বাচ্চার ব্যবহৃত জিনিস দান, বিক্রি ও হিসাব রাখার পদ্ধতি; প্রয়োজনীয় জিনিস বেশি দামে কেনার বিধান; রোজায় প্রস্রাবের রাস্তায় আঙুল প্রবেশ করালে রোজা ভাঙার বিধান।
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
এই সমস্ত জিনিস কি বিক্রি করে টাকা বাচ্চাকে দিতে হবে? কোন জিনিস মালিকানা হিসেবে দেওয়া হয়েছে কোন জিনিস শুধু ব্যবহার করার জন্য দেওয়া হয়েছে এসব কিছুই তো ঠিক করা যায় না।
আবার এসব পুরনো জিনিস কে কিনবে? কেউ বাচ্চার হাতে টাকা৷ দিলে সেটা নিজেরা খরচ করলেও হিসাব লিখে রাখি যে, বড় হলে দিয়ে দিব। এভাবে এই সমস্ত জিনিসের আনুমানিক একটা মূল্য ধরে লিখে রাখলাম পরে দিয়ে দিব বড় হলে। আর জিনিসগুলো দান করলাম বা ফেলে দিলাম। এভাবে কি হবে?
এত কঠিন হিসাব করতে হবে এসব জিনিসের ব্যাপারে, আগে জানতাম না। এখন বাসায় জিনিসপত্র জমতেই আছে কি করব কিছুই বুঝতে পারছি না।
প্রশ্ন ২ : জিনিসটা প্রয়োজনীয়। কম দামেও কেনা যায়। কিন্তু, শখ হচ্ছে বেশি দামেরটা কেনার ( সুন্দর লাগছে বেশি এজন্য আবার টেকসই + স্বাস্থ্যকর এজন্য দামটা বেশি)
এটা কি বিলাসিতা হবে? বেশি দাম দিয়ে কিনলে কি গুনাহ হবে?
প্রশ্ন ৩: যোনিপথে বা প্রস্রাবের রাস্তায় ভেজা আংগুল প্রবেশ করলে নাকি রোজা ভেঙে যায়। এখন টয়লেটে গেলে তাহলে ভালোভাবে ক্লিন হবো কিভাবে? বারবার সন্দেহ হয় যে, রোজা ভেঙে গেল কিনা। কোন অংশে আংগুল লাগলে রোজা ভাংবে সেটাও বুঝতে পারি না।
Answer
উত্তর
আপনার তিনটি প্রশ্নের উত্তর নিম্নরূপ দেওয়া হলো। প্রতিটি উত্তর কুরআন, হাদিস ও হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাবের আলোকে প্রস্তুত করা হয়েছে।
প্রশ্ন ১ : বাচ্চার ব্যবহৃত জিনিস দান/বিক্রি/হিসাব রাখা
মূলনীতি
ছোট বাচ্চার জন্য কেনা বা গিফট দেওয়া জিনিস সাধারণত বাচ্চার মালিকানায় চলে যায়। পিতামাতা ওই জিনিসের তত্ত্বাবধায়ক। তাই বাচ্চার মালিকানার জিনিস তার অনুমতি ছাড়া অন্যকে দান করা বা ফেলে দেওয়া জায়েয নয়, যদি না তা পুরোপুরি নষ্ট বা ব্যবহারের অযোগ্য হয়। তবে প্রয়োজনে বাচ্চার কল্যাণে তা বিক্রি করে টাকা সংরক্ষণ করা যায়।
করণীয়
- যদি জিনিসগুলো এখনও ব্যবহারযোগ্য হয়, তাহলে সেগুলো বিক্রি করে টাকা বাচ্চার জন্য রেখে দিন।
- কেউ যদি সরাসরি বাচ্চার হাতে টাকা দেয়, তা বাবা-মা তার প্রয়োজনে খরচ করতে পারেন; তবে হিসাব লিখে রাখা ভালো, যাতে বড় হলে জানানো যায় বা ফেরত দেওয়া যায়।
