প্রাণীর (মানুষ ও প্রাণী) পূর্ণাঙ্গ চিত্র বা ছবি আঁকা জায়েজ?
Halal and Haram · Hanafi
Question
১। নামাজ শুরু করার পর কোন রাকাআতে আছি এটা নিয়ে কনফিউজড হলে নামাজ ভেঙ্গে আবার নতুন করে নামাজ পড়লে কি গুনাহ হবে?
২। গ্রাফিক্স ডিজাইন করার সময় পুরুষ বা মহিলাদের ছবি এডিট করলে গুনাহ হবে? suppose, canva app দিয়ে একটা banner বানাতে হবে, সেখানে আমি সব কিছু edit করে দিলাম অন্য জন শুধু ছবি add করলো এভাবেও গুনাহ হবে?
৩। banner edit করে মানুষের ছবিসহ প্রিন্ট করলে গুনাহ হবে? পড়াশোনা সংক্রান্ত বিষয়ে সেমিনার/ওয়ার্কশপের জন্য ব্যানার প্রিন্ট করার সময় মানুষের ছবিও লাগে।
৪। ধরুন, আমি banner online এ edit করলাম মানুষের ছবিসহ। কিন্তু অন্যজন সেই ব্যানারটা প্রিন্ট করার জন্য অর্ডার দিলো। এরপরের দিন দিয়ে আমি যদি সেই ব্যানার নিয়ে আসি তাহলে কি আমার গুনাহ হবে?
৫। সেমিনার বা অনুষ্ঠানে মেয়েদের হোস্টিং করা কি জায়েজ?
৬। ক্লাসে ছেলে মেয়ের উপস্থিতিতে প্রেজেন্টেশন দেওয়া জায়েজ?
জাযাকাল্লাহু খইরন ফিদ্দুনইয়্যা ওয়াল আখিরাহ ওস্তায
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নের জন্য জাযাকাল্লাহু খইরান। নিচে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর হানাফি ফিকহের কিতাব ও উসুলের আলোকে দেওয়া হলো।
১. নামাজের রাকাত নিয়ে সন্দেহ হলে নামাজ ভেঙে নতুন করে পড়ার বিধান
নামাজের মধ্যে যদি আপনি নির্দিষ্ট রাকাত সম্পর্কে সন্দেহে পড়েন, তাহলে শরিয়তের নির্দেশনা হলো: আপনি কম রাকাতের ওপর ভিত্তি করে নামাজ সম্পন্ন করবেন এবং শেষে সাহু সিজদা করবেন (অর্থাৎ যদি দুই রাকাত না তিন রাকাত সন্দেহ হয়, তাহলে ধরে নেবেন যে দুই রাকাত পড়েছেন, তৃতীয় রাকাত পড়বেন এবং শেষে সাহু সিজদা আদায় করবেন)। নামাজ ভেঙে নতুন করে শুরু করা জায়েয নয়। বিনা কারণে ফরজ নামাজ ভাঙা গুনাহর কাজ (মাকরুহ তাহরিমি)। তবে যদি ভুল করে নামাজ ভেঙে ফেলে থাকেন, তাহলে তওবা করতে হবে এবং পুনরায় নামাজ আদায় করতে হবে। এটি নিজেই গুনাহ নয়, বরং ভাঙার কাজটি গুনাহ।
প্রমাণ: রদ্দুল মুহতার (২/২৪২-২৪৩) তে ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ) বলেন:
"নামাজের রাকাত সন্দেহ হলে কম সংখ্যার ওপর আমল করবে এবং সাহু সিজদা করবে। ইচ্ছাকৃতভাবে নামাজ ভাঙা জায়েয নয়।"
নোট: যদি সাহু সিজদা না করে নামাজ ভাঙেন, তাহলে নামাজ পুনরায় আদায় করা ফরজ হবে, কিন্তু ভাঙার কারণে গুনাহ হবে। তাই সর্বদা সাহু সিজদার মাধ্যমে নামাজ সম্পন্ন করা উচিত।
২. গ্রাফিক্স ডিজাইন করে পুরুষ/মহিলার ছবি এডিট করা
হানাফি ফিকহ মতে, প্রাণীর (মানুষ ও প্রাণী) পূর্ণাঙ্গ চিত্র বা ছবি আঁকা, তৈরি করা, বা সম্পাদনা করা হারাম, কারণ এটি সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্য ও মূর্তিপূজার পথ উন্মুক্ত করে। রসুলুল্লাহ (সা) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি কোনো প্রাণীর ছবি তৈরি করে, তাকে কিয়ামতের দিন শাস্তি দেওয়া হবে এবং বলা হবে তুমি এতে প্রাণ ফুঁকে দাও, অথচ তুমি পারবে না" (বুখারি, মুসলিম)।
