ব্যাংকে Fixed deposit করে রাখা টাকা দিয়ে বদলী হজ্জ করানো যাবে?
Hajj and Umrah · Hanafi
Question
উস্তায আমার আম্মুর ৬৫+ বয়স,,বেশির ভাগ সময় অসুস্থই থাকেন। উনার উপর হজ্জ ফরজ হয়েছে। এখন উনি সাহস করতে পারছেন না হজ্জ করতে,,আবার উনার মাহরামও রেডি নেই। উনি চাচ্ছেন তার জামাই( যার উপর হজ্জ ফরজ হয়নি) তাকে দিয়ে বদলী হজ্জ করাতে। যতটুকু জানি এমন ব্যক্তি দিয়ে হজ্জ করানো জায়েজ,,তবে উত্তম না।
এখন,,হজ্জে প্রেরণকারী,, ও বদলী হজ্জ করণেওয়ালার করণীয় কি??
জামাই যদি বদলী হজ্জ করেন সেক্ষেত্রে কি হজ্জ আদায় হয়ে যাবে?
জামাই কি সাওয়াব পাবে? গুনাহগার হবে কি বদলী হজ্জ করে দিলে?
আর আমার মা যে টাকা দিয়ে হজ্জ করতে চাচ্ছেন ঐ টাকা গুলো ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিট করা ছিলো। ৮ লাখ টাকা ছিলো,,যা সুদ এসেছিলো ঔ টাকাগুলো তুলে সংসারের খরচ বাবদ শেষ হয়ে গিয়েছে। এখন শুধু সেই মুলধন ৮ লাখ টাকাই আছে।
আমার প্রশ্ন হলো,,এই ৮ লাখ টাকা দিয়ে উনি কি বদলী হজ্জ করাতে পারবেন? এটা কি জায়েজ হবে??
আর একটা প্রশ্ন ছিলো উস্তায,,
ব্যাংকে চাকরী করতেন স্বামী,,অনেকদিন আগে মারা গিয়েছেন। তার পেনশন, রিটায়ার্ড এর টাকা দিয়ে সংসার চালান,,এমন আত্মীয় যদি দাওয়াত দেন,, দাওয়াত খাওয়া যাবে??
জামা কাপড়,,কিছু টাকা যদি হাদিয়া দেন এটা কি গ্রহণ করা যাবে??
যদি গ্রহণ করা না যায় সেক্ষেত্রে যিনি নিসাবের মালিক নন তাকে সেই হাদিয়া গুলো দিয়ে দিতে হবে?? স্বামী যদি নিসাবের মালিক না হন, তাকে কি এই হাদিয়ার টাকাটা দেয়া যাবে??
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নটি একাধিক মাসআলার সমন্বয়ে গঠিত। নিচে প্রতিটি অংশ হানাফি ফিকহের আলোকে উত্তর দেওয়া হলো।
১. বদলী হজ্জ করানো ও জামাইয়ের ভূমিকা
মায়ের অবস্থা: মা ৬৫+ বছর বয়সী, অধিকাংশ সময় অসুস্থ, হজ্জ করতে অক্ষম (শারীরিকভাবে সক্ষম নন) এবং তার মাহরামও তৈরি নেই। শরীয়তের দৃষ্টিতে, যদি কারো উপর হজ্জ ফরজ হওয়ার পর স্থায়ীভাবে অক্ষম হয়ে যায় (যেমন বার্ধক্য বা দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা), তাহলে তার পক্ষ থেকে বদলী হজ্জ করানো জায়েজ। আর মাহরাম না থাকা হজ্জের আবশ্যকতাকে মাফ করে না; বরং নারীদের জন্য মাহরামের উপস্থিতি শর্ত, তবে বদলী হজ্জের ক্ষেত্রে মাহরামের প্রয়োজন নেই, কারণ বদলীকারী নিজেই প্রতিনিধি হিসেবে যাবেন।
জামাই কর্তৃক বদলী হজ্জ: জামাই যদি নিজে হজ্জ ফরজ না হওয়া সত্ত্বেও মায়ের পক্ষ থেকে বদলী হজ্জ করেন, তাহলে তা জায়েজ।
ফলাফল:
- মায়ের হজ্জ আদায় হয়ে যাবে যদি বদলীকারী নিয়ত ও শর্ত পূরণ করে।
২. ব্যাংকের ফিক্সড ডিপোজিটের টাকা দিয়ে হজ্জ
টাকার উৎস: এই ৮ লাখ টাকা ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিট ছিল। এর উপর সুদ এসেছিল, যা তুলে সংসারে খরচ করা হয়েছে। এখন শুধু মূলধন ৮ লাখ টাকা অবশিষ্ট আছে।
হুকুম:
- মূলধনটি যদি বৈধ উপায়ে (যেমন স্বামীর পেনশন, রিটায়ারমেন্ট) জমা হয়, তাহলে তা দিয়ে হজ্জ করা জায়েজ। তবে যেহেতু এটি সুদযুক্ত অ্যাকাউন্টে ছিল এবং সুদ খরচ করা হয়েছে, সেজন্য তাওবাহ করা জরুরি। সুদ আলাদা করে ফেলার কোনো সুযোগ না থাকায়, মূলধনের উপর কোনো প্রভাব পড়বে না, ইনশাআল্লাহ।
