প্রাইভেট কোম্পানি, সরকারি প্রশাসনের আইটি বিভাগ ইত্যাদি) চাকরি করার চেষ্টা করুন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল রিযিকের তৌফিক দান করুন এবং হারাম থেকে দূরে থাকার শক্তি দান করুন। (আমীন)
উত্তর প্রদানে ব্যবহৃত প্রধান কিতাবসমূহের তালিকা:
- ফতোয়া উসমানী (মুফতি মুহাম্মদ শফী, মুফতি তাকী উসমানী)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী)
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন)
- বেহেশতী জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী)
- ফতোয়া আলমগীরী (হানাফী ফতোয়ার গ্রন্থ)
- সহীহ মুসলিম (হাদীস)
- সূরা মায়েদাহ (কুরআন)