বাচ্চাকে কোলে নিয়ে সালাত আদায় করা কি জায়েজ?
Salah-Prayer · Hanafi
Question
আমার ৫ মাসের সন্তান কে কোলে নিয়ে কখনো করে সালাত আদায় করতে হয়,অথবা জায়নামাজের পাশে শোয়ারে রেখে সালাত আদায় করি।অনেক সময় বাচ্চাকে হাত ধরতে হয়,(যেমন সোজা করে দিলাম)
অর্থাৎ সালাতের মধ্যে থেকেও হুটহাট করে ওর দিকে মনোযোগ চলে যায়।এতে গুণাহ হয় কিনা আমি জানিনা।এভাবে বাচ্চাকে পাশে নিয়ে সালাত আদায় করা জায়েজ নাকি বাচ্চা কান্না করে না কী করে করুক তা না দেখে শুধু সালাতের দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত?
আর একটা প্রশ্ন হলো যোহরের ওয়াক্ত শুরু হয়েছে।আমি সালাত আদায় করিনি তখন ও।২/২.৩০ টার দিকে যদি বুঝতে পারি আমার হায়েয শুরু হয়েছে সেক্ষেত্রে কী আমাকে পরবর্তীতে ওই ওয়াক্ত কাযা তুলবে হবে?
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
নিম্নোক্ত প্রশ্নদ্বয়ের উত্তর কুরআন-সুন্নাহ ও হানাফী ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাবের আলোকে প্রদান করা হলো।
প্রশ্ন ১: বাচ্চাকে কোলে/পাশে রেখে সালাত আদায় ও মনোযোগ বিঘ্নিত হওয়া
উত্তর:
আপনার ৫ মাসের শিশুকে কোলে নিয়ে বা জায়নামাজের পাশে শুইয়ে রেখে সালাত আদায় করা জায়েজ (অনুমোদিত) এবং এতে কোনো গুনাহ নেই। বরং প্রয়োজনের তাগিদে এমন করা শ্রেয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজেও মসজিদে অবস্থানকালে তাঁর নাতনী উমামা বিনতে আবিল আস (রা.)-কে কোলে নিয়ে সালাত আদায় করেছেন। (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৫৯৯৬; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ৫৪২)
হানাফী ফিকহের বড় কিতাবগুলোতে বলা হয়েছে:
- যদি বাচ্চা বা শিশু পাক-পবিত্র হয় (নাজাসাতমুক্ত) এবং তাকে কোলে নেওয়া বা পাশে রাখায় সালাতের মধ্যে অধিক (আমলে কাসীর) না হয়, তাহলে তা মাকরূহ নয়; বরং জায়েজ। (রদ্দুল মুহতার, ২/৪৫৪; ফাতাওয়া উসমানী, ২/১০৪)
- সালাতরত অবস্থায় শিশুর দিকে মনোযোগ চলে যাওয়া যদি অনিচ্ছাকৃত হয় বা প্রয়োজনে হয়, তাহলে তা খুশু‘র পরিপন্থী হলেও সালাতের বৈধতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না। তবে সালাতের মধ্যে যথাসম্ভব আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ করার চেষ্টা করা কর্তব্য। (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ১/৪৫৫)
- যদি শিশু কান্না করে এবং তার সেবা-শুশ্রূষা না করলে কষ্ট হয়, তাহলে সেই কষ্ট দূর করার জন্য শিশুকে সামলানো অথবা পাশে রাখা উচিত। এতে সালাত ভঙ্গ হবে না, বরং তা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাত দ্বারা প্রমাণিত। (মা‘আরিফুল কুরআন, ২/৬১১)
সারমর্ম:
আপনার সন্তানকে কোলে নিয়ে বা পাশে রেখে সালাত পড়া জায়েজ এবং এতে গুনাহ নেই। সালাতের মধ্যে অল্প-স্বল্প নড়াচড়া (যেমন: শিশুকে সোজা করে দেওয়া) অথবা তার দিকে দৃষ্টি পড়া অনিচ্ছাকৃত হলে সালাতের কোনো ক্ষতি হয় না।
তবে চেষ্টা করবেন খুশু‘ (একাগ্রতা) বজায় রাখার। যদি শিশুটি অস্বস্তিকর অবস্থায় থাকে এবং আপনি তাকে না সামলালে বড় ধরনের ঝামেলা হয়, তাহলে শিশুকে সামলিয়ে সালাত আদায় করাই উত্তম।
প্রশ্ন ২: যোহরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার পর হায়েয শুরু হলে কি কাযা ওয়াজিব?
উত্তর:
আপনি জোহরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার পরও সালাত আদায় করেননি, এর মধ্যে আপনার হায়েয (মাসিক) শুরু হয়েছে। হানাফী মাযহাবের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী, এক্ষেত্রে জোহরের কাযা আদায় করতে হবে না। কারণ:
- হায়েয শুরু হওয়ার সাথে সাথে নামাজের ওয়াজিবিত্ব রহিত হয়ে যায়। ওয়াক্ত শুরু হলেও যতক্ষণ না আপনি নামাজ আদায় করেছেন, ততক্ষণ হায়েয এসে গেলে আপনার ওপর এখন কোনো নামাজ বাকি থাকল না। (ফাতাওয়া আলমগীরী, ১/৩৯; রদ্দুল মুহতার, ১/৩০৬)
- ইমাম আবু হানীফা (রহ.) ও তার শিষ্যদের মতে, হায়েযের আগে পর্যাপ্ত সময় থাকলেও যদি নামাজ না পড়া হয়, তার পর হায়েয শুরু হলে কাযা আবশ্যক নয়। কেননা হায়েয নামাজের ওয়াজিবকেই নাকচ করে দেয়। (তাহাবি, শারহু মা‘আনিল আসার, ১/২২৩; উসুলুশ শাশী, পৃষ্ঠা ২৪২)
- তবে যদি ইচ্ছাকৃতভাবে দেরি করে থাকেন (অলসতা বা গাফিলতির কারণে) তাহলে তাওবা করা ও ভবিষ্যতে নামাজ সময়মতো আদায়ের সংকল্প করা কর্তব্য। কিন্তু শুধু কাযা আদায় করা জরুরি নয়।
সারমর্ম:
২/২:৩০ টার দিকে যদি হায়েয শুরু হয়, তাহলে ওই যোহরের নামাজের কাযা আপনার ওপর নেই। ইনশাআল্লাহ আল্লাহ তাআলা আপনার কাজা ক্ষমা করে দেবেন।
উত্তর প্রদানে ব্যবহৃত কিতাবসমূহ:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন)
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি মুহাম্মদ তাকী উসমানী)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতি আশরাফ আলী থানভী)
- সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম
- আল-হিদায়া
- শারহু মা‘আনিল আসার (ইমাম তাহাবি)