- তবে যদি মূলধনটিও সুদের সাথে মিশে থাকে (যেমন, ব্যাংক সুদ যোগ করে দেয়), তাহলে মূলধনের একটি অংশ সুদও থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে মূলধনটিও সুদমুক্ত বলে গণ্য হবে না। কিন্তু যেহেতু সুদের টাকা সম্পূর্ণ খরচ হয়ে গেছে, এখন শুধু মুলধনটি আছে, যা আসলে মালিকের বৈধ সম্পদ। তাই এই টাকা দিয়ে হজ্জ করানো জায়েজ।
সতর্কতা: তবে উত্তম হলো, যদি সম্ভব হয়, এই টাকা দিয়ে হজ্জ না করে অন্য কোথাও থেকে হালাল টাকা দিয়ে হজ্জ করানো। কিন্তু যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে মূলধন দিয়ে হজ্জ করালে আদায় হবে এবং গুনাহ হবে না, ইনশাআল্লাহ। তবে সুদের গুনাহের জন্য তাওবাহ করতে হবে।
হানাফি কিতাবের দলিল:
- ফাতাওয়া শামী: "হারাম মাল দিয়ে হজ্জ করলে হজ্জ আদায় হয়, তবে গুনাহ হয়।"
- ফাতাওয়া উসমানী: "সুদের মাল দিয়ে হজ্জ করা মাকরূহ, তবে আদায় হয়ে যায়। তাওবাহ করতে হবে।"
৩. স্বামীর ব্যাংক পেনশন ও রিটায়ারমেন্টের টাকা
প্রসঙ্গ: স্বামী ব্যাংকে চাকরি করতেন (যা সাধারণত সুদী লেনদেনে জড়িত), মারা গেছেন। তার পেনশন ও রিটায়ারমেন্টের টাকা দিয়ে সংসার চলে।
হুকুম:
- ব্যাংকের চাকরি মূলত সুদী লেনদেনের সাথে জড়িত, যা শরীয়তে হারাম। তাই পেনশন ও রিটায়ারমেন্টের টাকাও হারামের অন্তর্ভুক্ত হবে যদি তা ব্যাংকের সুদী কার্যক্রম থেকে আসে। তবে যদি পেনশনটি সম্পূর্ণ হালাল উৎস থেকে হয় (যেমন ব্যাংকের অ-সুদী শাখায় চাকরি), তাহলে ভিন্ন কথা। কিন্তু সাধারণত ব্যাংকের সব লেনদেন সুদী, তাই পেনশনও হারাম বলে গণ্য হবে।
- এই টাকা দিয়ে দাওয়াত দেয়া হলে, তা খাওয়া জায়েজ নয় যদি জানা থাকে যে টাকা হারাম।
- জামা-কাপড় বা হাদিয়া হিসেবেও তা গ্রহণ করা জায়েজ নয়।
সমাধান:
- যে ব্যক্তি হারাম টাকা দিয়ে দাওয়াত দেয়, তার দাওয়াত গ্রহণ না করাই উত্তম। কিন্তু যদি তা গ্রহণ করে ফেলেন, তাহলে সেটি ত্যাগ করা ওয়াজিব।
- যদি কেউ হাদিয়া দেয় এবং তা হারাম হয়, তাহলে তা ফিরিয়ে দেওয়া বা সদকা করে দেওয়া জরুরি। তবে যিনি নিসাবের মালিক নন (অর্থাৎ যাকাতের নিসাব পূর্ণ হয় না) তাকে ফিরিয়ে দিলে চলবে না, বরং সদকা করে দিতে হবে।
- স্বামী যদি নিসাবের মালিক না হন, তাহলে তাকে এই হাদিয়ার টাকা দেওয়া জায়েজ নয়, কারণ তা হারাম সম্পদ। বরং তা আল্লাহর রাস্তায় দান করে দেওয়া উচিত।
হানাফি কিতাবের দলিল:
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (মাওলানা থানভী): "হারাম মাল খাওয়া বা গ্রহণ করা জায়েজ নয়।"
- ফাতাওয়া শামী: "হারাম মালের দাওয়াত গ্রহণ না করাই ভালো।"
- বেহেশতী জেওয়ার: "হারাম উপার্জনের টাকা কোনো প্রকার ব্যবহার করাই গুনাহ।"
সংক্ষিপ্ত জবাব
| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|--------| | জামাই বদলী হজ্জ করলে মায়ের হজ্জ হবে কি? | হ্যাঁ, হবে যদি নিয়ত সঠিক হয়। | | জামাই সওয়াব পাবে? | হ্যাঁ, আল্লাহর দয়ায় পাবে। গুনাহ হবে না। | | ৮ লাখ টাকা (মূলধন) দিয়ে বদলী হজ্জ জায়েজ? | জায়েজ, তবে তাওবাহ জরুরি। | | পেনশনের টাকার দাওয়াত খাওয়া জায়েজ? | না, জায়েজ নয়। | | হাদিয়া গ্রহণ? | না, গ্রহণ জায়েজ নয়। ফিরিয়ে দিন বা সদকা করুন। | | স্বামী নিসাবের মালিক না হলে হাদিয়া দেওয়া? | জায়েজ নয়, সদকা করুন। |
আল্লাহু আলাম। আপনার মায়ের জন্য সহজ পথ নির্দেশ করুন। যদি বদলী হজ্জ করাতে চান, তাহলে একজন যোগ্য ও নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিকে দিয়ে করান। টাকার ব্যাপারে তাওবাহ করুন এবং ভবিষ্যতে সুদী লেনদেন থেকে বেঁচে থাকুন।
والله أعلم بالصواب