ক্যানভা বা অন্য কোনো অ্যাপে ব্যানার ডিজাইন করার সময় যদি উদ্দেশ্যমূলকভাবে পুরুষ/মহিলার ছবি (মুখসহ) ইডিট বা পরিবর্তন করা হয়, তাহলে তা গুনাহের কাজ। আপনি যদি ছবি ব্যতীত অন্য সব ইডিট করেন এবং অন্য কেউ ছবি সংযোজন করে, তবুও আপনার অংশগ্রহণ (ছবি সংযোজনের সম্ভাবনা জানা থাকলে) গুনাহের কাজে সাহায্যকারী হিসেবে গণ্য হবে।
প্রমাণ: রদ্দুল মুহতার (৬/৩৭২) তে ইবনে আবিদীন (রহ) বলেছেন:
"প্রাণীর ছবি আঁকা বা নির্মাণ করা হারাম, যদিও তা দেয়াল অথবা কাপড়ে হয়।"
ব্যতিক্রম: কোনো জরুরি প্রয়োজনে (যেমন শনাক্তকরণ ফটো, শিক্ষা) এবং যদি ছবিটি অসম্পূর্ণ থাকে (যেমন চেহারা ঝাপসা বা দেহ কাটা), তবে কিছু হানাফি আলিম অনুমতি দিয়েছেন, তবে সেটিও সতর্কতা বজায় রেখে। সাধারণ ব্যানারের জন্য ছবি ব্যবহার জায়েয নয়।
৩. মানুষের ছবি সংবলিত ব্যানার প্রিন্ট করা
হ্যাঁ, মানুষের ছবি সংবলিত ব্যানার প্রিন্ট করাও গুনাহের কাজ, কারণ এটি ছবি প্রচারের মাধ্যম। যদি ব্যানারটি শিক্ষা সেমিনার বা ওয়ার্কশপের জন্য হয় এবং ছবি ছাড়া কাজ না চলে, তবে কম গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্যে ছবি ব্যবহার আপত্তিকর। শরিয়তের দৃষ্টিতে, ছবি লাগানোর প্রয়োজনীয়তা শিক্ষার জন্য সীমিত কলেজ-মাদ্রাসায় ছাত্রছাত্রীদের ছবি ব্যবহারের অনুমতি কিছু আলিম দিয়েছেন, কিন্তু তা নির্দিষ্ট শর্তে (যেমন: শুধু প্রোফাইল, পূর্ণ দেহ নয়)।
প্রমাণ: ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/২৯৫) তে মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ) বলেছেন:
"প্রাণীর ছবি প্রিন্ট করাও মুর্তি বানানোর মতো হারাম, তবে প্রয়োজনে ও দৃষ্টি এড়ানোর ব্যবস্থা থাকলে মাকরুহ।"
তাই সেমিনারের ব্যানারে ছবি না ব্যবহার করাই উত্তম। যদি ছবি ছাড়া ব্যানার তৈরি করা যায় (যেমন শুধু টেক্সট ও লোগো), তাহলে তা ওয়াজিব।
৪. অনলাইনে ছবিসহ ব্যানার এডিট করে অর্ডার নেওয়া ও ডেলিভারি দেওয়া
আপনি যদি ব্যানারটি নিজে ছবিসহ ইডিট করেন এবং তারপর অন্যজন প্রিন্ট করার অর্ডার দেয়, কিন্তু আপনি শুধু ইডিট করেই দেন এবং প্রিন্টের কাজ অন্য জায়গায় হয়, তবে আপনার গুনাহ হবে যেহেতু আপনি ইডিটের মাধ্যমে হারাম কাজে অংশগ্রহণ করেছেন। কিন্তু যদি আপনি শুধু ইডিটের পরবর্তী কাজ (প্রিন্ট অর্ডার) আদায় করেন এবং প্রিন্ট করা ব্যানার সরবরাহ করেন, তাহলে সেটিও হারাম কাজে সহায়তা করার শামিল।
প্রমাণ: কুরআন মজীদে বলা হয়েছে:
"সৎকর্ম ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পর সাহায্য কর, আর পাপ ও সীমালংঘনে সাহায্য করো না।" (সূরা মায়িদা: ২)
যেহেতু আপনি জানেন যে এই ব্যানার ছবিসহ প্রিন্ট হবে, তাই ইডিট করাটাও পাপের সহায়তা। তাই আপনার জন্য উচিত – ইডিট করতে যাওয়ার আগেই লে-আউট থেকে ছবি বাদ দেওয়া বা প্রিন্টারকে বলবেন শুধু টেক্সট প্রিন্ট করতে। যদি আপনি কেবলমাত্র ইডিট করার জন্য জোর করছেন, তাহলে আপনিও গুনাহগার হবেন।
