স্বপ্নের ব্যাখ্যা
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
প্রশ্ন: আমি স্বপ্নে সমুদ্র দেখেছি। এরপর ইউটিউবে এক হুজুরের ভিডিওতে দেখলাম, ‘সমুদ্র দেখার অর্থ মৃত্যুর পর ওই ব্যক্তি জাহান্নামে যাবে’। আরও অনেক অর্থ আছে, কিন্তু প্রথম অর্থটা জানার পর থেকে ভালো লাগছে না। কেউ যদি স্বপ্নের মাধ্যমে জানতে পারে যে সে জাহান্নামে যাবে, তাহলে তার কী করা উচিত? উত্তরটি সংক্ষেপে এবং একজন ইসলামিক স্কলার থেকে পেতে চাই।
উত্তর:
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ
স্বপ্নের ব্যাখ্যা একটি বিশেষ জ্ঞান, তবে তা কখনোই চূড়ান্ত বা অকাট্য সত্য নয়। বিশেষ করে অমুসলিম বা সাধারণ মানুষের স্বপ্নকে ভবিষ্যদ্বাণী বা ফরমানে পরিণত করা ইসলামের পদ্ধতি নয়। আপনার উদ্বেগ বোধগম্য, তবে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো মনে রাখবেন—
১. স্বপ্নের প্রকৃতি:
হাদীসে এসেছে, স্বপ্ন তিন প্রকার:
- আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ,
- শয়তানের পক্ষ থেকে ভীতি প্রদর্শন,
- মনের কল্পনা ও দৈনন্দিন চিন্তার ফল।
(সহীহ বুখারী, হাদীস: ৭০১৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২২৬০)
অতএব, কোনো স্বপ্নই শেষ বিচার নয়। বিশেষ করে নেতিবাচক স্বপ্ন শয়তানের উস্কানি হতে পারে, যাতে মানুষ হতাশ বা নিরাশ হয়।
২. স্বপ্নের ব্যাখ্যা সম্পর্কে সতর্কতা:
স্বপ্নের ব্যাখ্যা দেওয়া একটি ইলম, তবে তা সঠিকভাবে কিতাব ও সুন্নাহ থেকে প্রমাণিত না হলে গ্রহণযোগ্য নয়। ইউটিউবের কোনো বক্তার একক মতামত ইসলামি মানদণ্ডে নির্ভরযোগ্য নয়। হানাফি ফিকহের কিতাবে (যেমন: রদ্দুল মুহতার, ফাতাওয়া উসমানী) স্পষ্ট বলা হয়েছে— স্বপ্নের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির চূড়ান্ত পরিণতি নির্ধারণ করা জায়েয নয়। ইমাম আবু হানীফা (রহ.) বলেন, “স্বপ্ন নবী-রাসূল ছাড়া অন্যদের জন্য দলীল নয়।” (কিতাবুল আছার, ইমাম আবু ইউসুফ)
৩. আপনার করণীয়:
যেহেতু আপনি উদ্বিগ্ন, তাই এই স্বপ্নকে গুরুত্ব না দিয়ে নিচের কাজগুলো করুন:
- শয়তান থেকে আশ্রয় চাওয়া: ঘুম থেকে জেগে বাম দিকে তিনবার থুথু ফেলুন এবং আউযুবিল্লাহি মিনাশ শয়তানির রাজীম পড়ুন। (মুসলিম, হাদীস: ২২৬২)
- কাউকে স্বপ্ন না বলা: নেতিবাচক স্বপ্ন অন্যদের না বলুন। (বুখারী, হাদীস: ৭০৪৪)
- তওবা ও ইস্তিগফার: আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান এবং নিজের আমলকে শুদ্ধ করুন। নিশ্চিত হোন, আল্লাহর রহমত অপরিসীম। (সূরা আয-যুমার: ৫৩)
- ভালো স্বপ্নের ব্যাখ্যা পড়া: সমুদ্র সম্পর্কে অনেক ভালো ব্যাখ্যাও আছে, যেমন— ইলম, সম্পদ, বা ভ্রমণ। সেগুলো নিয়েই আশাবাদী হোন।
৪. জাহান্নামের ভয় ও আশা:
আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর রহমত থেকে মানুষকে নিরাশ করেন না।” (সূরা ইউসুফ: ৮৭) কোনো স্বপ্ন আপনার ভাগ্য নির্ধারণ করবে না, বরং আপনার বিশ্বাস, আমল ও আল্লাহর রহমতই চূড়ান্ত। আপনি যদি স্বপ্নের কারণে ভীত হন, তবে এটি একটি ভালো লক্ষণ—কারণ ভয় তাওবার দিকে নিয়ে যায়। কিন্তু এই ভয় যেন হতাশায় পরিণত না হয়।
সংক্ষিপ্ত ফতোয়া:
- উক্ত স্বপ্নের ব্যাখ্যা নির্ভরযোগ্য নয়।
- এ ধরনের স্বপ্ন দেখলে শয়তানের কুমন্ত্রণা মনে করুন, ভয় পাবেন না।
- তওবা ও ইস্তিগফার করতে থাকুন, আল্লাহর রহমতের ওপর ভরসা রাখুন।
- ভুল বক্তব্য প্রচারকারী ইউটিউব ভিডিও থেকে দূরে থাকুন এবং নির্ভরযোগ্য আলেমের কাছ থেকে ইলম অর্জন করুন।
উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ:
- রদ্দুল মুহতার (কিতাবুস সলাত, ফাসলুন ফিল মানামাত)
- ফাতাওয়া উসমানী (১/৪৫-৪৬)
- বাহিশ্তি জেওর (দশম অধ্যায়: স্বপ্নের ব্যাপার)
- মা’য়ারিফুল কুরআন (সূরা ইউসুফ এর তাফসীর)
আল্লাহ তাআলা আপনাকে শান্তি দিন এবং আপনার ভয় দূর করুন।
آمين