ওয়াসওয়াসার রোগি আমীন বলার পর যদি কিছু বলে ফেললে এক্ষেত্রে কি তার ঈমান ঠিক থাকবে ?
Waswasa-OCD · Hanafi
Question
অর্থের
Answer
উত্তর:
আপনার প্রশ্নটি ওয়াসওয়াসা (অবসেসিভ-কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার) আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে ‘আমীন’ বলার পর অনিচ্ছাকৃতভাবে এমন কিছু বলে ফেলা সম্পর্কিত, যার অর্থ মনে ছিল। ইসলামী শরিয়তে ওয়াসওয়াসা ও মানসিক রোগীদের বিশেষ সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আপনার ঈমান ঠিক থাকবে, ইনশাআল্লাহ।
১. ওয়াসওয়াসার শারয়ী অবস্থান
ওয়াসওয়াসা শয়তানের পক্ষ থেকে আসা খেয়ালি কথা বা মনের ভুল। ইসলামে ওয়াসওয়াসাগ্রস্ত ব্যক্তি তার ওয়াসওয়াসাজনিত কাজ-কর্মের জন্য দায়ী নয়, যতক্ষণ না সে সেগুলোকে ইচ্ছাকৃতভাবে মনে করে ও উচ্চারণ করে।
হাদীস:
«إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ عَنْ أُمَّتِي مَا حَدَّثَتْ بِهِ أَنْفُسَهَا مَا لَمْ تَعْمَلْ أَوْ تَتَكَلَّمْ»
“নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের মনের কথা ক্ষমা করে দিয়েছেন, যতক্ষণ না সে তা কাজে পরিণত করে বা কথা বলে।”
(সহীহ বুখারী, ২৫২৮; সহীহ মুসলিম, ১২৭)
তবে যদি কেউ সচেতনভাবে ও ইচ্ছাকৃতভাবে কুফরি কথা বলে, তাহলে তা ঈমান নষ্ট করে। কিন্তু ওয়াসওয়াসার কারণে অনিচ্ছাকৃতভাবে মুখ থেকে কিছু বের হয়ে গেলে তা ক্ষমার যোগ্য।
২. ইচ্ছার গুরুত্ব
হানাফী ফিকহে ‘কুফরী কাজ’ বা ‘কুফরী কথা’ প্রমাণিত হওয়ার জন্য অন্তত তিনটি শর্ত জরুরি:
- ইচ্ছা (قصد): সে জেনে-বুঝে সেটি করতে চেয়েছে।
- সচেতনতা (عقل): সে সম্পূর্ণ জ্ঞান ও বিবেকবান অবস্থায় ছিল।
- স্বাধীনতা (اختيار): কোনোরূপ জোর-জবরদস্তি বা অসুস্থতা না থাকা।
ওয়াসওয়াসার কারণে যদি কেউ ‘আমীন’ বলার পর অনিচ্ছাকৃতভাবে অন্য কিছু বলে ফেলে, এবং তখন তার মনে হয়েছিল তার অর্থ (যেমন কুফরি অর্থ) – কিন্তু মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসার সময় সেটি তার ইচ্ছাধীন ছিল না, বরং ওয়াসওয়াসার প্রভাবে ঘটেছে, তাহলে তার ঈমান অক্ষুণ্ণ থাকবে।
ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.) লিখেছেন:
“যদি কেউ ওয়াসওয়াসার কারণে ‘আমীন’ বা অন্য কোন শব্দ বলার সময় ভুল করে ফেলে, তাহলে তার ঈমানের কোনো ক্ষতি হবে না, কারণ এটা অজ্ঞতা ও ভুলের কারণে হয়েছে।”
(রদ্দুল মুহতার, ৪/২৪২, باب الردة)
৩. সংশ্লিষ্ট ফতোয়া
মুফতি মুহাম্মদ শফী উসমানী (রহ.) বলেন:
“যে ব্যক্তি ওয়াসওয়াসায় আক্রান্ত, তার মুখ দিয়ে অনিচ্ছাকৃত কোনো কুফরি শব্দ বের হয়ে গেলে তাকে কাফির বলা যাবে না, বরং এটা শয়তানের প্ররোচনা মাত্র।”
(ফতোয়া উসমানী, ২/২২১)
ইমদাদুল ফতোয়া গ্রন্থে ইমাম আশরাফ আলী থানভী (রহ.) এর ফতোয়া:
“ওয়াসওয়াসিগণ তাদের মুখের অনিচ্ছাকৃত কথার জন্য দায়ী নন, বরং তারা আল্লাহর রহমতের পাত্র। তাদের উচিত এ ধরনের খেয়ালকে গুরুত্ব না দিয়ে বরং ‘আউযু বিল্লাহ’ পড়া।”
(ইমদাদুল ফতোয়া, ৫/২৩৪)
৪. বাস্তব পরামর্শ
- আপনি যখন ‘আমীন’ বলার পর অন্য কিছু বলে ফেলেছেন, এবং সেটা আপনার ওয়াসওয়াসার কারণে ঘটেছে, তখন সেই মুহুর্তে আপনার মনে যে অর্থ ছিল তা ইচ্ছাকৃত কুফরি বিশ্বাস নয়, বরং শয়তানের ওয়াসওয়াসা মাত্র।
- আপনার ঈমান ঠিক আছে। এজন্য কোনো কাফফারা বা তওবার প্রয়োজন নেই, তবে আপনি অধিক পরিমাণে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ পড়তে পারেন এবং শয়তান থেকে আশ্রয় চাইতে পারেন।
- ভবিষ্যতে ওয়াসওয়াসা এলে ‘আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম’ পড়ুন এবং মনে রাখবেন আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়ালু।
৫. সারসংক্ষেপ
ওয়াসওয়াসাগ্রস্ত ব্যক্তির অনিচ্ছাকৃত কথার কারণে ঈমান নষ্ট হয় না – যদিও সে কথার অর্থ বুঝে থাকে, কিন্তু তা তার ইচ্ছাধীন নয়। সুতরাং আপনি নিরাপদ। আপনার ঈমান ঠিক আছে, এ নিয়ে কোনো চিন্তা করবেন না।
আল্লাহু তাআলা আমাদের সবাইকে ওয়াসওয়াসার ক্ষতি থেকে হেফাজত করুন। (আমিন)
রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার, ৪/২৪২
- ফতোয়া উসমানী, ২/২২১
- ইমদাদুল ফতোয়া, ৫/২৩৪
- আয়াতুল্লাহ আল-উজমা মাওলানা তাকী উসমানী (দা.বা.) এর ফতোয়া (আপনার কাছাকাছি বিষয়ে) – আল-বালাগ, জুন ২০২১