মৃত ব্যক্তির নামে মিলাদ পড়ানো কি জায়েজ?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 2230
Questioner: Al shariya shawon
Question Asked: 02 Jul 2026, 06:29 PM
Reviewed & Published: 02 Jul 2026, 06:31 PM
Views: 145
Tokens: 6,884
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

মৃত ব্যক্তির মানে মসজিদে যে মিলাদ পরানু হয়
১.প্রথম এ খাবার দেয় নামাজ শেষে পরে হুজুর নাম গুনসা করে মসল্লিদের বলে ৩ বার কুলহু ৩ বার ফাতিয়া দুরুদ এস্তেগবার পরে সবাই মিলে দোয়া দরে এই কাজটা ইসলাম কতটুকো সমরথন করে ।কুরাআন ও সুন্না অনুসারে বলবেন ।যদি সাহাবিরা না করে থাকে তামলে এই আমল করার পিছে হাকিকত কি যুক্তি কি ।
২।আল্লাহ আল্লাহ জিকির এর প্রমান হিসাবে যে আয়াত এর কথা বলা হয় । কিন্তু এই আয়াত এর উপরে নবিজি ও সাহাবারা এইবাবে আমল করেছেন ।আয়াত দেখালেই তো হবে না এর উপরে নবিজি ও সাহাবারা কেমনে আমল করছে তাউ তো দেখতে হবে । কোনো আল্লাহওয়ালা আমল করলেয় তো তা দলিল হইয়া যাই না ।কোনো আকারির করলেও তো তা দলিল না

Answer

উত্তর:

প্রশ্নে বর্ণিত মৃত ব্যক্তির নামে মসজিদে খাবার দেওয়া, নামাজের পর নির্দিষ্ট করে ৩ বার কুলহু (সূরা ইখলাস), ৩ বার ফাতিহা, দুরুদ ও ইস্তিগফার পড়ে সম্মিলিত দোয়া করার পদ্ধতি—ইসলামী শরিয়তে এর কোনো ভিত্তি নেই। এটি একটি বিদ‘আত (নতুন আবিষ্কৃত পদ্ধতি) যা সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন ও উম্মাতের সালাফ (নেক পূর্বসূরি) থেকে প্রমাণিত নয়। কুরআন ও সুন্নাহে মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া, ইসালে সওয়াব (দান-সদকা, কুরআন তিলাওয়াত ইত্যাদি) করা জায়েয, তবে নির্দিষ্ট কোনো ফরম্যাট বা আয়োজন বাধ্যতামূলক বা সওয়াবের অংশ মনে করা বিদ‘আত।

১. মিলাদ ও খাবার সহ মৃতের নামে আয়োজন: শরিয়তের বিধান

  • কুরআন ও সুন্নার আলোকে: আল্লাহ তাআলা বলেন, «وَأَن لَّيْسَ لِلْإِنسَانِ إِلَّا مَا سَعَىٰ» (সূরা আন-নাজম: ৩৯) অর্থ: “এবং মানুষের জন্য তা-ই যা সে চেষ্টা করে।” মৃত ব্যক্তির জন্য জীবিতদের দোয়া ও দান-সদকা উপকারী, কিন্তু নির্দিষ্ট সংখ্যক তিলাওয়াত, খাবার বিতরণ এবং নামাজের পর নির্দিষ্ট দোয়ার পদ্ধতি সাহাবাদের যুগে ছিল না। ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.) বলেন, “মৃতের জন্য নির্দিষ্ট দিনে তিলাওয়াত বা দোয়ার আয়োজন করা বিদ‘আত।” (রদ্দুল মুহতার, ২/২৪২)

  • সাহাবিদের আমলের অনুপস্থিতি: হুজুর (সা.)-এর যুগে বা সাহাবাদের যুগে মৃত ব্যক্তির স্মরণে মসজিদে মিলাদ, খাবার ও নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে কুরআন তিলাওয়াতের কোনো নজির নেই। হাদিসে এসেছে, “যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনে এমন কোনো নতুন কাজ সৃষ্টি করে যা এতে নেই, তা প্রত্যাখ্যাত।” (বুখারী: ২৬৯৭, মুসলিম: ১৭১৮)

  • ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মত: তিনি সাধারণভাবে কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব মৃতের কাছে পৌঁছাতে বৈধ বলেছেন, তবে নির্দিষ্ট সংখ্যা, সময় ও পদ্ধতি বেঁধে দেওয়া অপছন্দ করেছেন। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/২৪০)

