পুরুষ ডাক্তারের পর্দার বিধান সম্পর্কে জানতে চাই?
Family Life · Hanafi
Question
Answer
ছেলেদের পর্দা ও নন-মাহরামের সাথে দৃষ্টি ও কথা বলার বিধান
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছেন: (১) ছেলেদের পর্দা বলতে কী বুঝায়? (২) নন-মাহরাম কারো সাথে প্রয়োজনে কথা বলার সময় সাধারণভাবে তার দিকে তাকিয়ে কথা বলা যাবে কিনা? (৩) তার স্বামী একজন ডাক্তার, প্রয়োজনে মহিলাদের সাথে কথা বলা ও চিকিৎসা করতে হয়, এক্ষেত্রে তার করণীয় কী?
উত্তর
১. ছেলেদের পর্দা বলতে যা বুঝায়
ছেলেদের পর্দা বা পুরুষদের পর্দা বলতে শরীয়তে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো বুঝায়:
ক. দৃষ্টির পর্দা (غض البصر): কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন: "مِنَ الْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ" "মুমিন পুরুষদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নিচু করে রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে।" (সূরা নূর: ৩০)
খ. নন-মাহরামের সাথে অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা ও মেলামেশা থেকে বিরত থাকা। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "لا يخلون رجل بامرأة إلا كان ثالثهما الشيطان" "কোন পুরুষ যেন কোনো নারীর সাথে একান্তে না মিলিত হয়, কেননা তাদের তৃতীয়জন হয় শয়তান।" (তিরমিজি: ২১৬৫)
গ. সতরের হিফাযত: পুরুষের সতর হলো নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত। নন-মাহরামের সামনে এই অংশ ঢেকে রাখা আবশ্যক।
ঘ. নন-মাহরাম নারীর দিকে কামনার দৃষ্টিতে না তাকানো। প্রয়োজনে শুধুমাত্র প্রয়োজন পরিমাণ তাকানো জায়েজ, তাও কামনাবিহীন অবস্থায়।
২. নন-মাহরামের সাথে তাকিয়ে কথা বলার বিধান
নন-মাহরাম কারো সাথে প্রয়োজনে কথা বলার সময় সরাসরি তার দিকে তাকিয়ে কথা বলার বিধান সম্পর্কে ইসলামী পণ্ডিতগণ বলেন:
উত্তম পন্থা: নন-মাহরামের সাথে কথা বলার সময় দৃষ্টি নিচু রাখা বা অন্য দিকে তাকিয়ে কথা বলা সর্বোত্তম। যদি কথোপকথনের স্বার্থে সরাসরি তাকানোর প্রয়োজন হয়, তবে কামনা-বাসনা ছাড়া শুধু ঘরের প্রয়োজন মেটানোর জন্য সাধারণভাবে তাকানো জায়েজ, কিন্তু এটিও উত্তম নয়।
ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.) বলেন: "لا بأس بالنظر إلى وجهها عند الحاجة كالشهادة والبيع والشراء والمداواة" "প্রয়োজনের সময় (মহিলার) মুখমণ্ডলের দিকে তাকানো দোষণীয় নয়, যেমন সাক্ষ্য, ক্রয়-বিক্রয় এবং চিকিৎসার সময়।" (রদ্দুল মুহতার: ১/৪০৬)
তবে সাধারণভাবে তাকিয়ে কথা বলার অভ্যাস করা উচিত নয়। প্রয়োজনের পরিমাণ তাকানো এবং দৃষ্টি নিচু রাখার চেষ্টা করা কর্তব্য।
৩. ডাক্তার স্বামীর করণীয়
প্রশ্নকারীর স্বামী একজন ডাক্তার। চিকিৎসার প্রয়োজনে মহিলাদের সাথে কথা বলা ও তাদের চিকিৎসা করা ইসলামী শরীয়তে জায়েজ, তবে কিছু শর্তসাপেক্ষে:
