বোনের জামাই বা অন্যান্য গায়রে মাহরামের সাথে সালাম ও কুশল বিনিময় করা কি জরুরি?
Halal and Haram · Hanafi
Question
আমাকে অনেকেই বলেছে,, অন্তত সালাম আর কৌশলাদি করাই নাকি যায়। এর ফলে কি আমার তাদের সাথে অপমান করা হচ্ছে?আমি কি ভুল করছি, জানাবেন মিন ফাদ্বলিক।
Answer
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
উত্তর:
প্রশ্নকারী বোন, আপনার দ্বীনী উদ্যোগ ও পর্দা পালনের আগ্রহ দেখে আমরা খুবই আনন্দিত। আপনি যে বিষয়টি জানতে চেয়েছেন, তা হলো—আপনি কি অ-মাহরাম (গায়রে মাহরাম) পুরুষদের সাথে কথা বলা, সালাম দেওয়া ইত্যাদি সম্পূর্ণ বন্ধ করে খুব বেশি কঠোরতা অবলম্বন করছেন? নাকি এটাই ইসলামের দৃষ্টিতে সঠিক?
১. পর্দার মূলনীতি ও অ-মাহরামের সাথে সম্পর্ক:
ইসলামে পর্দা ফরজ। কুরআন ও হাদিসে অ-মাহরাম পুরুষের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ, অবাধ মেলামেশা ও অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
- সূরা নূর (২৪:৩১)-এ মহিলাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে:
“তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে... এবং তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, যা সাধারণত প্রকাশ পায় তা ছাড়া।” - সূরা আহযাব (৩৩:৩৩)-এ নবী صلى الله عليه وسلم-এর স্ত্রীদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে:
“তোমরা গৃহে অবস্থান কর এবং আগের জাহেলিয়াতের যুগের মতো সাজসজ্জা করে বের হয়ো না।” - হাদিস: নবী صلى الله عليه وسلم বলেছেন:
“তোমরা পুরুষদের সাথে একান্তে সাক্ষাৎ করো না।” (বুখারী, মুসলিম)
প্রয়োজন ছাড়া অ-মাহরামের সাথে কথা বলা শরিয়তে নাজায়েয। তবে প্রয়োজনে (যেমন ব্যবসা, চিকিৎসা, শিক্ষা, বা বাধ্যতামূলক পরিস্থিতিতে) পর্দার আড়ালে ও সতর্কতার সাথে কথা বলা জায়েয।
২. বোনের জামাই (শ্যালকের স্বামী) মাহরাম নয়:
বোনের স্বামী আপনার জন্য গায়রে মাহরাম। তাই তার সাথে পর্দা করা ওয়াজিব। আপনি যদি তার সাথে কথা বলা, সালাম দেওয়াও সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেন, তবে তা শরিয়তসম্মত সতর্কতা। এটি কোনো গুনাহ নয়, বরং উত্তম।
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (৫/৩২৮)-এ বলা হয়েছে:
“গায়রে মাহরাম নারীর সাথে দেখা-সাক্ষাৎ ও কথা বলা হারাম, যদি তা বিনা প্রয়োজনে হয়।” - রদ্দুল মুহতার (১/৪০৬)-এ ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মত উল্লেখিত:
“অ-মাহরাম নারীর প্রতি সালাম দেওয়া জায়েয, তবে ফিতনার আশঙ্কা থাকলে তা মাকরূহ। আর সালাম না দেওয়াই অধিক নিরাপদ।”
৩. সালাম দেওয়া কি জরুরি?
বেশিরভাগ ফিকাহবিদের মতে, অ-মাহরামের সাথে সালাম বিনিময় করা জায়েয, কিন্তু ফিতনার আশঙ্কা থাকলে তা পরিহার করাই উত্তম। আপনি যদি ফিতনার আশঙ্কায় (যেমন- সম্পর্কের জটিলতা, শয়তানের প্ররোচনা) সালাম না দেন, তাহলে তা ভুল নয়। বরং এটি অধিক সতর্কতা।
তবে অনেক আলেম বলেছেন: প্রয়োজনে অ-মাহরামের সাথে যেকোনো কথা বলা জায়েয—তবে তা সংক্ষিপ্ত ও সতর্কতার সাথে হতে হবে। এক্ষেত্রে সালাম দেওয়া যদি শুধু কুশল বিনিময়ের জন্যই হয় এবং তাতে কোনো প্রকার ফিতনা না থাকে, তাহলে দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু আপনি যদি না দেন, তাতেও আপনার গুনাহ হবে না।
৪. ‘অপমান’ করা হচ্ছে কি?