৫. সেমিনার/অনুষ্ঠানে মেয়েদের হোস্টিং করা
মেয়েদের হোস্টিং (আবাস/অতিথি সেবা) করা জায়েয যদি নিম্নলিখিত শর্তগুলো পালন করা হয়:
- পর্দা ও হিজাবের পূর্ণ ব্যবস্থা (মহিলাদের জন্য পৃথক প্রবেশদ্বার, পৃথক বসার জায়গা)।
- অপ্রয়োজনে গায়রে মাহরাম পুরুষের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ বা মেলামেশা না করা।
- সমস্ত নিরাপত্তা ও শালীনতা বজায় রাখা।
যদি হোস্টিংকে অজুহাতে মহিলারা গায়রে মাহরাম পুরুষের সাথে অবাধে মিশে, তাহলে তা জায়েয নয়। হানাফি ফিকহে মহিলাদের জন্য সফর ও আবাসের অনুমতি জরুরি অবস্থা ও পর্দার শর্ত সাপেক্ষে দেওয়া হয়েছে।
প্রমাণ: আল-হিদায়া (২/৩৪৪) তে বলা হয়েছে:
"মহিলাদের জন্য সফর জায়েয, যদি মাহরাম সঙ্গী থাকে অথবা নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকে।"
সেমিনারে হোস্টিংয়ের ক্ষেত্রেও নিরাপত্তা ও পর্দা নিশ্চিত করতে হবে। অনেক হানাফি ফতোয়া অনুসারে, বর্তমানে ইসলামি সেমিনারে মহিলাদের জন্য পৃথক ব্যবস্থা নিয়ে অংশগ্রহণ করার অনুমতি রয়েছে।
৬. ক্লাসে ছেলে-মেয়ের উপস্থিতিতে প্রেজেন্টেশন দেওয়া
ছেলে-মেয়েরা একত্রিত হয়ে পড়াশোনার ক্লাস করা এবং প্রেজেন্টেশন দেওয়া – হানাফি মতে সাধারণত জায়েজ নয় যদি তারা বয়ঃসন্ধির (বালেগ) পরে এবং গায়রে মাহরাম হয়। কুরআনে বলা হয়েছে:
"তোমরা নারীদেরকে বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে।" (সূরা নূর: ৩১)
প্রেজেন্টেশন দেওয়ার সময় দৃষ্টি, কথা, চলাফেরা – সবকিছু ফিতনার কারণ হতে পারে। যদি ক্লাসে পর্দার ব্যবস্থা না থাকে (যেমন আলাদা রুম, পর্দার আড়াল) এবং সরাসরি মেলামেশা হয়, তাহলে প্রেজেন্টেশন দেওয়া জায়েয নয়। দরকার হলে ভিডিও কনফারেন্স অথবা ছেলে ও মেয়েদের জন্য পৃথক সেশন আয়োজন করা উত্তম।
প্রমাণ: ফাতাওয়া আলমগিরী (৫/৩২১) তে বলা হয়েছে:
"গায়রে মাহরাম নারীর সাথে কোনো পুরুষের বিনা প্রয়োজনে একান্তে কথা বলা ও দেখা-সাক্ষাৎ করা হারাম।"
প্রেজেন্টেশন শিক্ষার অংশ, তবে যদি তা ফিতনার দিকে নিয়ে যায়, তবে তা এড়িয়ে চলা উচিত। বিজ্ঞপ্তি বা ব্যানারে ছবি না ব্যবহার করার মতো এখানেও পর্দা ও ফিতনা এড়ানোর পরামর্শই প্রধান।
সারসংক্ষেপে:
| বিষয় | ফয়সালা | |------|---------| | নামাজের রাকাত সন্দেহ | নামাজ ভেঙে নতুন না করে সাহু সিজদা করুন | | ছবি ইডিট করা | হারাম; শুধু টেক্সট ইডিট জায়েজ | | ছবিসহ ব্যানার প্রিন্ট করা | গুনাহ; এড়িয়ে চলুন | | অর্ডার নিয়ে প্রিন্ট ডেলিভারি | গুনাহের সহায়তা; থেকে বিরত থাকুন | | মেয়েদের হোস্টিং | জায়েজ, যদি পর্দা ও নিরাপত্তা বজায় থাকে | | কো-এড ক্লাসে প্রেজেন্টেশন | জায়েজ নয় ফিতনার ভয়ে; পৃথক ব্যবস্থা করুন |
উপসংহার: দ্বীনের বিধান মেনে চলার জন্য আমরা কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি চাই। অপ্রয়োজনে ছবি ও মেলামেশা থেকে বিরত থাকাই আমাদের জন্য নিরাপদ পথ।
والله أعلم بالصواب