ক. চিকিৎসার অনুমতি: ইসলামে চিকিৎসার প্রয়োজনে নন-মাহরামের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ ও চিকিৎসার অনুমতি রয়েছে। ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.) বলেন: "ويداويها إن دعت الضرورة إلى ذلك" "প্রয়োজনের তাগিদ থাকলে তিনি (পুরুষ ডাক্তার) মহিলার চিকিৎসা করতে পারেন।" (রদ্দুল মুহতার: ৬/৩৭২)
খ. প্রয়োজন সীমিত রাখা: চিকিৎসার সময় শুধুমাত্র প্রয়োজন পরিমাণ দেখা ও কথা বলা উচিত। অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা ও দৃষ্টি থেকে বিরত থাকা।
গ. মাহরাম মহিলার উপস্থিতি: সম্ভব হলে রোগীর সাথে তার কোনো মাহরাম (স্বামী, পিতা, ভাই) উপস্থিত থাকার ব্যবস্থা করা। যদি সম্ভব না হয়, তবে অন্তত তৃতীয় কোনো ব্যক্তি উপস্থিত থাকা উচিত।
ঘ. পর্দার নিয়ম মেনে চলা: রোগীকে পর্দার সাথে রাখা (যেমন: মাথা, চুল ঢাকা) এবং চিকিৎসার সময় প্রয়োজনীয় অংশ ছাড়া অন্য অংশ দেখা থেকে বিরত থাকা।
ঙ. কামনা-বাসনা থেকে বেঁচে থাকা: কোনো অবস্থাতেই কামনার দৃষ্টিতে না তাকানো এবং মনে কোনো খারাপ চিন্তা না পোষণ করা।
চ. নারী চিকিৎসকের ব্যবস্থা: যদি কোনো নারী চিকিৎসক পাওয়া যায়, তাহলে তার মাধ্যমে চিকিৎসা করানো উত্তম। তবে নারী চিকিৎসকের অভাবে বা জটিল চিকিৎসার ক্ষেত্রে পুরুষ চিকিৎসকের অনুমতি রয়েছে।
ফতোয়া উসমানীতে বলা হয়েছে: "চিকিৎসার প্রয়োজনে মহিলা রোগীর পুরুষ ডাক্তার দ্বারা চিকিৎসা করানো জায়েজ, তবে শর্ত হলো: দৃষ্টি ও স্পর্শ যতটুকু প্রয়োজন কেবল ততটুকুতেই সীমিত রাখতে হবে।" (ফতোয়া উসমানী: ২/২৮৩)
গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা
১. নন-মাহরামের সাথে কথা বলার সময় দৃষ্টি নিচু রাখা বা অন্য দিকে তাকিয়ে কথা বলার চেষ্টা করা উচিত।
২. প্রয়োজনে তাকালেও কামনার দৃষ্টি থেকে বিরত থাকতে হবে।
৩. কথাবার্তা যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুতেই সীমিত রাখতে হবে। অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা, রসিকতা, হাসি-তামাশা করা যাবে না।
৪. গলা নরম করে কথা বলা যাবে না। কুরআনে নারীদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে: "فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ" (সূরা আহযাব: ৩২) - "তোমরা নরম ও আকর্ষণীয় স্বরে কথা বলো না, যাতে যাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে তারা প্ররোচিত হয়।"
৫. চিকিৎসার ক্ষেত্রে যথাসম্ভব নারী ডাক্তার বা নারী নার্সের ব্যবস্থা করে নেওয়া উচিত।
সারসংক্ষেপ
ছেলেদের পর্দা মূলত দৃষ্টি নিচু রাখা, নন-মাহরামের সাথে অপ্রয়োজনীয় যোগাযোগ থেকে বিরত থাকা এবং সতর ঢেকে রাখা। নন-মাহরামের সাথে প্রয়োজনীয় কথোপকথনের সময় সাধারণভাবে তাকিয়ে কথা বলা জায়েজ হলেও উত্তম হলো দৃষ্টি নিচু রাখা বা অন্য দিকে তাকিয়ে কথা বলা। ডাক্তার হিসেবে মহিলাদের চিকিৎসার প্রয়োজন হলে শুধুমাত্র চিকিৎসার প্রয়োজনীয় পরিমাণ দেখা ও কথা বলা জায়েজ, তবে অবশ্যই কামনার দৃষ্টি ও স্পর্শ থেকে বিরত থাকতে হবে এবং যথাসম্ভব মাহরামের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে।
والله أعلم بالصواب