আপনার উদ্দেশ্য অপমান নয়, বরং দ্বীনের হুকুম পালন। তাই আপনার আচরণকে অপমান গণ্য করা হবে না। তবে মানুষের ভুল বুঝাবুঝি রোধ করতে আপনার পক্ষে না বললেও প্রকৃতপক্ষে যখন প্রয়োজন হয়, তখন সংক্ষিপ্ত ও সতর্কভাবে কথা বলা বা সালাম দেওয়া—এটিও ইসলামের দৃষ্টিতে জায়েয ও নিরাপদ।
- কুরআন: সূরা বাকারা (২:২৮৩)-এ বলা হয়েছে:
“তোমরা সাক্ষ্য গোপন করো না।” (প্রয়োজনে সত্য বলার নির্দেশ) - হাদিস: নবী صلى الله عليه وسلم বলেছেন:
“মুসলিমের একে অপরের প্রতি সালাম দেওয়া ও জিজ্ঞাসা করা ওয়াজিব।” (মুসলিম) কিন্তু এটি গায়রে মাহরামের ক্ষেত্রে শর্তযুক্ত—যদি ফিতনার আশঙ্কা না থাকে।
৫. আপনার করণীয়:
- আপনি যে পদ্ধতি গ্রহণ করেছেন (অ-মাহরামের সাথে সম্পূর্ণ কথা না বলা), তা অতিরিক্ত কঠোরতা নয়—বরং অধিক সতর্কতা। এটি ভুল নয়।
- তবে, যারা আপনার নিকটাত্মীয় (যেমন- বোনের জামাই) তাদের ক্ষেত্রে চলাফেরায় সঙ্গত কারণ থাকতে পারে (যেমন- পারিবারিক প্রয়োজন)। সেক্ষেত্রে প্রয়োজনে অল্প ও সতর্কতার সাথে কথা বলতে পারেন—তবে তা পর্দার আড়াল থেকে ও সতর্ক দৃষ্টিতে।
- পরিবারকে বোঝান: আপনার এই সতর্কতা দ্বীনের জন্যই, ব্যক্তিগত অপমান বা ঘৃণা থেকে নয়। তাদের সাথে কথা না বলাকে তারা অপমান মনে করলে, আপনি হাসিমুখে ও মিষ্টি ভাষায় বুঝিয়ে দিন যে, এটি আপনার দ্বীনি আমল।
- ইমাম আহমদ রেযা খান ও মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম)-এর মতানুযায়ী: পর্দা ও সতর্কতার ক্ষেত্রে ‘অতিরিক্ত’ কিছু নেই। বরং ভয়ের জায়গায় সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতাও বৈধ।
৬. চূড়ান্ত ফায়সালা:
আপনি ভুল করছেন না। বরং আপনি দ্বীনের নির্দেশ বাস্তবায়নের সতর্ক পথটি বেছে নিয়েছেন। তবে, যদি পরিবারের সাথে সম্পর্কের টানাপড়েন হয় এবং আপনি পর্দার আড়ালে থেকে শরীয়তের গন্ডির কধ্যে থেকে সংক্ষিপ্ত ও সতর্কভাবে সালাম বা জরুরী কথাবার্তা বলেন (ফিতনা না থাকলে), তাহলে তাও জায়েয। আপনি যা করছেন, তাতে কোনো অপমান বা গুনাহ নেই—ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহ আপনাকে দ্বীনের উপর অটল রাখুন ও উত্তম প্রতিদান দান করুন। আমীন।
উল্লেখিত কিতাব:
- রদ্দুল মুহতার (১/৪০৬, ৬/৩৭২)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (৫/৩২৮, ৫/৩৫৯)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/১৯৪–২১৯)
- বেহেশতি জেওর (পর্দা অধ্যায়)
- ফাতাওয়া উসমানী (২/১২৭)