- আপনি ইতিমধ্যে মূল্য ধরে লিখে রেখেছেন — সেটা উত্তম পদ্ধতি। ভবিষ্যতে বড় হলে ওই টাকা বা সমমূল্যের জিনিস তাকে দিয়ে দিন।
- পুরনো ও নষ্ট জিনিস ফেলে দিলে কোনো সমস্যা নেই, কারণ সেগুলো আর মালিকানার যোগ্য নয়।
- সতর্কতা : বাচ্চার মালিকানার জিনিস অন্যকে দান করলে তার পক্ষ থেকে সওয়�ের নিয়তে করা যেতে পারে, কিন্তু এক্ষেত্রে নিজে সওয়াব নেওয়া যাবে না। আর তা বিক্রি না করে দিলে বাচ্চের অধিকার নষ্ট হবে। তাই এখন থেকে বিক্রি করে টাকা সংরক্ষণ করুন।
আগে যা হয়েছে
যেহেতু আপনি আগে না জেনে কিছু জিনিস দান/ফেলে দিয়েছেন, তাই অতীতের জন্য অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে তাওবা করুন। ভবিষ্যতে উপরের নিয়ম অনুসরণ করুন। কোনো জিনিসের মূল্য অনুমান করে রেখে দেওয়ার পদ্ধতি বৈধ, তবে তা সঠিক হতে হবে।
দলিল
- ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন, “পিতা তার নাবালেগ সন্তানের মাল থেকে নিজের প্রয়োজনে খরচ করতে পারে না, বরং সন্তানের কল্যাণেই খরচ করবে।” (রদ্দুল মুহতার, ৫/২৬৫)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়ায় আছে, “সন্তানের মালিকানাধীন জিনিস পিতা অন্যের দান করতে পারে না, যদি না সন্তানের কোনো স্বার্থ থাকে।” (ফাতাওয়া আলমগীরী, ৪/৩৬)
প্রশ্ন ২ : বেশি দামি প্রয়োজনীয় জিনিস কেনা
মূলনীতি
প্রয়োজনীয় জিনিস বেশি দাম দিয়ে কেনা যদি নিম্নোক্ত শর্তে হয় তবে তা বিলাসিতা বা গুনাহ নয়—
১. জিনিসটি সত্যিই প্রয়োজন (শুধু শখ নয়)।
২. বেশি দামের কারণে টেকসই, স্বাস্থ্যকর ইত্যাদি বৈধ সুবিধা থাকে।
৩. অর্থের অপচয় না হয় (যথেষ্ট সম্পদ থাকে)।
বিবরণ
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী: জিনিসটি প্রয়োজনীয়, কম দামেও কেনা যায়, কিন্তু বেশি দামেরটি সুন্দর, টেকসই ও স্বাস্থ্যকর। এখানে সুন্দর লাগা বা শখ থাকলেও টেকসই ও স্বাস্থ্যকর হওয়াটা প্রকৃত প্রয়োজন। তাই এটি বিলাসিতা হিসেবে গণ্য হবে না, বরং এটি ‘প্রয়োজন পূরণের মাধ্যম’। তবে শুধু দামি দেখানোর জন্য বা অপচয়ের জন্য যদি কেনা হয়, তাহলে তা অপছন্দনীয়। আপনার ক্ষেত্রে বৈধ।
দলিল
- কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: “তোমরা অপচয় করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।” (সূরা আনআম : ১৪১)
- আল্লামা শামী (রহ.) বলেন, “প্রয়োজনের অতিরিক্ত খরচ করা অপচয়, কিন্তু প্রয়োজনীয় জিনিস বেশি দামে কেনা যদি সুবিধা থাকে তবে তা অপচয় নয়।” (রদ্দুল মুহতার, ৬/৪২১)