  • যুক্তি: যদি কোনো ‘আল্লাহওয়ালা’ বা বুজুর্গ ব্যক্তি এই কাজ করেন, তবে তাকে দলিল মনে করা যাবে না। কেননা ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) বলেছেন, “তুমি আমলের দিকে দৃষ্টি দাও, আমলকারীর দিকে নয়।” (শরহু উসূলিল ইতিকাদ: ১/২৫৭) শুধু কোনো ব্যক্তির আমল করা দ্বীনের দলিল নয়, বরং কুরআন ও সুন্নাহ এবং সাহাবাদের ইজমা (সম্মতি) দলিল।

২. “আল্লাহ আল্লাহ” জিকিরের প্রসঙ্গ

প্রশ্নে বলা হয়েছে, “আল্লাহ আল্লাহ” জিকিরের পক্ষে কিছু আয়াত পেশ করা হয়, কিন্তু তা শুধু আয়াত দেখানোর জন্য নয়, বরং নবী (সা.) ও সাহাবারা যেভাবে আমল করেছেন সেটাই দেখতে হবে।

  • সঠিক পদ্ধতি: কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, «يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اذْكُرُوا اللَّهَ ذِكْرًا كَثِيرًا» (সূরা আল-আহযাব: ৪১) অর্থ: “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করো।” তবে এই নির্দেশনার বাস্তবায়ন নবী (সা.) ও সাহাবারা কীভাবে করতেন তা দেখা জরুরি। সহিহ হাদিসে এসেছে, নবী (সা.) বিভিন্ন সময়ে তাসবিহ, তাহমিদ, তাকবির ও কালিমা তাইয়্যেবা জিকির করতেন, কিন্তু “আল্লাহ আল্লাহ” বলে একনাগাড়ে উচ্চস্বরে জিকির করা সাহাবাদের সাধারণ আমল ছিল না। ইবনে মাসউদ (রা.) বলেছেন, “তোমরা নতুন জিনিস সৃষ্টি করো না, বরং অনুসরণ করো।” (সুনানে দারেমি: ২১০)

  • হানাফি ফাতাওয়া: হানাফি ফিকাহে উচ্চস্বরে সম্মিলিত জিকিরকে কিছু শর্তে জায়েয বলা হয়েছে যদি তা বিদ‘আতের সীমা অতিক্রম না করে (যেমন মসজিদে নামাজের পর নিয়মিতভাবে নির্দিষ্ট কল্পে)। তবে ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) বলেন, “আল্লাহর জিকির নীরবে করাই উত্তম, কারণ তা রিয়া (প্রদর্শনেচ্ছা) থেকে দূরে।” (বাহরুর রায়েক, ১/৩৩৪)

  • সারকথা: শুধু কোনো আয়াতের সাধারণ অর্থ দিয়ে কোনো আমল সাব্যস্ত করা যায় না। বরং নবী (সা.) ও সাহাবাগণ যে পদ্ধতিতে আমল করেছেন সেটাই মান্য। তাই নির্দিষ্ট ফরম্যাটে “আল্লাহ আল্লাহ” জিকির করা সাহাবিদের আমল দ্বারা প্রমাণিত নয়।

উপসংহার

  1. প্রশ্নে বর্ণিত মসজিদে মৃতের নামে মিলাদ, খাবার ও নির্দিষ্ট নিয়মে তিলাওয়াত ও দোয়া—এটি বিদ‘আত। শরিয়তে এর অনুমোদন নেই। মৃতের জন্য দোয়া ও দান-সদকা করা যেতে পারে, তবে তাকে কোনো বিশেষ রীতি বা উৎসবে পরিণত করা ঠিক নয়।
  2. দ্বিতীয় প্রসঙ্গে, শুধু কোনো বুজুর্গের আমল দলিল নয়। দলিল হলো কুরআন ও সহিহ সুন্নাহ এবং সাহাবাদের ইজমা। তাই প্রশ্নকর্তার যুক্তি ‘সাহাবিরা না করলে তা দলিল নয়’—এটি সম্পূর্ণ সঠিক ও গ্রহণযোগ্য দৃষ্টিভঙ্গি।

হানাফি বিষয়সংশ্লিষ্ট কিতাবাদি: ফাতাওয়া উসমানী (২/২৪৩), ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/৩২০), বাহিশটি জেওর (খন্ড: ২, মৃতের আচার অধ্যায়), রদ্দুল মুহতার (২/২৪২), ফাতাওয়া হিন্দিয়া (১/২৩৯), শরহু মাআনিল আছার (ইমাম তাহাবি)।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সুন্নাহর ওপর আমল করার তাওফিক দান করুন।



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.