প্রশ্ন ৩ : রোজা অবস্থায় প্রস্রাবের রাস্তায় ভেজা আঙুল প্রবেশ করালে
মূলনীতি
হানাফি মতে, রোজা অবস্থায় যদি কোনো ভেজা বস্তু (আঙুল, তুলা ইত্যাদি) পুরুষের প্রস্রাবের রাস্তার ভেতরে বা নারীর যোনিপথের ভেতরে প্রবেশ করানো হয়, তাহলে রোজা ভেঙে যায়। তবে শুধু বাইরের অংশ ধোয়া বা পানি দেওয়া রোজা ভঙ্গ করে না।
টয়লেটে পরিচ্ছন্নতার পদ্ধতি
- টয়লেটে যাওয়ার পর ভালোভাবে ইস্তিঞ্জা করুন। ৩/৫/৭ বার টিস্যু পেপার ব্যবহার করে ভালোভাবে পরিস্কার করুন,পানি দেওয়ার সময় আঙুল ভেতরে না দিয়ে বাইরের অংশে পানি ঢালুন।
- নারীরা ইস্তিঞ্জার সময় সামনের অংশ ধোয়ার জন্য আঙুল ভেতরে না দিয়ে হাতের তালু দিয়ে পানি ঢেলে দিন।
- পুরুষরা প্রস্রাবের পর টিস্যু বা পানি দিয়ে ভালোভাবে মুছে ফেলবেন। কোনো কিছু ভেতরে প্রবেশ করাবেন না।
- যদি অনিচ্ছাকৃত ভাবে সামান্য পানি ভেতরে চলে যায়, তাহলেও রোজা ভেঙে যায় (ইচ্ছা না থাকলেও)। তাই খুব সতর্ক থাকা জরুরি।
সন্দেহ দূরীকরণ
- বারবার সন্দেহ হলে শয়তানি ওয়াসওয়াসা বলে গণ্য করবেন। সুতরাং দৃঢ় বিশ্বাস রাখবেন যে, যতক্ষণ পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে জানতে না পারবেন যে ভেতরে পানি/আঙুল গেছে, ততক্ষণ রোজা ভাঙবে না।
- ফিকহে বলা হয়েছে: “যদি আঙুল বাইরের অংশ স্পর্শ করে এবং ভেতরে না যায়, তাহলে রোজা ভাঙবে না। নারীর জন্য বাইরের লেবিয়ার (labia majora) মধ্যে প্রবেশ করলে ভাঙে, শুধু স্পর্শ করলে নয়।” (ফাতাওয়া আলমগীরী, ১/২০৩; রদ্দুল মুহতার, ২/৪০৯)
উপসংহার
- রোজা অবস্থায় ইস্তিঞ্জার সময় ৩/৫/৭ বার টিস্যু পেপার ব্যবহার করে ভালোভাবে পরিস্কার করুন, আঙুল ভেতরে না দিয়ে বাইরে পানির প্রবাহ দিয়ে পরিষ্কার হবেন।
- অনিচ্ছাকৃত ভেজা আঙুল ভেতরে গেলে রোজা কাজা হবে।
- সন্দেহের ক্ষেত্রে মূল নীতি হলো: রোজা সহীহ আছে বলেই ধরে নেবেন, যতক্ষণ না নিশ্চিত হন যে কিছু প্রবেশ করেছে।
সারসংক্ষেপ
১. বাচ্চার জিনিস বিক্রি করে টাকা সংরক্ষণ করুন, অথবা মূল্য লিখে বড় হলে দিন। অপ্রয়োজনে দান/ফেলা জায়েয নয়।
২. প্রয়োজনীয় জিনিস অধিক সুবিধার জন্য বেশি দামে কেনা বৈধ, অপচয় না হলে।
৩. রোজায় পায়খানা-প্রস্রাবের রাস্তায় ভেজা আঙুল প্রবেশ করালে রোজা ভাঙে; তাই ইস্তিঞ্জায় আঙুল ভেতরে না দিয়ে পানি ঢেলে পরিষ্কার হবেন। সন্দেহ এড়িয়ে চলুন।
৩/৫/৭ বার টিস্যু পেপার ব্যবহার করে ভালোভাবে পরিস্কার করুন,তারপর পানি ঢালুন।
আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞানী।